logo
Advertisement

প্রতিদিন ৭টি ডিম খেলে কোলেস্টেরলের কী হয়, চিকিৎসকেরা যা বলছেন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
প্রতিদিন ৭টি ডিম খেলে কোলেস্টেরলের কী হয়, চিকিৎসকেরা যা বলছেন
পুষ্টিবিদদের মতে, ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।

ডিমকে স্বাস্থ্যকর খাবারের তালিকায় রাখা হয়। এতে ভালো মানের প্রোটিন, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন এমন অনেকেই আবার ডিমকে নিয়মিত খাবারের অংশ করে নেন। কিন্তু তাই বলে প্রতিদিন সাতটি ডিম খাওয়া কি নিরাপদ?

Advertisement

সম্প্রতি ভারতের এক ব্যক্তি সাত মাসে ২০ কেজি ওজন কমানোর অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে জানান, তিনি প্রতিদিন সাতটি সেদ্ধ ডিম খেতেন। তার দাবি, এই সময়ে তার ট্রাইগ্লিসারাইড ২৮০ থেকে কমে ৯৪ এবং মোট কোলেস্টেরল ২০০ থেকে কমে ১৮০ হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে চিকিৎসকেরা ব্যাখ্যা করেছেন, ডিম খাওয়ার কারণেই যে তার কোলেস্টেরল কমেছে, এমনটা বলা যাবে না।

বরং তার খাদ্যাভ্যাসে আরও কিছু বড় পরিবর্তন ছিল। তিনি রুটি, ময়দা ও গমজাতীয় খাবার বাদ দিয়েছিলেন এবং ওজনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছিলেন। এসব পরিবর্তন তার রক্তের চর্বির মাত্রা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

সাতটি ডিমে কতটা কোলেস্টেরল থাকে?

ডিমের কুসুমে খাদ্যতালিকাগত কোলেস্টেরল থাকে। একটি বড় ডিমে প্রায় ১৮৬ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকতে পারে। অর্থাৎ সাতটি পুরো ডিমে প্রায় ১ হাজার ৩০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকতে পারে।

তাই প্রতিদিন সাতটি পুরো ডিম খাওয়ার অভ্যাসকে সাধারণ স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। খাবারে থাকা কোলেস্টেরল আর রক্তের কোলেস্টেরল এক জিনিস নয়। খাবারে কোলেস্টেরল থাকলেই যে রক্তের কোলেস্টেরল একই মাত্রায় বেড়ে যাবে, তা নয়।

তাহলে ওই ব্যক্তির কোলেস্টেরল কমল কীভাবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, তার খাদ্যতালিকায় ডিম ছাড়াও বেশ কিছু পরিবর্তন হয়েছিল।

তিনি রুটি, ময়দা ও অন্যান্য শর্করাজাতীয় খাবার কমিয়েছিলেন। একই সঙ্গে সাত মাসে ২০ কেজি ওজন কমিয়েছেন। ওজন কমা এবং খাবারের ধরনে পরিবর্তন রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইড ও অন্যান্য চর্বির মাত্রায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থাৎ সাতটি ডিম খাওয়ার পর কোলেস্টেরল কমেছে দেখে সাতটি ডিমই এর কারণ, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না।

সহজ করে বললে, একজন মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সবার জন্য একই ফল দেবে না।

ডিম কি তাহলে কোলেস্টেরল বাড়ায়?

বিষয়টি এতটা সরল নয়।

সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক ধারণায় শুধু খাবারে থাকা কোলেস্টেরলের দিকে নজর না দিয়ে পুরো খাদ্যাভ্যাসকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের খাদ্যসংক্রান্ত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমানোর জন্য খাদ্যতালিকাগত কোলেস্টেরল এখন আর প্রধান লক্ষ্য নয়। বরং সম্পৃক্ত চর্বি কমানো, শাকসবজি ও ফল বেশি খাওয়া, পূর্ণ শস্য ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিন বেছে নেওয়া এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ভালো রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ ডিমকে একা দায়ী করার বদলে পুরো খাবারের তালিকা দেখতে হবে।

ডিমের সঙ্গে কী খাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ

ধরুন, কেউ সকালে একটি সেদ্ধ ডিম খেলেন। সঙ্গে শাকসবজি, ডাল বা পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার রাখলেন।

আবার অন্য কেউ ডিমের সঙ্গে নিয়মিত মাখন, বেশি তেলে ভাজা খাবার, প্রক্রিয়াজাত মাংস বা অন্যান্য সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার খেলেন।

দুই ধরনের খাদ্যাভ্যাসে ডিম একই হলেও শরীরের ওপর প্রভাব এক রকম নাও হতে পারে।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান নির্দেশনায়ও সম্পৃক্ত চর্বির বদলে অসম্পৃক্ত চর্বি এবং বেশি শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, বাদাম, বীজ ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রতিদিন সাতটি ডিম খাওয়া কেন ভালো ধারণা নয়?

ডিম পুষ্টিকর হলেও কোনো একটি খাবারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা ভালো নয়।

প্রতিদিন সাতটি ডিম খেলে খাবারের তালিকায় অন্য প্রয়োজনীয় খাবারের জায়গা কমে যেতে পারে। যেমন শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজ থেকে পাওয়া বিভিন্ন পুষ্টি শরীরের জন্য প্রয়োজন।

ভারতীয় পুষ্টিবিদ সুরভি শর্মা বলেছেন, প্রতিদিন রাতের খাবারে সাতটি পুরো সেদ্ধ ডিম খাওয়ার বিষয়টি সুষম খাদ্যতালিকায় ডিম রাখার সঙ্গে এক নয়। অতিরিক্ত একটি খাবারের ওপর নির্ভর করলে খাদ্যতালিকার বৈচিত্র্য কমে যেতে পারে।

রুটি বা গম বাদ দিলেই কি কোলেস্টেরল কমে?

