logo

প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস অজান্তেই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়

প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস অজান্তেই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়

ডায়াবেটিস এখন শুধুই কোন ‘বয়সের রোগ’ নয়। যে কোনো বয়সের মানুষই যদি অনিয়মিত জীবনধারা, ভুল খাবারের অভ্যাস, পর্যাপ্ত বিশ্রাম বা শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভাবের শিকার হন, তারা এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। শুধু পরিবারের ইতিহাস বা বয়সের ওপর নির্ভর না করে, আমাদের দৈনন্দিন ছোট ছোট অভ্যাসগুলোও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

আজকের তাড়াতাড়ি জীবনধারা, কাজের চাপ, রাতের সময় পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, প্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকে ঝোঁক, দীর্ঘ সময় বসে থাকা- এসব অভ্যাস অনেক সময় আমরা ছোটখাটো মনে করি। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এই দৈনন্দিন অভ্যাসগুলো মিলিতভাবে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।

অর্থাৎ, বয়স বা পারিবারিক ইতিহাস ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনধারাও এর ওপর প্রভাব ফেলে। কয়েকটি সাধারণ অভ্যাস আপনার ঝুঁকি অনেকটা বাড়াতে পারে। চলুন জেনে নিই কোন অভ্যাসগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কীভাবে এগুলো এড়ানো যায়।

নাশতা এড়ানো

নাশতা খাওয়ার গুরুত্ব নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। তবে ২০১৯ সালে দ্য জার্নাল অব নিউট্রিশনে প্রকাশিত এক বড় রিভিউ অনুসারে, যারা নাশতা এড়ান তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি। মূলত কারণ, যারা সকালে খায় তারা দিনের বাকি অংশে কম খায় এবং স্বাভাবিকভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।

ডায়াবেটিস ও নিউট্রিশন কনসালট্যান্টের মালিক মেলিন্ডা মারিনিউক বলেন, ‘নাশতা এড়ালে দিনের বাকি সময়ে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা থাকে।’ প্রথাগত খাবার না খাইলেও সমস্যা নেই। প্রোটিন ও ফ্যাট (ডিম, পনির, বাদামের মাখন) এবং ফাইবার সমৃদ্ধ কার্বোহাইড্রেট (ফল, হোল-গ্রেইন টোস্ট) অন্তর্ভুক্ত করুন।

কফিপ্রেমীরা খুশি হোন: নিউট্রিশনে-এ প্রকাশিত এক তথ্য অনুযায়ী নিয়মিত কফি (ক্যাফেইনযুক্ত বা ডিক্যাফ) টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

৩০ মিনিটের বেশি বসে থাকা

নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড ডায়াবেটিস প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘ সময় বসে থাকা (কম্পিউটার, সোফা, বা গাড়ির চালকের আসনে) ঝুঁকি বাড়ায়।

২০২১ সালে ডায়াবেটিস কেয়ার (Diabetes Care)-এ প্রকাশিত এক বড় গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে মাত্র ৩০ মিনিট শারীরিক কর্মকাণ্ড করলে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ৬ থেকে ৩১% কমতে পারে। বিশেষভাবে কঠোর ব্যায়াম বেশি উপকার দেয়।

পরামর্শ : প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর উঠে হালকা শারীরিক কর্মকাণ্ড করুন, স্ট্রেচ করুন, ফোনে কথা বলার সময় হাঁটুন।

পর্যাপ্ত ঘুম না নেওয়া

রাতের ঘুমের অভাব ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। ২০২২ সালে ডায়াবেটিস কেয়ারে প্রকাশিত এক স্টাডি অনুসারে ঘুমের সমস্যা যাদের বেশি, তাদের রক্তের শর্করার মাত্রা বেশি থাকে। ঘুমের অভাব হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে, রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায় এবং ইনসুলিন কম নিঃসৃত হয়।

ধূমপান

সিগারেট ধূমপায়ীরা অ-ধূমপায়ীদের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। অতিরিক্ত ধূমপায়ীদের ঝুঁকি আরও বেশি।

পরামর্শ : চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে ধূমপান ত্যাগের পরিকল্পনা করুন। জীবনধারা, মেডিসিন ও নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি সহায়ক হতে পারে।

প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া

সিরিয়াল, ডেলি মিট, মাইক্রোওয়েভ খাবার ইত্যাদি প্রক্রিয়াজাত খাবার দীর্ঘমেয়াদে ওজন বৃদ্ধি, ইনসুলিন প্রতিরোধ এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। ১০% প্রক্রিয়াজাত খাবারের বেশি খেলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ১৫% বাড়তে পারে।

পরামর্শ : উপাদানের লেবেল দেখুন; দীর্ঘ, জটিল ও অপ্রচলিত নাম থাকলে বুঝবেন এটি অত্যধিক প্রক্রিয়াজাত খাবার।

সামাজিক সম্পর্কের অভাব

দীর্ঘ সময় বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলে মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ হয়। গবেষণা দেখিয়েছে, দীর্ঘ সময়ের জন্য একাকীত্ব টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি দ্বিগুণ করতে পারে।

ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে এমন ছোট অভ্যাসগুলো সচেতনভাবে পরিবর্তন করলে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। নিয়মিত ব্রেকফাস্ট খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, মদ সীমিত করা, ধূমপান ত্যাগ, শারীরিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা; এসব অভ্যাসই দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র : এএআরপি