logo

যেভাবে ‘নীরবতা’ বদলে দেয় আমাদের মস্তিষ্ক

যেভাবে ‘নীরবতা’ বদলে দেয় আমাদের মস্তিষ্ক

চারপাশে এখন শব্দের ছড়াছড়ি। যানবাহনের আওয়াজ, মানুষের কথাবার্তা, মোবাইলের নোটিফিকেশন, টেলিভিশন—সব মিলিয়ে দিন-রাত কোনো না কোনো ধরনের শব্দের ভেতরেই কাটছে আমাদের জীবন।

এই ব্যস্ত ও কোলাহলপূর্ণ সময়ে নীরবতা অনেকটা বিলাসিতার মতো মনে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, নীরবতা শুধু শব্দের অনুপস্থিতি নয়; এটি মানুষের মস্তিষ্কে গভীর ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

নীরবতায় মস্তিষ্কের ভেতরে কী ঘটে

আমরা যখন চুপচাপ থাকি, তখন মস্তিষ্ক নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়—এমনটা ভাবা ভুল। বরং নীরব অবস্থায় মস্তিষ্ক এক বিশেষ সক্রিয়তায় প্রবেশ করে। তখন এটি স্মৃতি সাজায়, অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে এবং নতুন নতুন ধারণা তৈরি করে।

গবেষণায় দেখাচ্ছে, প্রতিদিন অল্প সময়ের নীরবতাও মস্তিষ্কে নতুন কোষ গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষ করে হিপোক্যাম্পাস নামের অংশটি, যা স্মৃতি ও শেখার সঙ্গে যুক্ত, নীরব পরিবেশে ইতিবাচকভাবে সাড়া দেয়। প্রাণীর ওপর পরিচালিত কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে, কয়েকদিন ধরে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা নীরব পরিবেশে রাখলে হিপোক্যাম্পাসে নতুন কোষের বৃদ্ধি পায়। এটি নিউরোজেনেসিস নামে পরিচিত।

শব্দ, চাপ ও মানসিক ক্লান্তি

দীর্ঘ সময় শব্দের মধ্যে থাকলে আমাদের শ্রবণ প্রক্রিয়া সবসময় সক্রিয় থাকে। এর ফলে মানসিক চাপ বাড়তে পারে, মনোযোগ কমে যেতে পারে এবং ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। বিপরীতে, নীরবতা মস্তিষ্ককে বিশ্রামের সুযোগ দেয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অল্প সময়ের নীরবতাও শরীরের কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোন কমাতে সাহায্য করতে পারে। এতে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে, হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যকারিতা উন্নত হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও ভালো থাকে। অর্থাৎ নীরবতা শুধু মানসিক আরাম নয়, শারীরিক উপকারও এনে দেয়।

সৃজনশীলতার জন্য নীরবতা জরুরি

নীরব পরিবেশে মস্তিষ্ক অবাধে চিন্তা করতে পারে। একে অনেক বিজ্ঞানী ‘ডিফিউজ থিংকিং’ বলেন, যেখানে মস্তিষ্ক আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন বিষয়গুলোর মধ্যে নতুন সংযোগ খুঁজে পায়। অনেক বড় আবিষ্কার বা সৃজনশীল ভাবনা এসেছে নির্জনতা বা নীরবতার মুহূর্তে।

বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন (Albert Einstein) নীরবতা ও একান্ত সময়কে মূল্য দিতেন। তিনি প্রায়ই একা হাঁটতেন বা নিরিবিলি বসে ভাবতেন। সংগীতকার লুডভিগ ফান বেটহোফেন (Ludwig van Beethoven) শ্রবণশক্তি হারানোর পর গভীর নীরবতার মধ্যেই তাঁর কিছু বিখ্যাত সিম্ফনি রচনা করেন। তাদের অভিজ্ঞতা দেখায়, নীরবতা সৃজনশীলতার শক্তিশালী সহায়ক হতে পারে।

আবেগ নিয়ন্ত্রণে নীরবতার ভূমিকা

নীরব পরিবেশে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বেশি সক্রিয় হয়, যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্সও সক্রিয় হতে পারে, যা আবেগগত ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে।