এমন ধারণাও ঠিক নয়।

ওই ব্যক্তি রুটি, ময়দা ও গমজাতীয় খাবার বাদ দিয়েছিলেন। কিন্তু এর মানে এই নয় যে এসব খাবার বাদ দিলেই সবার কোলেস্টেরল কমবে।

বরং পূর্ণ গমে খাদ্যআঁশ থাকে, যা স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। কোলেস্টেরলের ওপর খাবারের ধরন, সম্পৃক্ত চর্বি, শরীরের ওজন, শারীরিক পরিশ্রম, বংশগত বৈশিষ্ট্য এবং প্রয়োজনে ওষুধের প্রভাব থাকতে পারে।

তাই শুধু ওজন কমানোর আশায় রুটি বা গমজাতীয় সব খাবার বাদ দেওয়া প্রয়োজন নেই।

যাদের কোলেস্টেরল বেশি, তারা কি ডিম খাবেন না?

এমনও নয়।

ডিম পুরোপুরি বাদ দিতে হবে কি না, তা ব্যক্তির স্বাস্থ্যঝুঁকি ও খাদ্যতালিকার ওপর নির্ভর করে। যাদের কোলেস্টেরল বেশি, হৃদ্‌রোগ রয়েছে বা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বেশি, তাদের জন্য কতটা ডিম উপযুক্ত তা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে আলোচনা করা ভালো।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের নির্দেশনায় কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম এবং অন্যান্য ঝুঁকির বিষয়গুলো বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ডিমের কুসুম আর সাদা অংশের মধ্যে পার্থক্য কী?

ডিমের বেশির ভাগ কোলেস্টেরল থাকে কুসুমে। অন্যদিকে ডিমের সাদা অংশে কোলেস্টেরল নেই এবং এটি প্রোটিনের ভালো উৎস।

তবে শুধু কুসুম বাদ দিয়ে খাবারকে স্বাস্থ্যকর বানানোই যথেষ্ট নয়। আপনি সারাদিনে কী কী খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন এবং আপনার শরীরের প্রয়োজন কী, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ওজন কমলে কোলেস্টেরলও কমতে পারে

ওজন কমানো অনেকের রক্তের চর্বির মাত্রা উন্নত করতে পারে। ওই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও সাত মাসে ২০ কেজি ওজন কমার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তার ট্রাইগ্লিসারাইড ও মোট কোলেস্টেরলের উন্নতির পেছনে ওজন কমা এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

এখান থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার, কোনো একটি খাবারকে ওজন কমানো বা কোলেস্টেরল কমানোর প্রধান কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের খাবার বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকা তৈরি করতে খাবারে বৈচিত্র্য রাখা জরুরি।

খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন-

  • বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি
  • মৌসুমি ফল
  • ডাল ও অন্যান্য শিমজাতীয় খাবার
  • পূর্ণ শস্য
  • বাদাম ও বীজ
  • মাছ
  • প্রয়োজন অনুযায়ী ডিম ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিন
  • ভালো চর্বিযুক্ত তেল

অন্যদিকে অতিরিক্ত সম্পৃক্ত চর্বি, বেশি লবণ, অতিরিক্ত চিনি এবং অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো উপকারী। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের খাদ্য নির্দেশনাতেও এই সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখে খাদ্যাভ্যাস বদলাবেন না

আজকাল কেউ ওজন কমিয়ে ফেললে বা কোনো খাবার খেয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ভালো ফল পেলে সেই অভিজ্ঞতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু একজনের ক্ষেত্রে কাজ করা খাদ্যাভ্যাস অন্যজনের জন্যও একইভাবে কাজ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

বিশেষ করে কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার ক্ষেত্রে নিজের মতো করে চরম খাদ্যাভ্যাস শুরু করা ঠিক নয়।

২০২৬ সালের হৃৎস্বাস্থ্য নির্দেশনাতেও ব্যক্তির ঝুঁকি অনুযায়ী কোলেস্টেরল মূল্যায়ন ও চিকিৎসা পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তাহলে দিনে কয়টি ডিম?

এর উত্তর সবার জন্য একই নয়। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে পরিমিত ডিম সাধারণত স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন সাতটি পুরো ডিম খাওয়াকে সাধারণ মানুষের জন্য আদর্শ খাদ্যাভ্যাস বলা যায় না।

বিশেষ করে কারও রক্তে কোলেস্টেরল বেশি থাকলে, হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি থাকলে বা চিকিৎসকের পরামর্শে বিশেষ খাদ্যতালিকা অনুসরণ করলে ডিমের পরিমাণ ব্যক্তিগতভাবে নির্ধারণ করা উচিত।

ডিম নিয়ে দীর্ঘদিনের ভয় এখন অনেকটাই বদলেছে। ডিমকে একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, আবার বেশি ডিম খেলেই কোলেস্টেরল কমে যাবে, এমন ধারণাও ঠিক নয়।

একজন ব্যক্তি প্রতিদিন সাতটি ডিম খেয়েও কোলেস্টেরলের রিপোর্টে উন্নতি দেখেছেন। কিন্তু একই সময়ে তার ওজন ২০ কেজি কমেছে এবং খাদ্যতালিকায় বড় পরিবর্তন এসেছে। তাই তার অভিজ্ঞতাকে সাতটি ডিম খাওয়ার উপকার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস তৈরি করা। ডিম সেই খাদ্যতালিকার একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু পুরো খাদ্যতালিকা নয়।

আর কোলেস্টেরল নিয়ে উদ্বেগ থাকলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো খাদ্যচর্চা অনুসরণ করার আগে রক্তের কোলেস্টেরল পরীক্ষা করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

সূত্র: এনডিটিভি