গ্যাস বা বদহজম ভেবে এড়িয়ে যাচ্ছেন, হতে পারে ক্যানসারের সতর্কবার্তা

গ্যাস, পেট ফাঁপা, বুকজ্বালা বা বদহজম আমাদের খুব পরিচিত সমস্যা। বেশি খাওয়া, ঝাল বা তেলযুক্ত খাবার, অনিয়মিত খাওয়া কিংবা কোষ্ঠকাঠিন্য থেকেও এসব হতে পারে। তাই পেটে অস্বস্তি হলেই বেশির ভাগ মানুষ বিষয়টিকে সাধারণ গ্যাস বা বদহজম বলে ধরে নেন।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেটিই হয়। কিন্তু সমস্যা যদি বারবার হতে থাকে, আগের তুলনায় বাড়তে থাকে বা এর সঙ্গে শরীরের অন্য কিছু পরিবর্তন দেখা দেয়, তখন বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। কারণ পাকস্থলী, অন্ত্র বা পরিপাকতন্ত্রের কিছু ক্যানসারের ক্ষেত্রেও বদহজম, পেট ফাঁপা, পেটব্যথা, মলত্যাগের পরিবর্তন কিংবা ক্ষুধা কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে গ্যাস বা পেট ফাঁপা মানেই ক্যানসার। এসব উপসর্গের পেছনে ক্যানসারের চেয়ে অনেক বেশি সাধারণ কারণ থাকতে পারে। তবে কোন লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে, সেটি জানা গুরুত্বপূর্ণ।
গ্যাস আর পেট ফাঁপা সাধারণত কেন হয়
পেটে গ্যাস তৈরি হওয়া শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। খাবার হজমের সময় অন্ত্রে গ্যাস তৈরি হয়। দ্রুত খাওয়া, কার্বনেটেড পানীয় পান করা, কিছু খাবার বেশি খাওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য বা নির্দিষ্ট খাবারে অসহিষ্ণুতার কারণেও পেট ফাঁপতে পারে।
ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা, কোষ্ঠকাঠিন্য, অতিরিক্ত খাওয়া এবং অন্ত্রের বিভিন্ন সাধারণ সমস্যাও পেট ফাঁপার কারণ হতে পারে। তাই মাঝে মধ্যে পেট ফাঁপা বা গ্যাস হওয়া নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
সমস্যা তখনই, যখন পরিচিত কারণ ছাড়াই উপসর্গটি দীর্ঘদিন থাকে বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
বদহজমও কি ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে
বদহজম বা খাবার খাওয়ার পর পেটে অস্বস্তি খুব সাধারণ একটি সমস্যা। তবে পাকস্থলীর ক্যানসারের ক্ষেত্রেও দীর্ঘস্থায়ী বদহজম, পেটব্যথা, খাওয়ার পর অস্বস্তি, বমি বমি ভাব বা ক্ষুধার পরিবর্তনের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থায়িত্ব ও সঙ্গে থাকা অন্য উপসর্গ। একদিন বা দুদিন বদহজম হওয়া সাধারণ বিষয়। কিন্তু একই সমস্যা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকলে বা বারবার ফিরে এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে কোনো উপসর্গ না কমলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব উপসর্গ ক্যানসার ছাড়াও বিভিন্ন সাধারণ রোগের কারণে হতে পারে এবং পরীক্ষা ছাড়া কারণ নিশ্চিত করা যায় না।
পেট ফাঁপা বারবার হচ্ছে এবং কমছে না
পেট ফাঁপার অনেক সাধারণ কারণ রয়েছে। তবে নতুন করে শুরু হওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে থাকা পেট ফাঁপাকে অবহেলা করা ঠিক নয়।
বিশেষ করে পেট ফাঁপার সঙ্গে পেটব্যথা, মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন, ক্ষুধা কমে যাওয়া বা অকারণে ওজন কমার মতো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
কোলন বা বৃহদান্ত্রের ক্যানসারের ক্ষেত্রেও পেট ফাঁপা, পেটে অস্বস্তি, গ্যাসের ব্যথা বা পেট ভারী লাগার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
মলত্যাগের অভ্যাস হঠাৎ বদলে গেছে
আগে নিয়মিত মলত্যাগ হতো, কিন্তু হঠাৎ দীর্ঘদিন ধরে কোষ্ঠকাঠিন্য শুরু হয়েছে। অথবা বারবার পাতলা পায়খানা হচ্ছে। মলত্যাগের পরও মনে হচ্ছে পেট পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি।
এ ধরনের পরিবর্তন বিভিন্ন সাধারণ কারণেও হতে পারে। খাদ্যাভ্যাস, সংক্রমণ, ওষুধ, মানসিক চাপ বা অন্ত্রের অন্য সমস্যাও এর জন্য দায়ী হতে পারে।
