logo

শুধু মন খারাপেই নয়, যে ৭ কারণে বাড়তে পারে খাওয়ার প্রবণতা

শুধু মন খারাপেই নয়, যে ৭ কারণে বাড়তে পারে খাওয়ার প্রবণতা
ছবি: এলিভেট কাউন্সেলিং

মন খারাপ হলে প্রিয় খাবার খেতে ইচ্ছা করে, কাজের চাপ বাড়লে চিপস বা মিষ্টি খাওয়ার দিকে হাত চলে যায়। আবার ভালো খবর পেলে প্রিয় খাবার অর্ডার করে উদ্‌যাপন করার অভ্যাসও অনেকের আছে। এসব অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবেগের বশে খাওয়ার প্রবণতা, যার ইংরেজি নাম ইমোশনাল ইটিং।

অনেকেই মনে করেন, দুঃখ, একাকিত্ব বা মানসিক চাপ থেকেই শুধু এমন অভ্যাস তৈরি হয়। কিন্তু আনন্দ, উত্তেজনা, সামাজিক অনুষ্ঠান, এমনকি একঘেয়েমিও খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়াতে পারে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে একটি গবেষণার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের আবেগই মানুষের খাওয়ার অভ্যাসকে প্রভাবিত করতে পারে।

আবেগের কারণে মাঝেমধ্যে পছন্দের খাবার খাওয়া স্বাভাবিক। তবে যখন ক্ষুধা না থাকলেও বারবার খেতে ইচ্ছা করে, খাবারকে মানসিক চাপ সামলানোর প্রধান উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়, কিংবা খাওয়ার পর অপরাধবোধ তৈরি হয়, তখন বিষয়টি নিয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

আবেগের বশে খাওয়ার ৭টি কারণ

মানসিক চাপ ও কাজের চাপ

কাজের সময়সীমা, আর্থিক দুশ্চিন্তা, পারিবারিক সমস্যা বা কর্মক্ষেত্রের চাপ থেকে অনেকের মানসিক অস্বস্তি তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে মিষ্টি, চিপস বা তেলযুক্ত খাবার খেতে ইচ্ছা করতে পারে। এসব খাবার সাময়িক স্বস্তি দিলেও মানসিক চাপের মূল কারণ দূর করে না।

যা করতে পারেন: কাজের ফাঁকে একটু বিরতি নিন, কিছুক্ষণ হাঁটুন, ধীরে ধীরে শ্বাস নিন অথবা কাছের কারও সঙ্গে কথা বলুন। সত্যিই ক্ষুধা লাগলে খাবার এড়িয়ে না গিয়ে পেট ভরে এমন খাবার খান।

আনন্দ, উত্তেজনা ও উদ্‌যাপন

শুধু মন খারাপ হলেই যে বেশি খেতে ইচ্ছা করবে, তা নয়। জন্মদিন, বিয়ে, চাকরিতে পদোন্নতি অথবা পরীক্ষায় ভালো ফলের আনন্দেও অনেকে পছন্দের খাবার খান। আনন্দের সঙ্গে খাবারের সম্পর্ক তৈরি হওয়ায় এমন অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে।

যা করতে পারেন: আনন্দের মুহূর্তে প্রিয় খাবার উপভোগ করুন। তবে শুধু উদ্‌যাপনের নিয়ম বলে খাচ্ছেন, নাকি সত্যিই খেতে ইচ্ছা করছে, তা খেয়াল করুন। পছন্দের খাবার খাওয়ার জন্য নিজেকে অপরাধী ভাবার প্রয়োজন নেই।

একাকিত্ব, দুঃখ ও হতাশা

একাকিত্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন বা কোনো বিষয়ে হতাশ হলে কেউ কেউ খাবারের মধ্যে সাময়িক সান্ত্বনা খোঁজেন। পছন্দের খাবার খেলে কিছু সময়ের জন্য মন ভালো লাগতে পারে। কিন্তু যে অনুভূতি থেকে খাওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয়েছে, সেটি থেকে যেতে পারে।

যা করতে পারেন: বন্ধু বা পরিবারের কারও সঙ্গে কথা বলুন, নিজের অনুভূতি লিখে রাখুন বা পছন্দের কাজে সময় দিন। দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

একঘেয়েমি ও অমনোযোগীভাবে খাওয়া

টেলিভিশন দেখা, মোবাইলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার বা দীর্ঘ সময় কম্পিউটারে কাজ করার সময় অনেকে অজান্তেই বারবার কিছু না কিছু খেতে থাকেন। তখন খাবার খাওয়ার পেছনে শারীরিক ক্ষুধার চেয়ে একঘেয়েমি বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

যা করতে পারেন: খাওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, সত্যিই ক্ষুধা লেগেছে, নাকি সময় কাটানোর জন্য খাচ্ছেন? নাশতা খেলে নির্দিষ্ট পরিমাণ একটি পাত্রে নিয়ে খান। সম্ভব হলে খাওয়ার সময় মোবাইল বা টেলিভিশনের দিকে মনোযোগ না দিয়ে খাবারের স্বাদ ও পেট ভরার অনুভূতি খেয়াল করুন।

ক্লান্তি ও পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব

ঘুম কম হলে বা সারাদিন পরিশ্রমের পর ক্লান্ত থাকলে খাবারের প্রতি আকর্ষণ এবং খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন আসতে পারে। এ সময় সহজে পাওয়া যায় এমন মিষ্টি বা বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার বেছে নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যেতে পারে।

যা করতে পারেন: নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলুন। ব্যস্ততার মধ্যেও খাবারের পরিকল্পনা করে রাখুন, যাতে অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগার পর তাড়াহুড়ো করে খাবার বেছে নিতে না হয়।

