দিনে বার বার চা পান করেন, কিডনিতে পাথরের ঝুঁকি কতটা জেনে নিন

চা বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে আছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা, অফিসে কাজের ফাঁকে আরেক কাপ, বিকেলে আড্ডায় চা, রাতে আবার ক্লান্তি কাটাতে এক কাপ। অনেকের ক্ষেত্রে দিনে দু-তিন কাপের জায়গায় এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় পাঁচ, ছয় এমনকি সাত-আট কাপেও।
তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, এত বেশি চা পান করলে কি কিডনির ক্ষতি হতে পারে? বিশেষ করে কিডনিতে পাথর হওয়ার সঙ্গে চায়ের কোনো সম্পর্ক আছে কি?
বিষয়টি নিয়ে প্রচলিত অনেক কথাই শোনা যায়। কেউ বলেন চায়ে থাকা অক্সালেট কিডনিতে পাথর তৈরি করে। আবার কেউ মনে করেন চা বেশি খেলে শরীর পানিশূন্য হয়ে যায় এবং সেখান থেকেই পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। চা পান এবং কিডনিতে পাথর হওয়ার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণায় একেবারে একই ফল পাওয়া যায়নি। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে বরং বেশি চা পানের সঙ্গে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অন্যদিকে একটি গবেষণায় দিনে চার বা তার বেশি গ্লাস চা পানকারীদের মধ্যে ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথরের ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে।
তাই শুধু চাকে কিডনিতে পাথরের জন্য দায়ী করা ঠিক নয়। তবে যারা অতিরিক্ত চা পান করেন এবং একই সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান করেন না, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
কিডনিতে পাথর কীভাবে তৈরি হয়?
কিডনিতে পাথর হলো শক্ত, ছোট পাথরের মতো পদার্থ, যা প্রস্রাবের মধ্যে থাকা কিছু খনিজ ও লবণ বেশি ঘন হয়ে গেলে তৈরি হতে পারে। ক্যালসিয়াম, অক্সালেট ও ফসফরাসের মতো উপাদানের মাত্রা বেড়ে গেলে পাথর তৈরির পরিবেশ তৈরি হয়।
সব পাথর এক ধরনের নয়। ক্যালসিয়াম অক্সালেট, ক্যালসিয়াম ফসফেট, ইউরিক অ্যাসিড এবং সিস্টিন পাথর প্রধান কয়েকটি ধরন।
কোন ধরনের পাথর হয়েছে, তার ওপর খাবার ও জীবনযাপনের পরামর্শও বদলে যেতে পারে।
চায়ে থাকা অক্সালেট কি পাথর তৈরি করে?
চায়ে অক্সালেট থাকে। ক্যালসিয়াম অক্সালেট হলো কিডনিতে পাথরের একটি সাধারণ ধরন। তাই এখান থেকেই ধারণা তৈরি হয়েছে যে চা খেলেই কিডনিতে পাথর হতে পারে।
কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি আরও জটিল।
কোনো ব্যক্তি কতটা চা পান করছেন, চায়ের ধরন কী, কতটা ঘন করে চা তৈরি করা হচ্ছে, তিনি দিনে কতটা পানি পান করছেন এবং তার শরীরে পাথর তৈরির অন্য কোনো ঝুঁকি আছে কি না, সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।
একটি গবেষণায় দিনে চার বা তার বেশি গ্লাস চা পানকারীদের মধ্যে ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথরের ঝুঁকি বেশি পাওয়া গেলেও গবেষকরা এটিকে চা খাওয়া এবং পাথর হওয়ার সরাসরি কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেননি।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে চারটি বড় prospective cohort study-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে বেশি চা পানের সঙ্গে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ চা নিয়ে এক কথায় ভয় পাওয়ার কারণ নেই।
তাহলে চা কি কিডনির জন্য উপকারী?
এটিও সরাসরি বলা ঠিক হবে না।
চা পানকারীরা অনেক সময় চায়ের মাধ্যমে মোট তরল গ্রহণও বাড়ান। কিডনিতে পাথর প্রতিরোধে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে চায়ের সঙ্গে পাওয়া তরলের পরিমাণও গবেষণার ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
ডায়াবেটিস, পরিপাকতন্ত্র ও কিডনি রোগ বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউটের (NIDDK) তথ্য অনুযায়ী, কিডনিতে পাথর প্রতিরোধে পর্যাপ্ত তরল, বিশেষ করে পানি পান করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি।
তাই চা পানকে পানি পানের বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।
কিডনিতে পাথর হওয়ার বড় ঝুঁকি আসলে কী?
