ডায়াবেটিস হলে কার্বোহাইড্রেট নিয়ে যে ভুল করেন অনেকেই

ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর অনেকেই প্রথমে ভাত, রুটি, আলু, ফল বা মিষ্টির মতো কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার কমিয়ে দেওয়ার কথা ভাবেন। কেউ কেউ আবার কার্বোহাইড্রেট একেবারেই বাদ দিতে চান। কিন্তু ডায়াবেটিস থাকলেই কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দিতে হবে, এমন ধারণা ঠিক নয়।
বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো কতটা কার্বোহাইড্রেট খাওয়া হচ্ছে, কোন খাবার থেকে তা আসছে, দিনের কোন সময়ে খাওয়া হচ্ছে এবং খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক চিকিৎসক-পর্যালোচিত একটি প্রতিবেদনে আজিবাদেম (Acıbadem) আন্তর্জাতিক মেডিকেল বোর্ড জানিয়েছে, ডায়াবেটিসে প্রতিদিনের কার্বোহাইড্রেটের জন্য সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম, ওষুধ, ইনসুলিন ব্যবহার, কিডনির অবস্থা, রক্তে শর্করার ধরন এবং চিকিৎসার লক্ষ্য অনুযায়ী প্রয়োজন আলাদা হতে পারে।
কার্বোহাইড্রেট আসলে কী
কার্বোহাইড্রেট শরীরের শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস। ভাত, রুটি, আলু, ডাল, ফল, দুধ, শস্য, মিষ্টি ও চিনিযুক্ত খাবারে বিভিন্ন ধরনের কার্বোহাইড্রেট থাকে।
শরীরে হজম হওয়ার পর কার্বোহাইড্রেটের একটি বড় অংশ গ্লুকোজে পরিণত হয়। এই গ্লুকোজ রক্তে প্রবেশ করে এবং শরীরের কোষগুলো শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে। তাই কার্বোহাইড্রেট শরীরের জন্য অপ্রয়োজনীয় কোনো উপাদান নয়।
সমস্যা হয় যখন প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কার্বোহাইড্রেট খাওয়া হয়, বিশেষ করে দ্রুত হজম হয় এমন চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট। এগুলো খাবারের পর রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে।
দিনে কত গ্রাম কার্বোহাইড্রেট খাওয়া উচিত
এই প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর হলো, সবার জন্য একই পরিমাণ নির্ধারণ করা যায় না।
আজিবাদেমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডায়াবেটিসে কার্বোহাইড্রেটের লক্ষ্য ব্যক্তির বয়স, ওজন, শারীরিক কার্যকলাপ, ওষুধ, ইনসুলিন ব্যবহার, কিডনির স্বাস্থ্য এবং রক্তে শর্করার লক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে। তাই শুধু একটি দৈনিক সংখ্যা ধরে খাদ্যতালিকা তৈরি করা ঠিক নয়।
আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের ‘Standards of Care’ বলছে, ডায়াবেটিসে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও চর্বির জন্য সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কোনো নির্দিষ্ট অনুপাত নেই। খাদ্যতালিকা ব্যক্তির প্রয়োজন, খাবারের অভ্যাস, সংস্কৃতি ও বিপাকীয় লক্ষ্য অনুযায়ী তৈরি করা উচিত।
অর্থাৎ, একজনের জন্য যে পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট ঠিক আছে, অন্য ব্যক্তির জন্য একই পরিমাণ কম বা বেশি হতে পারে।
শুধু মোট পরিমাণ নয়, খাবারের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ
ডায়াবেটিসে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও কোন ধরনের কার্বোহাইড্রেট খাওয়া হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মিষ্টি, কোমল পানীয়, মিষ্টি চা, কেক, বিস্কুট ও অন্যান্য অতিরিক্ত চিনি থাকা খাবার দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে ডাল, শাকসবজি, গোটা শস্য, ওটস ও আস্ত ফলের মতো খাবারে খাদ্যআঁশ থাকে, যা হজম ও রক্তে গ্লুকোজ বৃদ্ধির গতি ধীর করতে সাহায্য করতে পারে।
তাই কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বদলে ভালো উৎস বেছে নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভাত কি একেবারে বাদ দিতে হবে
বাংলাদেশে ভাত প্রধান খাবার হওয়ায় ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর অনেকেই ভাত পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। সাধারণভাবে এর প্রয়োজন নেই।
