logo

ঘুম কম হলে শরীরের নীরব ঝুঁকিগুলো জানুন

ঘুম কম হলে শরীরের নীরব ঝুঁকিগুলো জানুন

কখনো যদি রাতে ঠিকমতো ঘুম না হয়ে থাকে, তাহলে পরের দিন কেমন লাগে তা নিশ্চয়ই জানা আছে। শরীর ক্লান্ত থাকে, মেজাজ খিটখিটে হয়, মনোযোগ ঠিক থাকে না। কিন্তু প্রতিদিন প্রয়োজনীয় ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম না হলে এর প্রভাব শুধু ক্লান্তি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে না।

দীর্ঘমেয়াদে ঘুমের অভাব শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ও সিস্টেমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (Central Nervous System বা CNS)

কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বা সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম শরীরের তথ্য আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম। এটি ঠিকভাবে কাজ করতে ঘুম খুবই জরুরি। দীর্ঘদিন ঘুমের অভাব হলে মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণে সমস্যা দেখা দেয়।

  • মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়
  • নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা কমে যায়
  • শরীরের প্রতিক্রিয়া ধীর হয়ে যায়, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে

এ ছাড়া মেজাজের পরিবর্তন, খিটখিটে ভাব, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অক্ষমতা এবং সৃজনশীলতার ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

দিনের বেলায় হঠাৎ কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঘুমিয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটতে পারে, যাকে মাইক্রোস্লিপ বলা হয়। এটি গাড়ি চালানো বা যন্ত্রপাতি পরিচালনার সময় খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা

ঘুমের সময় শরীর এমন কিছু উপাদান তৈরি করে, যা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। যেমন অ্যান্টিবডি ও সাইটোকাইন।

ঘুম কম হলে:

  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়
  • সহজে সর্দি, কাশি বা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে
  • অসুস্থতা থেকে সেরে উঠতে বেশি সময় লাগে
  • দীর্ঘদিন ঘুমের অভাব থাকলে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

শ্বাসতন্ত্র

ঘুম এবং শ্বাসতন্ত্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। রাতে শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা, যেমন স্লিপ অ্যাপনিয়া, ঘুমের মান খারাপ করে।

অপরদিকে ঘুমের অভাব হলে:

  • ঠান্ডা বা ফ্লুর মতো শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে
  • আগে থেকে থাকা ফুসফুসের রোগ আরও খারাপ হতে পারে

হজম প্রক্রিয়া

  • ঘুমের অভাব ওজন বাড়ার একটি বড় কারণ হতে পারে।
  • ঘুম শরীরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে:
  • লেপটিন, যা জানায় আপনি পেট ভরে খেয়েছেন
  • ঘ্রেলিন, যা ক্ষুধা বাড়ায়

ঘুম কম হলে লেপটিন কমে যায় এবং ঘ্রেলিন বেড়ে যায়। ফলে বেশি খাওয়া বা রাতের বেলা অপ্রয়োজনীয় খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে।

এ ছাড়া:

  • শরীর কম ইনসুলিন তৈরি করে
  • রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয়
  • ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়ে
  • হৃদ্‌রোগ ও রক্তনালী

ঘুম হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালীর স্বাস্থ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ঘুমের অভাব হলে:

  • উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে
  • প্রদাহ বৃদ্ধি পায়
  • হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়
  • হরমোন ও এন্ডোক্রাইন সিস্টেম
  • শরীরে হরমোন উৎপাদন অনেকটাই ঘুমের ওপর নির্ভরশীল।
  • টেস্টোস্টেরন উৎপাদনের জন্য টানা কয়েক ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম প্রয়োজন
  • ঘন ঘন ঘুম ভাঙলে হরমোন উৎপাদন ব্যাহত হয়

শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে : গ্রোথ হরমোন ঠিকমতো তৈরি না হলে শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে

ঘুমের অভাবের চিকিৎসা

অনেক সময় ঘুমের সমস্যা বা স্লিপ ডিসঅর্ডারের কারণে ঠিকমতো ঘুম হয় না।

সাধারণ কিছু স্লিপ ডিসঅর্ডার হলো:

  • অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া
  • নারকোলেপসি
  • রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম
  • ইনসমনিয়া
  • সার্কাডিয়ান রিদমের সমস্যা

এসব সমস্যা নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকরা স্লিপ স্টাডি করার পরামর্শ দিতে পারেন। এখন অনেক ক্ষেত্রে বাসায় বসেও ঘুমের মান পরীক্ষা করা সম্ভব।

রোগ নির্ণয়ের পর প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ বা বিশেষ ডিভাইস ব্যবহার করে চিকিৎসা দেওয়া হয়, যাতে রাতে ভালোভাবে ঘুমানো যায়।

ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়, এটি সুস্থ থাকার জন্য অপরিহার্য। নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম না হলে তা ধীরে ধীরে শরীরের প্রায় সব সিস্টেমকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রতিদিন পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

সূত্র : হেল্থলাইন