চায়ের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্যাপ্ত পানি পান না করা।
শরীরে পানি কম থাকলে প্রস্রাব বেশি ঘন হয়ে যায়। তখন প্রস্রাবে থাকা কিছু খনিজ ও লবণ জমে স্ফটিক তৈরির সুযোগ পায়।
NIDDK বলছে, পর্যাপ্ত তরল না পান করা কিডনিতে পাথর হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি।
এ ছাড়া পাথরের ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত লবণ, কিছু নির্দিষ্ট উচ্চ-অক্সালেট খাবার, অতিরিক্ত প্রাণিজ প্রোটিন এবং অন্যান্য খাদ্যাভ্যাস ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
চা খেলে পানি কম খাওয়া কেন সমস্যা?
ধরা যাক, কেউ সারাদিনে ছয়-সাত কাপ চা পান করেন, কিন্তু আলাদা করে পানি খুব কম পান করেন। তখন তার মোট তরল গ্রহণ যথেষ্ট কি না, সেটি বিবেচনা করা জরুরি।
চা থেকে কিছু তরল পাওয়া গেলেও শুধু চায়ের ওপর নির্ভর করা ভালো অভ্যাস নয়। বিশেষ করে গরম আবহাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম বা শারীরিক পরিশ্রমের সময় পর্যাপ্ত পানি না খেলে পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কিডনিতে পাথর প্রতিরোধে তাই দিনের প্রধান পানীয় হিসেবে পানিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
কিডনিতে পাথর হলে কী লক্ষণ দেখা যায়?
ছোট পাথর অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু পাথর বড় হলে বা মূত্রনালিতে আটকে গেলে তীব্র উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
- কোমর বা পিঠের এক পাশে তীব্র ব্যথা
- তলপেট বা কুঁচকিতে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা
- ব্যথা কিছুক্ষণ পরপর ওঠানামা করা
- প্রস্রাবের সময় ব্যথা বা জ্বালাপোড়া
- প্রস্রাবে রক্ত
- বারবার প্রস্রাবের বেগ
- প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া
- প্রস্রাব ঘোলা বা দুর্গন্ধযুক্ত হওয়া
- বমি বমি ভাব বা বমি
কিডনিতে পাথরের ব্যথা অনেক সময় হঠাৎ শুরু হয়ে তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
প্রস্রাবে রক্ত দেখলে অবহেলা করবেন না
প্রস্রাব লাল, গোলাপি বা বাদামি দেখালে তার একটি কারণ কিডনিতে পাথর হতে পারে। তবে প্রস্রাবে রক্ত মানেই পাথর, এমন নয়।
মূত্রনালির সংক্রমণসহ অন্য সমস্যাতেও প্রস্রাবে রক্ত দেখা দিতে পারে। তাই এমন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
জ্বরের সঙ্গে কোমরে ব্যথা হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন
কিডনিতে পাথরের সঙ্গে জ্বর বা কাঁপুনি থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। পাথর মূত্রনালির প্রবাহে বাধা তৈরি করলে সংক্রমণসহ জটিলতা হতে পারে।
তীব্র ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত, জ্বর-কাঁপুনি বা প্রস্রাব করতে না পারার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
কিডনিতে পাথর থাকলে কি চা একেবারে বন্ধ?
সবাইকে চা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে, এমন নিয়ম নেই। পাথরটি কী ধরনের, কত বড়, কতবার হয়েছে এবং ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস কেমন, এসব তথ্যের ভিত্তিতে চিকিৎসক পরামর্শ দিতে পারেন।
যাদের ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথর হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে অক্সালেটযুক্ত খাবারের পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে। NIDDK এ ধরনের পাথরের ক্ষেত্রে খাবারে অক্সালেট, সোডিয়াম, প্রাণিজ প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামের ভারসাম্যের দিকে নজর দেওয়ার কথা বলেছে।
তাই নিজের মতো করে সব ধরনের চা বা সব অক্সালেটযুক্ত খাবার বাদ দেওয়া উচিত নয়।
দুধ চা কি আলাদা?