তবে পরিবর্তনটি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় বা স্বাভাবিক অভ্যাস থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কোলোরেক্টাল ক্যানসারের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক লক্ষণের মধ্যে মলত্যাগের অভ্যাসের পরিবর্তন রয়েছে।
মলে রক্ত দেখা যাচ্ছে
মলের সঙ্গে রক্ত দেখা গেলে সেটিকে শুধু পাইলস বা কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
উজ্জ্বল লাল রক্ত পাইলস বা মলদ্বারের অন্য সমস্যার কারণে হতে পারে। আবার কালো বা খুব গাঢ় মল ওপরের পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণের ইঙ্গিতও হতে পারে।
কোলন ক্যানসারের ক্ষেত্রেও মলে রক্ত দেখা দিতে পারে। তাই মলে বারবার রক্ত দেখা গেলে কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কারণ ছাড়াই ওজন কমছে
খাবার বা ব্যায়ামের অভ্যাসে কোনো পরিবর্তন না এনেও যদি অকারণে ওজন কমতে থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
ওজন কমার পেছনে থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ, মানসিক চাপসহ অনেক কারণ থাকতে পারে। ক্যানসারও এর একটি সম্ভাব্য কারণ।
বিশেষ করে ওজন কমার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বদহজম, পেটব্যথা, ক্ষুধা কমে যাওয়া বা মলত্যাগের পরিবর্তন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
খাওয়ার পর খুব দ্রুত পেট ভরে যাচ্ছে
আগে যে পরিমাণ খাবার স্বাভাবিকভাবে খেতেন, এখন তার চেয়ে অনেক কম খেলেই পেট ভরে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যদি ক্ষুধা কমে যায়, বমি বমি ভাব বা পেটের অস্বস্তি থাকে, তাহলে বিষয়টি নজরে রাখা প্রয়োজন।
পাকস্থলীর বিভিন্ন রোগের কারণেও এমন হতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করে কারণ খুঁজে দেখতে পারেন।
বারবার পেটব্যথা বা অস্বস্তি হচ্ছে
মাঝে মধ্যে পেটব্যথা হওয়ার অনেক সাধারণ কারণ রয়েছে। গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য, খাদ্যে অসহিষ্ণুতা বা সংক্রমণ তার মধ্যে অন্যতম।
কিন্তু একই জায়গায় বারবার ব্যথা হওয়া, ব্যথার মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়া বা দীর্ঘদিন ধরে পেটের অস্বস্তি থাকা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কারণ হতে পারে।
পাকস্থলী ও বৃহদান্ত্রের বিভিন্ন ক্যানসারে পেটব্যথা বা পেটের অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। তবে শুধু পেটব্যথা দেখে ক্যানসার শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
দীর্ঘদিন ধরে বুকজ্বালা বা বদহজম
খাবারের পর বুকজ্বালা বা অম্বল অনেকেরই হয়। সাধারণত খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, অতিরিক্ত খাওয়া বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের মতো সমস্যার কারণে এমন হতে পারে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে বদহজম বা বুকজ্বালা না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। বিশেষ করে বয়স বাড়ার পর নতুন করে শুরু হওয়া সমস্যা হলে কিংবা এর সঙ্গে ওজন কমা, গিলতে সমস্যা, বমি বা মলে রক্তের মতো উপসর্গ থাকলে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট দীর্ঘস্থায়ী বদহজম ও খাওয়ার পর ব্যথাকে ক্যানসারের সম্ভাব্য উপসর্গগুলোর মধ্যে উল্লেখ করেছে।
সব সময় ক্লান্ত লাগছে
ক্যানসারের ক্ষেত্রে শরীরে রক্তক্ষরণ বা অন্যান্য পরিবর্তনের কারণে রক্তস্বল্পতা হতে পারে। বিশেষ করে পাকস্থলী বা অন্ত্রে ধীরে ধীরে রক্তক্ষরণ হলে বাইরে থেকে তা বোঝা নাও যেতে পারে।
এর ফলে দীর্ঘদিন দুর্বলতা, ক্লান্তি বা শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। পাকস্থলীর ক্যানসারের সম্ভাব্য মূল্যায়নে চিকিৎসকেরা প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা করে রক্তস্বল্পতা আছে কি না দেখেন।
