ঘুমের এই ভুলের জন্যেও বাড়াতে পারে হৃদ্রোগের ঝুঁকি
-e12a9b-720x405.webp)
হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখতে কী করতে হবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে সাধারণত তিনটি বিষয়ই সামনে আসে। স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং ধূমপান থেকে দূরে থাকা। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আরও একটি বিষয় আছে, যা অনেক সময় আমাদের তালিকার বাইরে থেকে যায়। সেটি হলো ঘুম।
কেউ হয়তো নিয়মিত হাঁটছেন, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখছেন, পুষ্টিকর খাবার খাচ্ছেন এবং ধূমপানও করেন না। তারপরও যদি প্রতিদিন ঠিকমতো ঘুম না হয়, তাহলে হৃদ্যন্ত্রের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। গবেষণায় ঘুমের স্বল্পতা, অনিয়মিত ঘুম ও ঘুমের মান খারাপ হওয়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, রক্তে শর্করার সমস্যা, প্রদাহ, হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
এই বিষয়টি ভালো মতো বোঝার জন্য চলুন আগে জেনে নিই ঘুমের সময় আমাদের হৃদ্যন্ত্র কী করে।
আমরা যখন ঘুমিয়ে থাকি, তখন আমাদের শরীর পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় থাকে না। বরং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ দিনের ব্যস্ততার পর কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ পায়।
স্বাভাবিক ঘুমের সময়, বিশেষ করে গভীর ঘুমে, হৃদ্স্পন্দন ও রক্তচাপ সাধারণত কিছুটা কমে আসে। এতে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর চাপ কমে। এই বিশ্রামের সময়টি শরীরের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু ঘুম বারবার ভেঙে গেলে বা পর্যাপ্ত গভীর ঘুম না হলে এই বিশ্রামের সময় ব্যাহত হতে পারে। দীর্ঘদিন এমন চললে শরীরের চাপ মোকাবিলার ব্যবস্থা সক্রিয় থাকতে পারে। এর ফলে রক্তচাপ বাড়া, শরীরে প্রদাহ এবং বিপাকীয় সমস্যার মতো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এসব পরিবর্তন আবার হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
শুধু কম ঘুম নয়, অনিয়মিত ঘুমও সমস্যা
অনেকে মনে করেন, দিনে মোট সাত বা আট ঘণ্টা ঘুমালেই হলো। কিন্তু ঘুমের স্বাস্থ্য শুধু কত ঘণ্টা ঘুমালেন, তার ওপর নির্ভর করে না।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৫ সালের বৈজ্ঞানিক বিবৃতিতে ঘুমের সময়ের পাশাপাশি ঘুমের নিয়মিততা, সময়, ঘুম কতটা নিরবচ্ছিন্ন হচ্ছে, ঘুমের মান এবং দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাবের মতো বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ প্রতিদিন রাত ১১টার বদলে কখনো রাত ২টায়, আবার কোনো দিন রাত ১০টায় ঘুমাতে যাওয়া এবং সকালে ভিন্ন সময়ে ওঠার অভ্যাসও ভালো ঘুমের অংশ নয়।
কত ঘণ্টা ঘুমানো ভালো?
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণভাবে প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে শুধু ঘুমের সময় পূরণ করলেই হবে না, ঘুম হতে হবে ভালো মানের এবং যতটা সম্ভব নিয়মিত।
কিছু গবেষণায় খুব কম বা খুব বেশি ঘুমের সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক দেখা গেছে। তাই সারাদিনের ক্লান্তি কাটাতে নিয়মিত অতিরিক্ত সময় ঘুমিয়ে থাকাও যে সব সময় উপকারী, তা নয়।
তবে কারও ঘুমের প্রয়োজন বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী কিছুটা আলাদা হতে পারে।
আট ঘণ্টা বিছানায় থেকেও ঘুম ভালো নাও হতে পারে
ঘুমের ক্ষেত্রে একটি বিষয় অনেকেই ভুলে যান। বিছানায় আট ঘণ্টা থাকা আর আট ঘণ্টা ভালো ঘুম হওয়া এক বিষয় নয়।
বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া, ঘুম আসতে দীর্ঘ সময় লাগা, রাতের ঘুমের সময় প্রতিদিন বদলে যাওয়া কিংবা সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরও অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগা ভালো ঘুম না হওয়ার লক্ষণ হতে পারে।
দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব থাকলেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কারণ এটি কোনো ঘুমের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
নাক ডাকার সঙ্গে হৃদ্রোগের সম্পর্ক আছে?