তবে ভাতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একসঙ্গে বড় প্লেট ভাত খাওয়ার বদলে পরিমিত ভাতের সঙ্গে প্রচুর নন-স্টার্চযুক্ত সবজি এবং পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের ‘প্লেট পদ্ধতি’- তে একটি ৯ ইঞ্চি প্লেটের অর্ধেক নন-স্টার্চযুক্ত সবজি, এক-চতুর্থাংশ চর্বিহীন প্রোটিন এবং এক-চতুর্থাংশ কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবারের জন্য রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশি খাবারের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে প্লেটের এক-চতুর্থাংশে ভাত বা অন্য কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার রাখা যেতে পারে। বাকি অংশে সবজি ও প্রোটিন রাখা যায়।
কার্বোহাইড্রেট একেবারে বন্ধ করলে কি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে আসবে
সবসময় নয়। কার্বোহাইড্রেট খুব বেশি কমিয়ে দিলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
এ ছাড়া ইনসুলিন বা কিছু নির্দিষ্ট ডায়াবেটিসের ওষুধ ব্যবহারকারীরা হঠাৎ করে খাবারে বড় পরিবর্তন করলে রক্তে শর্করা খুব কমে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে। তাই বিশেষ করে ইনসুলিন ব্যবহার করলে নিজের সিদ্ধান্তে কার্বোহাইড্রেট অনেক কমিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
কার্বোহাইড্রেট কমানো প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে খাদ্যতালিকা পরিবর্তন করা নিরাপদ।
দিনে কার্বোহাইড্রেট কীভাবে ভাগ করে খাবেন
শুধু দিনের মোট কার্বোহাইড্রেট হিসাব করলেই হবে না। একসঙ্গে অনেক বেশি কার্বোহাইড্রেট না খেয়ে দিনের বিভিন্ন খাবারে পরিমাণ ভাগ করে নেওয়া অনেকের জন্য উপকারী হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র বলছে, নিয়মিত ও ভারসাম্যপূর্ণ খাবার খাওয়া এবং প্রতিটি খাবারে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা কিছু মানুষের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে ইনসুলিন পাম্প বা দিনে একাধিকবার ইনসুলিন নেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কার্বোহাইড্রেটের হিসাব চিকিৎসা পরিকল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে, সকালের খাবারে বেশি পরিমাণে রুটি বা মিষ্টি খেয়ে দুপুর ও রাতে খুব কম খাওয়ার বদলে দিনের খাবারে কার্বোহাইড্রেট পরিমিতভাবে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে।
কার্বোহাইড্রেটের সঙ্গে প্রোটিন ও খাদ্যআঁশ রাখুন
শুধু কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কমানো নয়, খাবারের সঙ্গে কী রাখা হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কার্বোহাইড্রেটের সঙ্গে প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি বা খাদ্যআঁশ থাকলে খাবার হজম ও রক্তে শর্করা বাড়ার গতি ধীর হতে পারে। যেমন ভাতের সঙ্গে শুধু আলু বা অন্য স্টার্চযুক্ত খাবার না খেয়ে সবজি, মাছ, ডিম বা উপযুক্ত প্রোটিনের উৎস রাখা যেতে পারে।
একইভাবে ফল খেলে শুধু ফলের রস পান করার বদলে আস্ত ফল খাওয়া ভালো। আস্ত ফলে খাদ্যআঁশ থাকে, যা রসের তুলনায় রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়ার প্রবণতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
কোন কার্বোহাইড্রেট তুলনামূলক ভালো
ডায়াবেটিসের খাদ্যতালিকায় সাধারণত কম প্রক্রিয়াজাত ও খাদ্যআঁশসমৃদ্ধ কার্বোহাইড্রেটকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। যেমন-
- ডাল
- ছোলা ও অন্যান্য শিমজাতীয় খাবার
- ওটস
- গোটা শস্য
- পরিমিত পরিমাণে লাল বা ব্রাউন চাল
- আস্ত ফল
- নন-স্টার্চযুক্ত সবজি
- চিনি ছাড়া বা কম চিনি থাকা দই
অন্যদিকে মিষ্টি, কোমল পানীয়, মিষ্টি জুস, কেক, পেস্ট্রি, অতিরিক্ত চিনি দেওয়া চা বা কফি এবং অতিরিক্ত পরিশোধিত শস্যের খাবার যতটা সম্ভব সীমিত রাখা ভালো।
কার্বোহাইড্রেট মাপবেন কীভাবে