তবে ক্লান্তিরও অসংখ্য সাধারণ কারণ রয়েছে। তাই শুধু ক্লান্তি থাকলেই ক্যানসার হয়েছে এমন ভাবার কারণ নেই।
তরুণদেরও কি এসব লক্ষণ গুরুত্ব দেওয়া উচিত
ক্যানসার মানেই শুধু বয়স্কদের রোগ, এমন ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। বিশেষ করে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের কিছু ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম বয়সেও রোগ দেখা দিতে পারে।
জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অল্প বয়সে কোলোরেক্টাল ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রোগ নির্ণয়ের আগের কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর সময়ের মধ্যে পেটব্যথা, মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত, ডায়রিয়া এবং আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা বেশি দেখা গেছে।
তাই বয়স কম বলে দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক উপসর্গকে সব সময় গ্যাস বা বদহজম বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন
নিচের যেকোনো লক্ষণ দীর্ঘদিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত -
- কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্যাস, পেট ফাঁপা বা বদহজম না কমা
- বারবার বা দীর্ঘস্থায়ী পেটব্যথা
- মলত্যাগের অভ্যাসে নতুন পরিবর্তন
- মলে রক্ত বা অস্বাভাবিক কালো মল
- কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
- ক্ষুধা কমে যাওয়া
- অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়া
- বারবার বমি বা বমি বমি ভাব
- দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা বা রক্তস্বল্পতা
- গিলতে সমস্যা
এসব লক্ষণের একটিও থাকলেই ক্যানসার হয়েছে এমন নয়। তবে কারণটি জানা জরুরি।
চিকিৎসক কীভাবে কারণ খুঁজে বের করেন
লক্ষণ শুনেই চিকিৎসক সাধারণত ক্যানসার ধরে নেন না। প্রথমে রোগীর উপসর্গ কতদিন ধরে আছে, কখন বাড়ে, কী ধরনের খাবারের পর সমস্যা হয়, মলত্যাগের অভ্যাস কীভাবে বদলেছে এবং পরিবারে কোনো রোগের ইতিহাস আছে কি না, এসব জানতে পারেন।
প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা, মল পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাম, এন্ডোস্কোপি বা কোলনোস্কোপির মতো পরীক্ষা করা হতে পারে। কোন পরীক্ষা প্রয়োজন হবে, তা উপসর্গ ও রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে। পাকস্থলীর ক্যানসার সন্দেহ হলে ওপরের পরিপাকতন্ত্র দেখার জন্য এন্ডোস্কোপি ও প্রয়োজন হলে বায়োপসি করা হয়।
গ্যাস হলেই ভয় পাওয়ার দরকার নেই
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্যাস, পেট ফাঁপা বা বদহজম খুব সাধারণ সমস্যা। এসব উপসর্গ থাকা মানেই ক্যানসার নয়। জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটও উল্লেখ করেছে, ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক উপসর্গই অন্য সাধারণ রোগ, আঘাত বা ক্যানসারবিহীন সমস্যার কারণেও হতে পারে।
তাই একবার গ্যাস হয়েছে বলে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু একই সমস্যা বারবার হলে, কয়েক সপ্তাহেও না কমলে বা এর সঙ্গে মলে রক্ত, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, মলত্যাগের পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা কিংবা অতিরিক্ত দুর্বলতার মতো লক্ষণ যোগ হলে বিষয়টি আর অবহেলা করা উচিত নয়।
শরীরের কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে দ্রুত ক্যানসার ধরে নেওয়াও ঠিক নয়, আবার সবকিছুকে গ্যাস বলে এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক নয়। উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক কারণ খুঁজে বের করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
সূত্র:টাইমস অব ইন্ডিয়া




