logo

দিনে মাত্র ৪ ঘণ্টা ঘুমিয়েও অনেকে সুস্থ থাকেন কীভাবে

দিনে মাত্র ৪ ঘণ্টা ঘুমিয়েও অনেকে সুস্থ থাকেন কীভাবে
ছবি: বিবিসি

সুস্থ থাকতে বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেন। অনেকে তো ৮-৯ ঘণ্টা ঘুমানোর পরও ক্লান্তবোধ করেন। একদিন একটু ঘুম কম হলেই সারাদিন ঘুমঘুম ভাব দেখা দেয়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগের অভাব, স্মৃতিশক্তির সমস্যা থেকে শুরু করে নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

তবে পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের মাত্র ৪ বা ৫ ঘণ্টা ঘুমালেই চলে। অল্প ঘুমিয়েও তারা পরদিন বেশ সতেজ ও কর্মক্ষম থাকতে পারেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে বিশেষ ধরনের জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। গবেষণায় এমন কিছু জিনের সন্ধানও পাওয়া গেছে, যেগুলো মানুষের ঘুমের সময় ও ঘুমের ঘাটতি সামলানোর ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

কারা অল্প ঘুমিয়ে সুস্থ থাকতে পারেন?

বিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের মানুষকে বলা হয় ‘ফ্যামিলিয়াল ন্যাচারাল শর্ট স্লিপার’ (Familial Natural Short Sleep বা FNSS) । জন্মগতভাবেই তারা অন্যদের তুলনায় কম ঘুমান। সাধারণত ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা ঘুমিয়েই তাদের শরীর প্রয়োজনীয় বিশ্রাম পেয়ে যায় বলে ধারণা করা হয়।

কেন কিছু মানুষের জন্য বেশি ঘুমের দরকার হয়, আবার কারও কম ঘুমালেই চলে? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিনগত গবেষণায় এ প্রশ্নের কিছু উত্তর পাওয়া গেছে।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকোর গবেষকরা মানুষের ঘুমের সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জিনগত পরিবর্তনের সন্ধান পান। গবেষণায় দেখা যায়, যাদের শরীরে এই পরিবর্তন আছে, তারা সাধারণ সময়েই ঘুমাতে যান, কিন্তু অন্যদের তুলনায় অনেক আগে জেগে ওঠেন। তাদের ঘুমের সময় সাধারণত চার থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে থাকে।

গবেষকেরা এই বৈশিষ্ট্যের নাম দেন ফ্যামিলিয়াল ন্যাচারাল শর্ট স্লিপ। পরবর্তী সময়ে কম ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত আরও কয়েকটি জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়েছে।

DEC2, ADRB1, NPSR1 এবং GRM1-এর মতো জিন নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, এগুলো ঘুম ও জেগে থাকার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে সব জিনের কার্যপ্রণালি এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।

অল্প ঘুমেও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ঠিক থাকে কীভাবে?

এ ধরনের মানুষজন অল্প ঘুমিয়েও কেন ক্লান্তি বা স্মৃতিশক্তির সমস্যায় ভোগেন না? গবেষকদের ধারণা, তাদের মস্তিষ্ক ঘুমের সময় প্রয়োজনীয় কাজগুলো তুলনামূলক দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারে। বিশেষ করে গভীর ঘুমের পর্যায় তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় যমজ দুই ভাইয়ের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। তাদের মধ্যে একজনের শরীরে কম ঘুমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত পরিবর্তন ছিল, অন্যজনের ছিল না। দুজনকে টানা ৩৮ ঘণ্টা জাগিয়ে রাখার পর তাদের কর্মক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, কম ঘুমানোর বৈশিষ্ট্য থাকা ভাইটির মনোযোগ ও কর্মক্ষমতায় ভুলের পরিমাণ অন্য ভাইয়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম ছিল।

আরও একটি বিষয় গবেষকদের নজরে আসে। যে নিয়মিত কম ঘুমায়, তার নন-র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট বা নন-REM ঘুমের সময় প্রায় সমান ছিল। এই পর্যায়ের মধ্যেই গভীর ঘুম অন্তর্ভুক্ত থাকে। অর্থাৎ মোট ঘুমের সময় কম হলেও গুরুত্বপূর্ণ ঘুমের পর্যায়গুলো তিনি প্রায় একই পরিমাণে পাচ্ছিলেন।

কম ঘুম কি আলঝেইমারের ঝুঁকি কমাতে পারে?

