logo

বাথরুমে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক বেশি হয় কেন, ঝুঁকি এড়াবেন কিভাবে

বাথরুমে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক বেশি হয় কেন, ঝুঁকি এড়াবেন কিভাবে
ছবি: হেলথশটস

একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, অন্যান্য জায়গার তুলনায় বাথরুমে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক বেশি হয়। বাথরুমে গোসল করা বা টয়লেট ব্যবহার করা আমাদের প্রতিদিনের স্বাভাবিক একটি কাজ। কিন্তু বাথরুমেই কেন স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেশি থাকে- এই প্রশ্ন হয়তো অনেকের মনেই আসে।

বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি হতে পারে। হঠাৎ তাপমাত্রার পরিবর্তন, মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া বা দ্রুত উঠে দাঁড়ানোর কারণে শরীরে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে।

স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, বাথরুমে হার্ট অ্যাটাক, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা স্ট্রোকের ঝুঁকির পেছনে কয়েকটি শারীরিক কারণ কাজ করতে পারে। তবে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক এক বিষয় না। এগুলোর কারণ ও লক্ষণও আলাদা হতে পারে।

বাথরুমে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হওয়ার কারণ

যখন হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি হয়ে হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায় বা কার্যকরভাবে রক্ত পাম্প করতে পারে না, তখনই কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ঘটে থাকে। এর ফলে মস্তিষ্কসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত পৌঁছানো বন্ধ হয়ে যায়।

বাথরুমে কয়েকটি কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। যেমন-

মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া

কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে অনেকেই মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে ‘ভালসালভা ম্যানুভার’ বলা হয়। এতে বুকের ভেতরের চাপ পরিবর্তিত হয়ে হৃদযন্ত্রে রক্ত চলাচলে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে।

যাদের আগে থেকেই হৃদরোগ আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই চাপ বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া টয়লেট ব্যবহারের সময় ভেগাস নার্ভের প্রভাবে হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ কমে মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে।

অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা পানিতে গোসল

খুব ঠান্ডা (৭০° ফারেনহাইটের নিচে) অথবা খুব গরম (১১২° ফারেনহাইটের উপরে) পানিতে গোসল করলে তা দ্রুত হৃদস্পন্দনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। হঠাৎ অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে এলে শরীরের রক্তনালি ও হৃৎস্পন্দনে পরিবর্তন হতে পারে। এতে হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।

বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য খুব গরম পানিতে দীর্ঘ সময় গোসল করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বুক পর্যন্ত গরম পানিতে ডুবে থাকলেও শরীরের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

বাথরুম থেকে দ্রুত উঠে দাঁড়ানো

অনেকক্ষণ বসে থাকার পর হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে কারও কারও রক্তচাপ কমে যেতে পারে। একে অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন বলা হয়। এর ফলে মাথা ঘোরা, চোখে অন্ধকার দেখা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত পাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

ওষুধ ও অন্যান্য দ্রব্য

কিছু ওষুধের অতিরিক্ত মাত্রা হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ঘুমের ওষুধ বা শরীর শিথিলকারী ওষুধ গ্রহণের পর অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

বাথরুমে স্ট্রোকের ঝুঁকির কারণ কী?

যখন মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় বা মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ ঘটে, তখনই স্ট্রোক হয়। উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ।

বাথরুমে গোসলের সময় তাপমাত্রার আকস্মিক পরিবর্তন রক্তচাপের ওঠানামা ঘটাতে পারে। আবার মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়াও রক্তচাপের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ বা রক্তনালির সমস্যা থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা জরুরি।

তবে শুধু মাথায় শুরুতে পানি ঢাললেই স্ট্রোক হয়, এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই এ ধরনের কথায় আতঙ্কিত না হয়ে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি।

বাথরুমে বিপদের লক্ষণ কী কী?

গোসল বা টয়লেট ব্যবহারের সময় নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবহেলা করা উচিত না-

• বুকে ব্যথা বা চাপ অনুভব করা

• হঠাৎ শ্বাসকষ্ট হওয়া

• মাথা ঘোরা ও জ্ঞান হারানো

• হঠাৎ বমি হওয়া বা প্রচণ্ড দুর্বলতা

• মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া

• শরীরের এক পাশের হাত বা পা দুর্বল হয়ে যাওয়া

• কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বলতে সমস্যা হওয়া

• হঠাৎ দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা দেখা দেওয়া

এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। লক্ষণ কিছুক্ষণ পর ভালো হয়ে গেলেও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

বাথরুমে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে যা করবেন

কিছু সাধারণ সতর্কতা মেনে চললে বাথরুমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। যেমন-

• গোসলের সময় অতিরিক্ত গরম বা বরফঠান্ডা পানি ব্যবহার করবেন না।

• দীর্ঘ সময় গরম পানিতে ডুবে থাকবেন না। বিশেষ করে হৃদরোগীদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

• মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে খাবারে আঁশযুক্ত শাকসবজি, ফলমূল এবং পর্যাপ্ত পানি রাখুন।

• গোসল বা টয়লেট ব্যবহারের পর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান। মাথা ঘুরলে বসে পড়ুন।

• বাথরুমের মেঝে শুকনো ও পরিষ্কার রাখুন। পিচ্ছিল মেঝেতে অ্যান্টি-স্লিপ ম্যাট ব্যবহার করতে পারেন।

• বয়স্ক ও হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাথরুমে প্রয়োজন অনুযায়ী হাতল বা গ্র্যাব বার লাগানো যেতে পারে।

• বাথরুমে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে পরিবারের কাউকে জানিয়ে রাখুন। জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত সাহায্য পাওয়ার ব্যবস্থা রাখুন।

• উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ থাকলে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং ওষুধ সঠিকভাবে গ্রহণ করুন।

বাথরুমে হঠাৎ অসুস্থ হলে কী করবেন?

বাথরুমে কেউ হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেলে বা বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট অনুভব করলে দ্রুত পরিবারের সদস্য বা আশপাশের কাউকে জানান। জরুরি চিকিৎসাসেবায় যোগাযোগ করুন। কেউ অচেতন হয়ে গেলে বা স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে জরুরি সহায়তা ডেকে প্রশিক্ষণ থাকলে সিপিআর শুরু করতে হবে। দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ক্ষেত্রে জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাথরুমে গোসল বা টয়লেট ব্যবহারের সময় সামান্য সতর্কতা অনেক বড় দুর্ঘটনা এড়াতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি ও হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে বাড়তি সচেতন থাকা জরুরি।

সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম হেলথলাইনে ‘Why Does Cardiac Arrest Happen in the Bathroom?’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সাবিহা তাবাসসুম শুচি।