খাবার বাদ দেওয়া ও অতিরিক্ত ডায়েটিং

ওজন কমানোর জন্য সকালের নাশতা বাদ দেওয়া, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বা খাবারের পরিমাণ অতিরিক্ত কমিয়ে দেওয়া পরে তীব্র ক্ষুধা তৈরি করতে পারে। তখন মিষ্টি বা মুখরোচক খাবার খাওয়ার ইচ্ছা বেড়ে যেতে পারে। সব ধরনের খাবারকে নিষিদ্ধ ভাবলেও কোনো খাবারের প্রতি আকর্ষণ আরও বাড়তে পারে।

যা করতে পারেন: নিয়মিত ও সুষম খাবার খান। ভাত বা রুটি পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বদলে খাবারের পরিমাণ এবং পুষ্টির ভারসাম্যের দিকে নজর দিন। ডাল, ডিম, মাছ, শাকসবজি, ফল ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন।

সামাজিক পরিবেশ ও খাবারের অভ্যাস

বাড়িতে অতিথি এলে, অফিসে সহকর্মীরা নাশতা আনলে বা কোনো উৎসবের সময় সামনে খাবার থাকলে অনেকেই ক্ষুধা না থাকলেও খেতে শুরু করেন। খাবারের গন্ধ, ছবি অথবা নির্দিষ্ট সময়ে চা-নাশতা খাওয়ার অভ্যাসও খাওয়ার ইচ্ছা বাড়াতে পারে।

যা করতে পারেন: অন্য কেউ খাবার দিচ্ছেন বলে খেতেই হবে, এমনটা না। নিজের ক্ষুধা ও ইচ্ছা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিন। পছন্দের খাবার অল্প পরিমাণে খেতে পারেন, আবার ইচ্ছা না হলে বিনয়ের সঙ্গে না-ও বলতে পারেন।

আবেগের কারণে খাওয়ার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করবেন যেভাবে

আবেগের কারণে খাওয়ার প্রবণতা কমাতে প্রথমেই নিজের অভ্যাস বুঝতে হবে। এর জন্য কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করা যেতে পারে।

খাওয়ার আগে একটু থামুন: হঠাৎ কিছু খেতে ইচ্ছা করলে ভাবুন, কখন শেষবার খেয়েছেন এবং এখন শারীরিক ক্ষুধা লাগছে কি না। তবে ক্ষুধা লাগলে নিজেকে জোর করে না খাইয়ে রাখবেন না।

খাবার ও মনের অবস্থার নোট রাখুন: কখন কী খাচ্ছেন, তখন কেমন অনুভব করছেন এবং কী ঘটেছে, তা লিখে রাখুন। এতে কোন পরিস্থিতিতে খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, তা বুঝতে সুবিধা হবে।

খাবারের পরিকল্পনা করুন: নিয়মিত খাবার খান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর নাশতা কাছে রাখুন। এতে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে অতিরিক্ত ক্ষুধা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।

বিকল্প অভ্যাস গড়ে তুলুন: মন খারাপ বা একঘেয়েমি লাগলে হাঁটা, গান শোনা, বই পড়া কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করুন।

নিজেকে দোষ দেবেন না: একদিন বেশি খেয়ে ফেললেই সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায় না। পরের বেলা না খেয়ে থাকার মতো শাস্তিমূলক পদ্ধতি না নিয়ে স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে আসুন।

কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?

মাঝেমধ্যে আবেগের কারণে খাওয়া স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। তবে বারবার খাওয়ার সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, পেট ভরে যাওয়ার পরও অস্বস্তি হওয়া পর্যন্ত খাওয়া, খাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তীব্র লজ্জা বা অপরাধবোধে ভোগা বা খাওয়ার পর বমি করার চেষ্টা করা উদ্বেগের লক্ষণ হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসক, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। এসব লক্ষণ থাকলেই যে কারও খাওয়াজনিত রোগ হয়েছে, তা না। তবে প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নের মাধ্যমে উপযুক্ত সহায়তা দিতে পারেন।

আবেগের বশে খাওয়ার পেছনে শুধু দুঃখ বা মানসিক চাপ না, আনন্দ, ক্লান্তি, একঘেয়েমি, সামাজিক পরিবেশ ও অনিয়মিত খাবারের অভ্যাসও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই বারবার খেতে ইচ্ছা করলেই নিজেকে দুর্বল ভাবার প্রয়োজন নেই। বরং কখন, কেন এবং কোন পরিস্থিতিতে এমন ইচ্ছা তৈরি হচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে আলোচিত গবেষণায় ওজন কমানোর সাফল্যের সঙ্গে ইতিবাচক ও নেতিবাচক আবেগের কারণে খাওয়ার প্রবণতা কম থাকা এবং খাবারের প্রতি আকর্ষণ কম থাকার সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে এ ধরনের সম্পর্ক থেকেই প্রমাণ হয় না যে আবেগের কারণে খাওয়া কমালেই ওজন কমবে। গবেষণাটি মূলত একটি নির্দিষ্ট ওজন নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া মানুষের ওপর করা হয়েছে।

সুষম খাবার, নিয়মিত ঘুম, শরীরচর্চা এবং মানসিক চাপ সামলানোর স্বাস্থ্যকর উপায় গড়ে তোলা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। লক্ষ্য হওয়া উচিত খাবার উপভোগ করা বন্ধ করা নয়, বরং শারীরিক ক্ষুধা ও আবেগের কারণে খাওয়ার ইচ্ছার পার্থক্য বুঝে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া।

তথ্যসূত্র

NDTV: Emotional Eating Isn't Just About Sadness, Says Study

MedlinePlus: Break the bonds of emotional eating

University Hospitals Sussex: Managing Emotional Eating

American Heart Association: Why Do I Eat When I’m Not Hungry?