logo

গাজর খেলে কি সত্যিই দৃষ্টিশক্তি বাড়ে, কী বলছে বিজ্ঞান

গাজর খেলে কি সত্যিই দৃষ্টিশক্তি বাড়ে, কী বলছে বিজ্ঞান
ছবি : সংগৃহীত

ছোটবেলা থেকেই আমরা অনেকেই শুনে এসেছি, গাজর খেলে চোখের দৃষ্টি ভালো হয়। আবার কেউ কেউ তো বিশ্বাস করেন, নিয়মিত গাজর খেলে চশমার পাওয়ারও কমে যেতে পারে। কিন্তু এই ধারণার কতটা সত্যি, আর কতটা প্রচলিত ভুল ধারণা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরটি একটু জটিল। গাজর অবশ্যই চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে এটি এমন কোনো জাদুকরি খাবার নয়, যা খেলে হঠাৎ করে দৃষ্টিশক্তি বেড়ে যাবে। বরং গাজরের সঙ্গে চোখের সম্পর্কের পেছনে রয়েছে বিজ্ঞান, আবার রয়েছে ইতিহাসের একটি মজার ঘটনাও।

  1. গাজর কীভাবে চোখের উপকার করে

গাজরে প্রচুর পরিমাণে বিটা-ক্যারোটিন থাকে। এটি একটি উদ্ভিজ্জ রঞ্জক পদার্থ, যা শরীরে প্রবেশ করার পর ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত হয়।

ভিটামিন এ চোখের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। বিশেষ করে কম আলোতে দেখার ক্ষমতা বজায় রাখতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চোখের রেটিনায় থাকা আলোক-সংবেদনশীল কোষগুলো সঠিকভাবে কাজ করার জন্য ভিটামিন এ প্রয়োজন হয়।

শরীরে ভিটামিন এ-এর ঘাটতি হলে রাতকানা রোগ বা অন্ধকারে দেখার সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে গাজরসহ ভিটামিন এ-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উপকার করতে পারে। তবে যাদের শরীরে ভিটামিন এ-এর কোনো ঘাটতি নেই, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গাজর খাওয়া দৃষ্টিশক্তি আরও তীক্ষ্ণ করে দেবে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

অনেক খাবারে আছে ভিটামিন এ

ভিটামিন এ শুধু গাজরেই পাওয়া যায় না। আরও অনেক খাবার এই পুষ্টি উপাদানের ভালো উৎস। যেমন - মিষ্টি কুমড়া, মিষ্টি আলু, বাঙ্গি, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, কলিজা এবং শীতকালীন বিভিন্ন স্কোয়াশ জাতীয় সবজি।

তাই চোখের সুস্থতার জন্য শুধু গাজরের ওপর নির্ভর না করে বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।

গাজর ও দৃষ্টিশক্তির গল্পের পেছনের গল্প

গাজর খেলে চোখের দৃষ্টি বেড়ে যায়। এই ধারণার পেছনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি চমকপ্রদ ঘটনা রয়েছে।

সে সময় ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্স রাতের অন্ধকারে জার্মান বিমান শনাক্ত ও ধ্বংস করতে অসাধারণ সাফল্য পাচ্ছিল। কিন্তু তারা চাইছিল না শত্রুপক্ষ জানুক যে এর পেছনে নতুন রাডার প্রযুক্তি কাজ করছে।

তাই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ প্রচার করতে শুরু করে যে তাদের পাইলটরা প্রচুর গাজর খায়, আর সেই কারণেই তারা রাতে এত ভালো দেখতে পারে।

এই প্রচারণা শত্রুদের বিভ্রান্ত করার জন্য তৈরি করা হলেও পরে তা সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় বিশ্বাসে পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ভিটামিন এ-এর প্রকৃত বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে মিশে গিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী ধারণা তৈরি করে।

চিকিৎসকেরা এখনও কেন গাজর খেতে বলেন

যদিও গাজর দৃষ্টিশক্তি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেয় না, তবুও চোখের চিকিৎসকেরা নিয়মিত গাজর ও রঙিন সবজি খাওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ ভিটামিন এ রেটিনার স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এটি চোখের শুষ্কতা কমাতে এবং রাতের বেলায় দেখার ক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়ক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত ভিটামিন এ গ্রহণ চোখের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গাজর কি সত্যিই অন্ধকারে দেখার ক্ষমতা বাড়ায়?

এখানেই প্রচলিত ধারণা ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য চলে আসে।

যদি কারও শরীরে ভিটামিন এ-এর ঘাটতি থাকে, তাহলে গাজর খাওয়ার ফলে তার চোখের স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে পারে এবং রাতের বেলায় দেখার ক্ষমতা কিছুটা ফিরে আসতে পারে। কিন্তু যাদের শরীরে ভিটামিন এ-এর মাত্রা স্বাভাবিক, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গাজর খাওয়া রাতের অন্ধকারে সুপারহিরোর মতো দেখার ক্ষমতা তৈরি করবে না।

অর্থাৎ গাজর চোখকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে, কিন্তু এটি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিশক্তি বাড়িয়ে দেয় না।

চোখ ভালো রাখতে আর কী কী খাবার খাওয়া উচিত

চোখের সুস্থতার জন্য শুধু গাজর নয়, আরও নানা ধরনের পুষ্টিকর খাবার গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা যে খাবারগুলো খাওয়ার পরামর্শ দেন -

  • গাঢ় সবুজ শাকসবজি
  • কমলা ও হলুদ রঙের ফল ও সবজি
  • ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল
  • ভিটামিন ই-সমৃদ্ধ খাবার
  • মটরশুঁটি ও বিভিন্ন ধরনের ডাল
  • বাদাম ও বীজ
  • মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য

এ ছাড়া নিয়মিত চোখের পরীক্ষা করা এবং রোদে বের হলে মানসম্মত সানগ্লাস ব্যবহার করাও চোখের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।

গাজর খেলে চোখের উপকার হয়, এটি সত্য। কারণ এতে থাকা বিটা-ক্যারোটিন শরীরে ভিটামিন এ তৈরি করে, যা চোখের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে গাজর খেলে হঠাৎ করে দৃষ্টিশক্তি বেড়ে যাবে বা চশমা খুলে ফেলতে পারবেন - এ ধারণা সঠিক নয়। এই বিশ্বাসের বড় অংশই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি প্রচারণা থেকে এসেছে।

চোখ সুস্থ রাখতে চাইলে শুধু গাজর নয়, বরং সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: স্যাকরামেন্ট বি লোগো