logo
Advertisement

আগের মতো দৌড়ঝাঁপ করছে না শিশু, নজর দিন এই ৭ কারণে

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
আগের মতো দৌড়ঝাঁপ করছে না শিশু, নজর দিন এই ৭ কারণে
ছবি : সংগৃহীত

সারাদিন ছোটাছুটি করা, স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা, পড়াশোনা, নানা কাজে ব্যস্ত থাকার পর শিশু ক্লান্ত হয়ে পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আগে যে শিশু স্কুল থেকে ফিরেই খেলতে ছুটত, এখন যদি ঘরে ফিরেই সোফায় শুয়ে পড়ে, পড়তে বসলে বারবার মনোযোগ হারায় বা ছুটির দিনেও অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি একটু খেয়াল করা দরকার।

Advertisement

মাঝেমধ্যে ক্লান্তি নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে শিশুর স্বাভাবিকের তুলনায় শক্তি কমে গেলে, খেলাধুলায় আগ্রহ হারালে, মেজাজ বদলে গেলে বা পড়াশোনায় মনোযোগ কমে গেলে এর পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. নরেন্দ্র কুমার ঝা এমন দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন।

পর্যাপ্ত সময় ঘুমালেও ঘুম ভালো হচ্ছে না

শিশু রাতে কত ঘণ্টা ঘুমাচ্ছে, শুধু সেটি দেখলেই হবে না। ঘুমটি কতটা গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু যদি রাতে বারবার জেগে ওঠে, অস্থিরভাবে ঘুমায়, নাক ডাকে বা মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়, তাহলে পর্যাপ্ত সময় বিছানায় থাকার পরও শরীর ঠিকমতো বিশ্রাম নাও পেতে পারে। ফলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরও ক্লান্ত লাগতে পারে।

তাই শিশু ৮ বা ৯ ঘণ্টা ঘুমাচ্ছে দেখেই ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে তার ঘুম যথেষ্ট ভালো হচ্ছে।

শরীরে আয়রনের ঘাটতি

শিশুদের অকারণ ক্লান্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে আয়রনের ঘাটতি। আয়রন রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পৌঁছে দিতে সাহায্য করে।

শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলেই যে রক্তশূন্যতা দেখা দেবে, এমন নয়। আয়রনের মাত্রা কমে গেলেও শিশু ক্লান্ত, দুর্বল বা খিটখিটে হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে দ্রুত বেড়ে ওঠার সময়, খুব বেছে বেছে খাবার খেলে কিংবা খাবারে আয়রনের পরিমাণ কম থাকলে এই ঝুঁকি বাড়তে পারে।

শিশু দীর্ঘদিন ক্লান্ত থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে আয়রনের ঘাটতি আছে কি না, তা দেখা যেতে পারে।

শিশুর নাক ডাকার বিষয়টি হালকা করে দেখবেন না

শিশু নিয়মিত জোরে নাক ডাকছে, ঘুমের মধ্যে হাঁসফাঁস করছে বা কিছু সময়ের জন্য শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হলে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

শিশুদের ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালির বাধার কারণে ঘুম বারবার ভেঙে যেতে পারে। অনেক সময় শিশু নিজেই বুঝতে পারে না যে তার ঘুমে সমস্যা হচ্ছে। দিনের বেলায় এর প্রভাব দেখা দিতে পারে ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি বা অস্বাভাবিক চঞ্চলতার মাধ্যমে।

অর্থাৎ কোনো শিশু অতিরিক্ত চঞ্চল হয়ে পড়েছে বলেই যে সে যথেষ্ট বিশ্রাম নিচ্ছে, তা নয়। ঘুমের সমস্যা থেকেও আচরণে এমন পরিবর্তন আসতে পারে।


ঘুমানোর আগ পর্যন্ত মোবাইল বা পর্দার ব্যবহার

বর্তমানে শিশুদের ঘুমের রুটিন নষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে রাতে দীর্ঘ সময় মোবাইল, ট্যাব বা টেলিভিশন ব্যবহার।

পর্দা থেকে আসা আলো শরীরে মেলাটোনিন নামের হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। এই হরমোন শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করে। ঘুমানোর ঠিক আগে পর্যন্ত ভিডিও দেখা বা গেম খেলার অভ্যাস থাকলে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে।

এক দিন এমন হলে বড় সমস্যা নাও হতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন রাতে একই অভ্যাস চলতে থাকলে শিশুর ঘুমের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। ফলে দিনের বেলায় ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।

থাইরয়েডের সমস্যা

শিশুর ক্লান্তির পেছনে কখনো কখনো থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতিও থাকতে পারে।

শুধু ক্লান্তি দেখেই অবশ্য থাইরয়েডের সমস্যা ধরে নেওয়া যাবে না। তবে ক্লান্তির সঙ্গে যদি শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ধীর হয়ে যায়, অকারণে ওজন বাড়ে, কোষ্ঠকাঠিন্য হয় বা ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যায়, তাহলে বিষয়টি চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।

প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা করে থাইরয়েডের কার্যক্রম পরীক্ষা করা যায়।

সব ক্লান্তির কারণ শারীরিক নয়

শিশুর মনেও চাপ থাকতে পারে। স্কুলের পড়াশোনা, পরীক্ষার চাপ, বন্ধুদের সঙ্গে সমস্যা, পরিবারে পরিবর্তন কিংবা অন্য কোনো মানসিক উদ্বেগের কথা অনেক শিশু সহজে বলতে পারে না।