শুধু নাক ডাকলেই যে হৃদ্রোগ হবে, তা নয়। তবে খুব জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসা বা হাঁসফাঁস করে ওঠা এবং দিনের বেলায় অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
এগুলো অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ হতে পারে। এ সমস্যায় ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে ঘুমের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না।
স্লিপ অ্যাপনিয়া হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ঘুমের সময় বারবার শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা পড়লে শরীরের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তাই কারও নিয়মিত জোরে নাক ডাকার সঙ্গে দম বন্ধ হয়ে আসা বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম পাওয়ার সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ঘুম কম হলে রক্তচাপ বাড়তে পারে
ঘুমের ঘাটতির সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ঘুমের সময় শরীর ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর চাপ কিছুটা কমে আসে। কিন্তু ঘুম পর্যাপ্ত না হলে এই স্বাভাবিক বিশ্রাম ব্যাহত হতে পারে।
দীর্ঘদিনের ঘুমের সমস্যা রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, শরীরের ওজন এবং প্রদাহের মতো হৃদ্রোগের বিভিন্ন ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে খাবারে লবণ কমানোর পাশাপাশি ঘুমের অভ্যাসের দিকেও নজর দেওয়া দরকার।
ঘুমের সঙ্গে ওজন ও রক্তে শর্করার সম্পর্ক
ঘুমের ঘাটতি শুধু হৃদ্যন্ত্রের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে না, জীবনযাপনের অন্য দিকেও প্রভাব ফেলতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ক্ষুধা ও খাবারের অভ্যাস বদলে যেতে পারে। শারীরিকভাবে ক্লান্ত থাকার কারণে ব্যায়াম করার আগ্রহও কমতে পারে। দীর্ঘদিনের ঘুমের সমস্যার সঙ্গে স্থূলতা ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সমস্যার সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
এভাবে ঘুমের সমস্যা পরোক্ষভাবেও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
শরীরে প্রদাহও বাড়তে পারে
দীর্ঘদিনের খারাপ ঘুম শরীরের প্রদাহজনিত প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত। শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ থাকলে তা রক্তনালি ও হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনাতেও ঘুমের স্বাস্থ্যের সঙ্গে প্রদাহ এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকির সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে।
তাই ঘুমকে শুধু ক্লান্তি দূর করার উপায় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এটি সামগ্রিক হৃদ্স্বাস্থ্যের অংশ।
এক রাত কম ঘুমালেই কি হৃদ্রোগ হবে?
না। একটি রাত ভালোভাবে না ঘুমানো মানেই হৃদ্রোগ হয়ে যাবে, এমন নয়।
মূল উদ্বেগ হলো দীর্ঘদিনের অভ্যাস। নিয়মিত কম ঘুমানো, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা চলতে থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই মাঝে মধ্যে এক রাত দেরিতে ঘুমানোর বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিদিনের ঘুমের অভ্যাস কেমন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভালো ঘুম কি হৃদ্স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারে?
ঘুমের সমস্যা ঠিক করার চেষ্টা অবশ্যই উপকারী। ২০২৬ সালের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের কথা উল্লেখ করে Times of India জানিয়েছে, ঘুমের উন্নতির জন্য আচরণগত উদ্যোগের সঙ্গে রক্তচাপ কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ভালো ঘুম হলেই স্বাস্থ্যকর খাবার বা ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই।
বরং হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য সবগুলো বিষয় একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, ধূমপান এড়িয়ে চলা, প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ এবং পর্যাপ্ত ঘুম একে অন্যের বিকল্প নয়।
ঘুম ভালো করার জন্য কী করবেন?
ভালো ঘুমের জন্য খুব কঠিন কোনো নিয়মের প্রয়োজন নেই। কয়েকটি অভ্যাস নিয়মিত করার চেষ্টা করতে পারেন।
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমান ও উঠুন: ছুটির দিনেও ঘুম ও জাগার সময় খুব বেশি বদলে না ফেলাই ভালো।
ঘুমের আগে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার কমান: ঘুমানোর ঠিক আগে দীর্ঘ সময় ফোন বা অন্য পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলে ঘুমের প্রস্তুতি ব্যাহত হতে পারে।
বিকেল ও সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত চা-কফি এড়িয়ে চলুন: ক্যাফেইন অনেকের ঘুমে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
ঘুমের পরিবেশ আরামদায়ক রাখুন: ঘর অন্ধকার, শান্ত ও আরামদায়ক তাপমাত্রায় রাখার চেষ্টা করুন।
দিনে শরীরচর্চা করুন: নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড ঘুমের মান ভালো করতে সাহায্য করতে পারে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে খুব ভারী ব্যায়াম না করাই ভালো।
রাতে ভারী খাবার কমান: ঘুমানোর খুব কাছাকাছি সময়ে অতিরিক্ত ভারী খাবার খেলে অস্বস্তি হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
মাঝে মধ্যে ঘুমের সমস্যা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সমস্যা যদি নিয়মিত হয় এবং দিনের কাজকর্মে প্রভাব ফেলে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
বিশেষ করে নিচের লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো-
- প্রতিদিন ঘুমাতে সমস্যা হওয়া
- রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া
- খুব জোরে নাক ডাকা
- ঘুমের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসা বা হাঁসফাঁস করা
- সকালে ঘুম থেকে উঠেও অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগা
- দিনের বেলায় অস্বাভাবিক ঘুম পাওয়া
- দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ থাকা
ঘুমের সমস্যা থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ঘুমের ধরন ও সম্ভাব্য কারণ পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যা থাকলে নির্দিষ্ট চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখতে শুধু প্লেটে কী আছে বা দিনে কতক্ষণ ব্যায়াম করছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনি রাতে কীভাবে ঘুমাচ্ছেন, সেটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন ইতিমধ্যে ঘুমকে হৃদ্স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ আটটি মাপকাঠির একটি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
তাই স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত হাঁটা এবং ধূমপান না করার পাশাপাশি প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ভালো মানের, নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করুন। আর দীর্ঘদিনের নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা বা অতিরিক্ত দিনের ঘুমকে স্বাভাবিক ভেবে এড়িয়ে যাবেন না।
কারণ হৃদ্যন্ত্রকে সুস্থ রাখতে দিনের অভ্যাস যেমন গুরুত্বপূর্ণ, রাতের ঘুমও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া



