প্রচণ্ড মাথাব্যথা দূর করতে যা করবেন

মাথাব্যথা এমন একটি সমস্যা যা প্রায় সব মানুষই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অনুভব করেন। কখনও দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা মোবাইল ব্যবহার, কখনও মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি, পানিশূন্যতা বা অনিয়মিত খাবারের কারণেও মাথাব্যথা শুরু হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এটি সাময়িক সমস্যা হলেও, কাজের সময় বা দৈনন্দিন জীবনে এটি বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাথাব্যথার ধরন একাধিক হতে পারে। এরমধ্যে টেনশনজনিত মাথাব্যথা, মাইগ্রেন এবং সাইনাসজনিত মাথাব্যথা বেশ সাধারণ। কিছু ক্ষেত্রে উজ্জ্বল আলো, তীব্র গন্ধ, আবহাওয়ার পরিবর্তন বা অতিরিক্ত ক্লান্তিও মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। আবার অনেকেই দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে বা পর্যাপ্ত পানি পান না করলে মাথাব্যথায় ভোগেন।
তবে ভালো খবর হলো, বেশির ভাগ সাধারণ মাথাব্যথা ঘরোয়া কিছু সহজ উপায় অনুসরণ করেই কমানো সম্ভব। ঠান্ডা বা গরম সেঁক, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পানি পান, হালকা ম্যাসাজ কিংবা খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন অনেক সময় দ্রুত স্বস্তি দিতে পারে। এসব পদ্ধতি শুধু ব্যথা কমাতে নয়, অনেক ক্ষেত্রে মাথাব্যথা আরও বাড়া থেকেও বাঁচাতে সাহায্য করে।
মাথাব্যথা কমানোর কিছু কার্যকর ও সহজ উপায়
ঠান্ডা সেঁক ব্যবহার করুন
মাইগ্রেন ধরনের মাথাব্যথা হলে কপালে ঠান্ডা সেঁক দিলে অনেক সময় আরাম পাওয়া যায়। তোয়ালে দিয়ে মোড়ানো বরফ, ফ্রিজে রাখা সবজি ভর্তি ব্যাগ বা ঠান্ডা পানিতে ভেজানো কাপড় ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রায় ১৫ মিনিট মাথায় ঠান্ডা সেঁক রাখুন। এরপর ১৫ মিনিট বিরতি দিন। প্রয়োজনে আবার ব্যবহার করতে পারেন।
গরম সেঁক ব্যবহার করুন
টেনশনজনিত মাথাব্যথা হলে ঘাড় বা মাথার পেছনের দিকে গরম সেঁক দিলে উপকার পাওয়া যায়। সাইনাসের কারণে মাথাব্যথা হলে মুখের যে অংশে ব্যথা হচ্ছে সেখানে গরম পানিতে ভেজানো কাপড় রাখতে পারেন।
গরম পানিতে গোসল করলেও অনেক সময় মাথাব্যথা কমে যায়।
মাথা বা স্ক্যাল্পের চাপ কমান
অনেক সময় খুব টাইট করে চুল বাঁধা থাকলে মাথাব্যথা হতে পারে। এটিকে বাহ্যিক চাপজনিত মাথাব্যথা বলা হয়। এছাড়া খুব টাইট টুপি, হেডব্যান্ড বা সাঁতারের গগলস পরলেও একই সমস্যা হতে পারে।
এ ধরনের চাপ কমিয়ে দিলে সাধারণত এক ঘণ্টার মধ্যে ব্যথা কমে যেতে পারে।
উজ্জ্বল আলো কমিয়ে দিন
খুব উজ্জ্বল বা ঝলমলে আলো অনেক সময় মাথাব্যথা বাড়িয়ে দেয়। কম্পিউটার বা মোবাইলের স্ক্রিন থেকেও এমন সমস্যা হতে পারে।
এক্ষেত্রে ঘরের আলো কিছুটা কম রাখা, বাইরে গেলে সানগ্লাস ব্যবহার করা এবং কম্পিউটারের স্ক্রিনে অ্যান্টি গ্লেয়ার ব্যবহার করা সহায়ক হতে পারে।
অতিরিক্ত চিবানো এড়িয়ে চলুন
চুইংগাম বেশি চিবালে শুধু চোয়াল নয়, মাথাও ব্যথা করতে পারে। একইভাবে নখ, ঠোঁট বা কলমের মতো জিনিস চিবানোর অভ্যাসও মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
খাবার খাওয়ার সময় খুব শক্ত বা আঠালো খাবার কম খাওয়া এবং ছোট ছোট করে খাওয়া ভালো। যদি রাতে দাঁত ঘষার অভ্যাস থাকে, তবে দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন
শরীরে পানির ঘাটতি হলে মাথাব্যথা হতে পারে। কারণ শরীরের পানি কমে গেলে শরীরের টিস্যুগুলো সংকুচিত হয় এবং মস্তিষ্কের স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ে।
দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। পানি ছাড়াও ইলেকট্রোলাইট সমৃদ্ধ পানীয় বা ওরাল স্যালাইন পান করা যেতে পারে, বিশেষ করে বমি হলে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে যেতে পারে।
নিয়মিত খাবার খান
অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে বা খাবার মিস করলে মাথাব্যথা হতে পারে। তাই পুষ্টিকর খাবার খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