নিয়মিত নীরব সময় কাটানো মানুষদের মধ্যে আত্মসচেতনতা ও সহমর্মিতা বাড়তে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ধ্যান বা মননশীল নীরবতা উদ্বেগ ও হতাশার লক্ষণ কমাতেও সহায়ক হতে পারে।

প্রকৃতি ও নীরবতার মিলিত প্রভাব

নীরবতা সবচেয়ে কার্যকর হয় যখন তা প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়। বন, পাহাড়, নদী বা গ্রামীণ পরিবেশে যে ধরনের স্বাভাবিক নীরবতা থাকে, তা মস্তিষ্ককে আলাদা স্বস্তি দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটালে অ্যামিগডালা নামের অংশের কার্যকলাপ কমে, যা ভয় ও স্ট্রেসের সঙ্গে জড়িত।

এ ধরনের পরিবেশে হিপোক্যাম্পাসের সংযোগও উন্নত হতে পারে, যা স্মৃতি ও শেখার জন্য উপকারী।

পড়াশোনা ও কাজের দক্ষতায় নীরবতার প্রভাব

শব্দপূর্ণ পরিবেশে মনোযোগ ভেঙে যায় এবং শেখার ক্ষমতা কমে। বিপরীতে, নিরিবিলি পরিবেশে পড়াশোনা বা কাজ করলে তথ্য বেশি ভালোভাবে মনে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, শেখার পর অল্প সময়ের নীরব বিরতি নিলে তথ্য ধারণের ক্ষমতা বাড়ে।

পেশাজীবীরাও যদি কাজের ফাঁকে কয়েক মিনিট নীরবতা চর্চা করেন, তবে সমস্যা সমাধান, মনোযোগ ও মানসিক সহনশীলতা বাড়তে পারে।

দীর্ঘায়ু ও মস্তিষ্কের সুরক্ষা

দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ কোষের বার্ধক্য ত্বরান্বিত করতে পারে এবং স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। নীরবতা স্ট্রেস কমিয়ে মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রাণীর ওপর করা কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, শান্ত পরিবেশে থাকা প্রাণীদের জ্ঞানীয় সক্ষমতা তুলনামূলক ভালো থাকে।

মানুষের ক্ষেত্রেও ধ্যান ও নীরব অনুশীলন প্রদাহের মাত্রা কমাতে এবং হৃদ্‌স্বাস্থ্য উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে বলে প্রাথমিক গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে।

দৈনন্দিন জীবনে নীরবতা যুক্ত করবেন যেভাবে

নীরবতা চর্চা করতে আলাদা কোনো সরঞ্জাম বা ব্যয়বহুল আয়োজন প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন পাঁচ থেকে দশ মিনিট মোবাইল বন্ধ রেখে চুপচাপ বসা, সকালে হাঁটার সময় গান না শোনা, অথবা কাজের আগে কয়েক মিনিট গভীর শ্বাস নেওয়া—এসব ছোট অভ্যাসই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

স্কুল ও কর্মক্ষেত্রেও এখন নিরিবিলি কক্ষ বা নীরব সময় চালুর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থী ও কর্মীরা মানসিকভাবে সতেজ থাকতে পারেন।

নীরবতা কোনো শূন্যতা নয়; এটি মস্তিষ্কের জন্য এক ধরনের সক্রিয় ও পুনরুদ্ধারমূলক অবস্থা। নীরব মুহূর্তে মস্তিষ্ক স্মৃতি গুছিয়ে নেয়, নতুন ধারণা তৈরি করে, চাপ কমায় এবং আবেগকে স্থিতিশীল করে।

শব্দে ভরা এই সময়ে সচেতনভাবে কিছু সময় নীরব থাকা মানে নিজের মস্তিষ্ককে বিশ্রাম ও বিকাশের সুযোগ দেওয়া। প্রতিদিন অল্প সময়ের নীরবতা আমাদের মানসিক স্বচ্ছতা, সৃজনশীলতা ও সামগ্রিক সুস্থতার জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। নীরবতাকে গুরুত্ব দিলে আমরা শুধু বিশ্রামই পাই না, বরং নিজের ভেতরের সম্ভাবনাকেও নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারি।