ঘাম না ঝরিয়ে প্রতিদিনের ছোট অভ্যাসেই ফিট থাকার সহজ উপায়

সারাদিন কাজের ব্যস্ততা শেষে বাসায় ফিরে ক্লান্ত শরীরে আলাদা করে জিমে যাওয়ার সময় বা ইচ্ছাটাই আর থাকে না। কিন্তু ফিট থাকতে হলে তো শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামেরও দরকার আছে।
শুধু ঘাম ঝরিয়ে ব্যায়াম করলেই সুস্থ থাকতে পারবেন তা না। অতিরিক্ত কষ্ট না করেও প্রতিদিনের ছোটোখাটো কিছু অভ্যাসের পরিবর্তনের মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখা সম্ভব। একে বলা যায় ‘নট ট্রাইং টু এক্সারসাইজ’ বা অতিরিক্ত চেষ্টা ছাড়াই শরীরকে সচল রাখা।
চলুন জেনে নেওয়া যাক কীভাবে কোনো বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই আপনি আপনার দৈনন্দিন জীবনের কাজের মাধ্যমে শরীরকে সক্রিয় রাখতে পারবেন।
‘ন্যাচারাল মুভমেন্ট’ বা স্বাভাবিক নড়াচড়া
শরীর মূলত নড়াচড়া করার জন্যই তৈরি, এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকার জন্য না। কিন্তু সারাদিন অফিসে বসে কাজ করা, পড়াশোনা করা, বাসায় ফিরে শুয়ে রিলস দেখার মাঝে আমাদের শরীর আলাদাভাবে নড়াচড়ার সময়ই পায় না।
আপনি চাইলে নিজের কাজের ফাঁকে ছোট ছোট নড়াচড়া বা মুভমেন্টের মাধ্যমে শরীরকে সচল রাখতে পারেন।
সিঁড়ির ব্যবহার: অফিস হোক বা শপিংমল, লিফটের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা না করে সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারেন। এই ছোট অভ্যাসটি আপনার পায়ের পেশীকে সচল রাখতে বেশ ভালো কাজ করবে।

একটানা বসে না থাকা: অফিসে বা পড়ার টেবিলে একটানা এক বা দুই ঘণ্টার বেশি বসে থাকবেন না। মাঝেমধ্যে উঠে একটু দাঁড়িয়ে দুই হাত উপরের দিকে প্রসারিত করুন, ঘরের ভেতর সামান্য হেঁটে আসুন। এই ছোট বিরতিগুলো রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
ঘরের কাজ নিজে করা: কাজের লোক বা গৃহকর্মীর ওপর শতভাগ নির্ভর না করে নিজের ঘরের ছোটখাটো কাজগুলো নিজের হাতে করার অভ্যাস করুন। ঘর মোছা, কাপড় গোছানো বা বাগান করার মতো কাজগুলো কিন্তু বেশ ভালো মানের শারীরিক পরিশ্রম। এগুলোর মাধ্যমে আপনি জিম করার মতোই উপকার পেতে পারেন।
হাঁটার অভ্যাস: ফিটনেস ঠিক রাখতে হাঁটার অভ্যাস খুবই কার্যকরী। তবে হেঁটে কতটা উপকৃত হবেন তা আপনার হাঁটার গতির ওপর নির্ভর করে। সাধারণ অলস গতিতে হাঁটলে শরীরের ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়ে না। তাই হাঁটার সময় কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। যেমন-
- দ্রুত পায়ে হাঁটার অভ্যাস: যখনই হাঁটার সুযোগ পাবেন, একটু গতি বাড়িয়ে হাঁটুন। অলস গতিতে হেঁটে সময় নষ্ট করার চেয়ে একটু দ্রুত হাঁটলে হৃদপিণ্ড ও ফুসফুস সক্রিয় থাকতে পারে।

- দূরত্ব বাড়িয়ে হাঁটুন: গন্তব্যের একদম সামনে রিকশা বা গাড়ি থেকে না নেমে একটু দূরে নামুন, বাকি পথটুকু হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করুন। অফিস বা বাজার করে ফেরার পথে এই কৌশলটি আপনাকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করতে পারে।
- হাঁটার সময় একটু চ্যালেঞ্জ নিতে পারেন: সবসময় সমতল বা আরামদায়ক রাস্তায় না হেঁটে, মাঝে মাঝে একটু ভিন্ন কিছু করতে পারেন। যেমন- একটু উঁচু-নিচু বা ঢালু রাস্তা দিয়ে হাঁটার অভ্যাস করুন। ঢালু পথে হাঁটলে মাধ্যাকর্ষণের টানে পায়ের পেশির ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এটি সমতলে হাঁটার চেয়ে অনেক বেশি ক্যালোরি ঝরাতে সাহায্য করে।
ইউরোপের দেশগুলোতে বর্তমানে নর্ডিক ওয়াকিং (Nordic Walking) বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই পদ্ধতিতে হাঁটার সময় বিশেষ ধরনের দুটি ওয়াকিং পোল বা লাঠি ব্যবহার করা হয়। এর ফলে শরীরের নিচের অংশের সঙ্গে ওপরের অংশ তথা কাঁধ, পিঠ ও হাতের পেশীও সমানভাবে সক্রিয় থাকে।

এছাড়া খালি হাতে হাঁটার চেয়ে বাজারের ভারী ব্যাগ হাতে নিয়েও কিছুটা পথ হেঁটে আসতে পারেন। এটি ক্যালোরি বার্ন হতে বেশি সাহায্য করে।
সবুজের সান্নিধ্যে যান
যান্ত্রিক শহরে এসি রুমে বন্দি না থেকে বাইরে থেকে একটু হেঁটে আসতে পারেন। ছুটির দিনে বা বিকেলে একটু সময় বের করে কোনো পার্ক, মাঠ বা সবুজ পরিবেশে হাঁটলে শরীর ও মন দুটোই চাঙা হয়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সবুজ প্রকৃতির মাঝে সময় কাটালে মানুষের মানসিক চাপ বা স্ট্রেস দ্রুত কমে যায়। আর মানসিক চাপ কম থাকলে শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে। এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই বিকেলে বা সন্ধ্যার একটু আগে কাছাকাছি কোনো সবুজে ঘেরা পার্কে ঘুরে আসতে পারেন।

সুস্থ বা ফিট থাকা মানে কিন্তু বাড়তি চাপ নিয়ে ব্যায়াম করা না। আপনার দৈনন্দিন ছোট ছোট অভ্যাসের মাধ্যমেই সুস্থ ও সুন্দর থাকা সম্ভব। লিফট ছেড়ে সিঁড়ি ব্যবহার করা, একটু দূরে নেমে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানো বা কাজের ফাঁকে শরীরটাকে একটু সচল রাখা; এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোই আপনাকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করতে পারে।
সূত্র: যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে ‘How we can exercise more without even trying’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সাবিহা তাবাসসুম শুচি।