২০১৯ সালের একটি গবেষণায় ইঁদুরের শরীরে কম ঘুমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জিনগত পরিবর্তন যুক্ত করা হয়। গবেষকরা দেখতে পান, এসব ইঁদুর কম ঘুমালেও তাদের স্মৃতিশক্তির সমস্যা তুলনামূলক কম ছিল।

অন্য একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, এ ধরনের কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকা ইঁদুরের মধ্যে আলঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের পরিবর্তনও তুলনামূলক কম দেখা যায়।

এসব গবেষণা প্রাণীর ওপর পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রভাব পাওয়া যাবে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।


কম ঘুমানোর জিন থাকলেই কি সুস্থ থাকা যায়?

জিনগতভাবে কম ঘুমানোর প্রবণতা থাকলেই যে কেউ কম ঘুমিয়ে সুস্থ থাকবেন, এমন না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে অনিদ্রা, অতিরিক্ত ক্লান্তি আর বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সম্পর্ক আছে। এর মধ্যে বিষণ্নতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও অন্তর্ভুক্ত।

অন্যদিকে, বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত সন্তান জন্ম দিয়েছেন এমন ৩৪৩ জন নারীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় ভিন্ন ফল পাওয়া যায়। যাদের জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবেই কম ঘুমানোর প্রবণতা বেশি ছিল, তাদের প্রসব-পরবর্তী সাইকোসিসের ঝুঁকি তুলনামূলক কম দেখা যায়। একই প্রবণতা অনিদ্রার ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা হয়েছিল।

তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে।

কম ঘুমিয়েও ক্লান্তি না আসা স্বাভাবিক কি না

অনেকেই মনে করেন, প্রতিদিন চার থেকে ছয় ঘণ্টা ঘুমানোর পরও যখন ক্লান্ত লাগছে না, তার মানে এতটুকু ঘুমই যথেষ্ট। কিন্তু বিজ্ঞানীরা মনে করেন, নিজের কর্মক্ষমতা সম্পর্কে মানুষের ধারণা সব সময় সঠিক নাও হতে পারে।

একটি গবেষণায়, প্রাপ্তবয়স্কদের টানা দুই সপ্তাহ প্রতিদিন মাত্র চার বা ছয় ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এ সময়ে তাদের বিভিন্ন মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে তাদের পরীক্ষার ফল খারাপ হতে থাকে। অথচ অংশগ্রহণকারীরা ঘুমঘুম ভাব বা ক্লান্তি বোধ করেননি বলে জানিয়েছিলেন।

দীর্ঘদিন কম ঘুমালে মানুষের কর্মক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে সেই দুর্বলতা সম্পর্কে নিজের সচেতনতাও কমে যেতে পারে। ফলে কেউ নিজেকে স্বাভাবিক মনে করলেও তার মনোযোগ কমে যেতে পারে।

স্বাভাবিকভাবে কম ঘুমানোর বৈশিষ্ট্য একটি বিরল জিনগত ব্যাপার। তাই অন্য কাউকে চার ঘণ্টা ঘুমিয়ে সুস্থ থাকতে দেখে নিজের ঘুমের সময় কমিয়ে ফেলা ঠিক না। সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য চিকিৎসকেরা প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শই দিয়ে থাকেন।

তথ্যসূত্র

BBC Future: The People Who Only Need Four Hours' Sleep

BrainFacts: The Ones Who Need Little Sleep