প্রোটিন ও জটিল কার্বোহাইড্রেটযুক্ত হালকা খাবার খেলে শক্তি বজায় থাকে। যাদের এই সমস্যা বেশি হয় তারা দিনে কয়েকবার অল্প অল্প করে খাবার খেতে পারেন।
পরিমিত ক্যাফেইন গ্রহণ করুন
চা বা কফিতে থাকা অল্প পরিমাণ ক্যাফেইন অনেক সময় মাথাব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে। এটি কিছু ব্যথানাশক ওষুধের কার্যকারিতাও বাড়ায়।
তবে অতিরিক্ত ক্যাফেইন খাওয়া ঠিক নয়। কারণ, হঠাৎ ক্যাফেইন কমে গেলে আবার মাথাব্যথা শুরু হতে পারে।
হালকা ম্যাসাজ করুন
কপাল, ঘাড় ও কানের পাশের অংশে কয়েক মিনিট হালকা ম্যাসাজ করলে টেনশনজনিত মাথাব্যথা কমতে পারে।
ঘাড়ের নিচের অংশ ও কাঁধেও ম্যাসাজ করা যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে আকুপ্রেশার পদ্ধতিও উপকারী। হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল ও তর্জনীর মাঝখানের অংশে হালকা চাপ দিলে অনেকের মাথাব্যথা কমে।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন
অনেক সময় সামান্য ঘুম বা বিশ্রাম নিলেই মাথাব্যথা কমে যায়। শান্ত পরিবেশে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলেও উপকার পাওয়া যায়।
তবে দিনের বেলা খুব বেশি ঘুমানো ঠিক নয়, এতে রাতে ঘুমের সমস্যা হতে পারে। পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম অনেক ধরনের মাথাব্যথা প্রতিরোধে সাহায্য করে।
কী কারণে মাথাব্যথা হচ্ছে তা বুঝতে চেষ্টা করুন
মাথাব্যথার কারণ সবার ক্ষেত্রে একরকম নয়। কিছু সাধারণ কারণ হলো
- চকলেট, বাদাম, পুরোনো চিজ, প্রক্রিয়াজাত মাংস বা আচারজাত খাবার
- ক্যাফেইন, কৃত্রিম মিষ্টি বা অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়
- আবহাওয়া বা বায়ুচাপের পরিবর্তন
- ধোঁয়া, পারফিউম বা তীব্র গন্ধ
- মেয়েদের মাসিকের সময় হরমোনের পরিবর্তন
- অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম বা কঠিন ব্যায়াম
মাথাব্যথা কখন হয় তা নোট করে রাখলে অনেক সময় কারণ শনাক্ত করা সহজ হয়।
আদার ব্যবহার করুন
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, আদা মাইগ্রেনের ব্যথা কমাতে সহায়ক হতে পারে। চাইলে আদা চা পান করা বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আদার সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে।
কিছু পুষ্টি উপাদানও মাথা ব্যথা কমাতে উপকারী হতে পারে
কিছু ভিটামিন ও খনিজ উপাদান মাথাব্যথা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
ম্যাগনেসিয়াম : গবেষণায় দেখা গেছে ম্যাগনেসিয়াম মাইগ্রেনের ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে। অনেক প্রাপ্তবয়স্কের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম উপকারী হতে পারে।
রাইবোফ্লাভিন বা ভিটামিন বি২ : এটি দুধ, বাদাম এবং বিভিন্ন শক্তিবর্ধক খাবারে পাওয়া যায়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে এটি মাইগ্রেনের তীব্রতা ও ঘনত্ব কমাতে সাহায্য করতে পারে।
কোএনজাইম কিউ১০ : এটি শরীরে স্বাভাবিকভাবে তৈরি হওয়া একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটি মাথাব্যথার সংখ্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
মেলাটোনিন : এই সাপ্লিমেন্ট ভালো ঘুমে সহায়তা করে। ভালো ঘুম হলে অনেক সময় মাথাব্যথার প্রবণতাও কমে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
নিচের পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি :
- মাথায় আঘাত পাওয়ার পর মাথাব্যথা শুরু হলে
- মাথাব্যথার সঙ্গে মাথা ঘোরা, কথা বলতে সমস্যা, বিভ্রান্তি বা অন্য স্নায়বিক লক্ষণ দেখা দিলে
- হঠাৎ খুব তীব্র মাথাব্যথা শুরু হলে
- ব্যথানাশক ওষুধ নেওয়ার পরও ব্যথা বাড়তে থাকলে
মাথাব্যথা সাধারণ সমস্যা হলেও অনেক সময় এটি দৈনন্দিন কাজকর্মে বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি করে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান এবং কিছু সহজ ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মাথাব্যথা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে যদি মাথাব্যথা বারবার হয় বা অস্বাভাবিকভাবে তীব্র হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সূত্র : ওয়েব এমডি