ফলে মানসিক চাপ সব সময় দুশ্চিন্তা বা কান্নার মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। কোনো কোনো শিশুর ক্ষেত্রে তা ক্লান্তি, চুপচাপ হয়ে যাওয়া কিংবা আগে যে কাজগুলো করতে ভালোবাসত, সেগুলোর প্রতি আগ্রহ হারানোর মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে।

তাই শিশু হঠাৎ সব সময় ক্লান্ত হয়ে থাকলে শুধু খাবার বা ঘুমের দিকে না তাকিয়ে তার মন কেমন আছে, সেটিও বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।

খাবারের অনিয়ম ও পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া

শিশুর শরীর বেড়ে ওঠার জন্য নিয়মিত ও সুষম খাবার প্রয়োজন। সকালের নাশতা বাদ দেওয়া, সারাদিন মিষ্টি বা চিনিযুক্ত খাবার খাওয়া কিংবা এক বেলা বেশি খেয়ে অন্য বেলা না খাওয়ার অভ্যাস দিনের বিভিন্ন সময়ে শক্তির ওঠানামা তৈরি করতে পারে।

শিশুর খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন, জটিল শর্করা, শাকসবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার থাকা দরকার। পর্যাপ্ত পানি পান করাও গুরুত্বপূর্ণ।

তাই শিশু দুপুরের আগেই দুর্বল হয়ে পড়ে বা বিকেলের দিকে হঠাৎ শক্তি হারিয়ে ফেলে কি না, সেদিকেও নজর রাখা ভালো।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

এক দিন বা দুদিন শিশু ক্লান্ত থাকলেই চিকিৎসকের কাছে ছুটে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ব্যস্ত দিন, খেলাধুলা, পড়াশোনার চাপ বা কম ঘুমের কারণেও সাময়িক ক্লান্তি হতে পারে।

কিন্তু দুই থেকে তিন সপ্তাহ ধরে শিশুর ক্লান্তি থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। বিশেষ করে ক্লান্তির সঙ্গে যদি ফ্যাকাশে দেখায়, ওজনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন হয়, মেজাজ বদলে যায় বা আগের পছন্দের কাজগুলোতে আগ্রহ কমে যায়, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

প্রয়োজনে চিকিৎসক সাধারণ রক্ত পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষা করে ক্লান্তির কারণ খুঁজে দেখতে পারেন।

বাবা-মা কী কী খেয়াল রাখবেন?

শিশু সব সময় ক্লান্ত থাকলে প্রথমেই কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য করুন।

ঘুমের সময়: প্রতিদিন পর্যাপ্ত সময় ঘুমাচ্ছে কি না এবং ঘুম বারবার ভেঙে যাচ্ছে কি না।

নাক ডাকা: রাতে জোরে নাক ডাকা, মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া বা ঘুমের মধ্যে হাঁসফাঁস করছে কি না।

খাবার: সকালের নাশতা করছে কি না এবং খাবারে পর্যাপ্ত পুষ্টি রয়েছে কি না।

পর্দার ব্যবহার: ঘুমানোর ঠিক আগে মোবাইল, ট্যাব বা টেলিভিশন ব্যবহার করছে কি না।

আচরণ: আগের তুলনায় চুপচাপ হয়ে গেছে কি না, অতিরিক্ত খিটখিটে হচ্ছে কি না বা খেলাধুলায় আগ্রহ কমেছে কি না।

শারীরিক পরিবর্তন: ওজন, উচ্চতা, ত্বক বা শরীরের অন্য কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ছে কি না।

এসব তথ্য চিকিৎসককে সমস্যার সম্ভাব্য কারণ বুঝতেও সাহায্য করতে পারে।

ক্লান্তিকে শুধু অলসতা ভাববেন না

শিশু হঠাৎ খেলতে চাইছে না, পড়তে বসলে মনোযোগ দিতে পারছে না বা সব সময় শুয়ে থাকতে চাইছে, এমন পরিস্থিতিতে তাকে অলস বলে বকা দেওয়া সহজ। কিন্তু দীর্ঘদিন এমন চললে এর পেছনে কোনো শারীরিক বা মানসিক কারণ আছে কি না, সেটি আগে বোঝা দরকার।

শিশুর ক্লান্তি অনেক সময় শরীরের একটি সংকেত হতে পারে। কারণটি সাধারণও হতে পারে, আবার চিকিৎসার প্রয়োজন হয় এমন কোনো সমস্যাও থাকতে পারে।

শিশুর মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাভাবিক চঞ্চল শিশু যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে আগের তুলনায় নিস্তেজ থাকে, খেলাধুলায় আগ্রহ হারায়, পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায় বা মেজাজে পরিবর্তন দেখা দেয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।

ঘুম ঠিক হচ্ছে কি না, রাতে নাক ডাকছে কি না, খাবারে আয়রনের ঘাটতি আছে কি না, পর্দার ব্যবহার বেশি হচ্ছে কি না, থাইরয়েডের সমস্যা বা মানসিক চাপ রয়েছে কি না, এসব কারণ বিবেচনা করা দরকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুর আচরণে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন দেখলে বাবা-মায়ের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া। প্রয়োজন হলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। কারণ সময়মতো কারণ শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যার সমাধান সহজ হয়।

সূত্র: এনডিটিভি