দুধ চায়ের ক্ষেত্রে চা ছাড়াও দুধ ও চিনি যুক্ত হয়। ফলে এটি শুধু চায়ের বিষয় থাকে না, পুরো পানীয়টির উপাদানও বিবেচনা করতে হয়।
কিডনিতে পাথরের ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসের সামগ্রিক ধরন গুরুত্বপূর্ণ। তাই অতিরিক্ত চিনি দেওয়া চা, বিস্কুট বা মিষ্টি খাবারের সঙ্গে বারবার চা খাওয়ার অভ্যাস থাকলে সেটিও কমানো ভালো।
তবে দুধ নিজেই কিডনিতে পাথরের শত্রু, এমন ধারণা ঠিক নয়। NIDDK-এর তথ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত খাদ্যতালিকাগত ক্যালসিয়াম কিছু ক্ষেত্রে অন্ত্রে অক্সালেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তার শোষণ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
কিডনিতে পাথর প্রতিরোধে কী খাবেন?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত পানি পান করা। এর পাশাপাশি পাথরের ধরন অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা যেতে পারে।
ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথরের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অক্সালেটযুক্ত খাবার কমানোর পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। পালং শাক, বাদাম, চিনাবাদাম ও গমের ভুসির মতো কিছু খাবারে অক্সালেট বেশি থাকে।

অতিরিক্ত লবণও কমানো গুরুত্বপূর্ণ। বেশি সোডিয়াম প্রস্রাবে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বাড়িয়ে পাথরের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অতিরিক্ত প্রাণিজ প্রোটিনও কিছু ধরনের কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
শুধু চা কমালেই কি পাথর ঠেকানো যাবে?
না। কিডনিতে পাথর একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। শুধু চা কমিয়ে দিয়ে পর্যাপ্ত পানি না খেলে খুব একটা লাভ নাও হতে পারে।
বরং প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান, অতিরিক্ত লবণ কমানো, নিজের পাথরের ধরন অনুযায়ী খাবার বেছে নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
চা পানের অভ্যাস কীভাবে কমাবেন?
যারা দিনে অনেকবার চা পান করেন, তারা হঠাৎ সব বন্ধ না করে ধীরে ধীরে কমাতে পারেন।
প্রথমে একটি কাপ কমিয়ে দিন। চা খুব ঘন করে তৈরি করার অভ্যাস থাকলে ধীরে ধীরে তা হালকা করুন। প্রতিবার চায়ের বদলে এক কাপ পানি পান করার অভ্যাস তৈরি করতে পারেন।
এ ছাড়া চায়ের সঙ্গে নিয়মিত বিস্কুট, কেক, মিষ্টি বা ভাজাপোড়া খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে সেটিও কমানো ভালো।
দিনে এক-দু কাপ চা খেলেই কিডনিতে পাথর হবে, এমন ভয় পাওয়ার কারণ নেই। আবার দিনে অনেকবার ঘন চা খাওয়ার অভ্যাসকেও পুরোপুরি নিরীহ বলা যায় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং নিজের কিডনিতে পাথর হওয়ার ব্যক্তিগত ঝুঁকি জানা। গবেষণায় চা ও কিডনিতে পাথরের সম্পর্ক নিয়ে ভিন্ন ফল পাওয়া গেছে। কোনো গবেষণায় বেশি চা পানের সঙ্গে ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথরের ঝুঁকি বেশি পাওয়া গেছে, আবার বড় মেটা-অ্যানালাইসিসে বেশি চা পানের সঙ্গে পাথরের ঝুঁকি কমার সম্পর্কও দেখা গেছে।
তাই শুধু চাকে দোষ না দিয়ে পুরো খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের দিকে নজর দেওয়া উচিত। আর কোমর বা পিঠে তীব্র ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত, প্রস্রাবের সময় ব্যথা, জ্বর বা প্রস্রাবের পরিমাণ হঠাৎ কমে গেলে বিষয়টি চায়ের কারণে হয়েছে ধরে না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
সূত্র : হিন্দুস্তান টাইমস