কার্বোহাইড্রেট গ্রামে হিসাব করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের হিসাবে ১৫ গ্রাম কার্বোহাইড্রেটকে সাধারণত এক কার্বোহাইড্রেট সার্ভিং হিসেবে ধরা হয়। তবে একটি খাবারের স্বাভাবিক পরিবেশন এবং ১৫ গ্রাম কার্বোহাইড্রেটের সার্ভিং একই বিষয় নয়। উদাহরণ হিসেবে একটি ছোট বেক করা আলুতে প্রায় ৩০ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থাকতে পারে, যা দুই কার্ব সার্ভিংয়ের সমান।
প্যাকেটজাত খাবারের ক্ষেত্রে Nutrition Facts বা পুষ্টি তথ্যের লেবেলে Total Carbohydrate কত গ্রাম আছে, সেটি দেখা যায়।
তবে বাংলাদেশি খাবার যেমন ভাত, রুটি, ডাল বা বিভিন্ন রান্না করা খাবারের ক্ষেত্রে সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করতে খাবারের মাপ ও পুষ্টি তথ্য জানা প্রয়োজন। প্রয়োজনে পুষ্টিবিদের সাহায্য নেওয়া ভালো।
রক্তে শর্করা দেখে খাদ্যতালিকা ঠিক করা যায়
একই খাবার দুই ব্যক্তির রক্তে শর্করায় একই প্রভাব ফেলবে, এমন নয়। তাই খাবারের পর রক্তে শর্করা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকেরা অনেক সময় ব্যক্তির স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস, খাবারের সময়, পরিমাণ, শারীরিক পরিশ্রম এবং রক্তে শর্করার ফলাফল দেখে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ ও সময় ঠিক করেন।
কারও ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট খাবারের পর রক্তে শর্করা বেশি বেড়ে গেলে সেই খাবারের পরিমাণ কমানো বা অন্য কোনো খাবার দিয়ে বদলে দেওয়া যেতে পারে।
কার্বোহাইড্রেট কমানোর সময় কারা বেশি সতর্ক থাকবেন
যারা ইনসুলিন ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছায় কার্বোহাইড্রেট অনেক কমিয়ে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। একইভাবে কিছু নির্দিষ্ট ডায়াবেটিসের ওষুধ ব্যবহারকারীরাও খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।
গর্ভাবস্থা, কিডনির রোগ, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম বা নিয়মিত কঠিন ব্যায়াম থাকলেও কার্বোহাইড্রেটের প্রয়োজন আলাদা হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত খাদ্য পরিকল্পনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে ডায়াবেটিসে সবচেয়ে ভালো নিয়ম কী
ডায়াবেটিস থাকলে কার্বোহাইড্রেটকে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং কার্বোহাইড্রেটের মান, পরিমাণ এবং খাবারের সঙ্গে এর ভারসাম্য বুঝে খাওয়া দরকার।
সহজভাবে মনে রাখার মতো কয়েকটি নিয়ম হলো-
- ভাত বা রুটি একেবারে বাদ না দিয়ে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন
- মিষ্টি ও অতিরিক্ত চিনি কমান
- কোমল পানীয় ও চিনিযুক্ত পানীয়ের বদলে পানি পান করুন
- ফলের জুসের বদলে আস্ত ফল খান
- ডাল, শাকসবজি ও গোটা শস্যের মতো খাদ্যআঁশসমৃদ্ধ খাবার বেছে নিন
- কার্বোহাইড্রেটের সঙ্গে প্রোটিন ও সবজি রাখুন
- একসঙ্গে অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট না খেয়ে খাবারে পরিমাণ ভাগ করে নিন
- নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করুন এবং নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝুন
- ইনসুলিন বা ওষুধ ব্যবহার করলে বড় ধরনের খাদ্য পরিবর্তনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
সবশেষে মনে রাখা দরকার, ডায়াবেটিসে প্রতিদিন কত গ্রাম কার্বোহাইড্রেট খেতে হবে, এর কোনো একক উত্তর নেই। কারও জন্য ২০০ গ্রাম উপযুক্ত হতে পারে, আবার অন্য কারও জন্য তা বেশি বা কম হতে পারে। বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম, ওষুধ, ইনসুলিন এবং রক্তে শর্করার লক্ষ্যের ভিত্তিতে এই পরিমাণ ঠিক করা হয়।
তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বদলে নিজের জন্য উপযুক্ত পরিমাণ ও সঠিক উৎস বেছে নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত খাদ্য পরিকল্পনার জন্য চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
সূত্র: আজিবাদেম



