দেশের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ‘হাম চিকিৎসা নির্দেশিকা’ প্রকাশ

বাংলাদেশে হাম প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। দেশের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ‘হাম চিকিৎসা নির্দেশিকা’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ। প্রমাণভিত্তিক (এভিডেন্স-বেসড) এই নির্দেশিকাটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে হাম রোগের সুনির্দিষ্ট নির্ণয় ও চিকিৎসা পদ্ধতিকে মানসম্মত এবং সমন্বিত করার লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকাল ৯টায় কলেজ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ নির্দেশিকার আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সর্দার মো. শাহাদাত হোসেন। এই উদ্যোগকে জাতীয় স্বাস্থ্য খাতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি হলি ফ্যামিলি কলেজ ও হাসপাতালের আবাসন, হোস্টেল এবং অবকাঠামোগত সুবিধা সম্প্রসারণের আশ্বাস দেন।
নতুন নির্দেশিকায় তিন স্তরবিশিষ্ট ক্লিনিক্যাল ট্রায়াজ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; যার মাধ্যমে রোগীরা হাসপাতালে প্রবেশের সময়ই স্পষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী বাড়িতে চিকিৎসা, আইসোলেশন ওয়ার্ড কিংবা জরুরি বিভাগ বা আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ভর্তির সুবিধা পাবেন। এছাড়া ল্যাব পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা না করে রোগীকে তাৎক্ষণিকভাবে ভিটামিন-এ দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এতে।
এই নির্দেশিকায় হামজনিত নিউমোনিয়ার জন্য অক্সিজেন ব্যবস্থাপনার ধাপভিত্তিক গাইডলাইন, এনসেফালাইটিস ও খিঁচুনির চিকিৎসা, অন্ধত্ব প্রতিরোধে চোখের জটিলতা ব্যবস্থাপনা, গুরুতর পানিশূন্যতার চিকিৎসা এবং হাসপাতালের আইসোলেশন কক্ষে কঠোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
হাম বায়ুবাহিত রোগ হওয়ায় স্বাস্থ্যকর্মীদের সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্কের পরিবর্তে বাধ্যতামূলকভাবে রেসপিরেটর (এন-৯৫ বা সমমান) ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নির্দেশিকায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও রয়েছে। এর মধ্যে হামজনিত নিউমোনিয়ায় কর্টিকোস্টেরয়েড ব্যবহার করা যাবে না, চোখের জটিলতায় স্টেরয়েড ড্রপ ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং গুরুতর পানিশূন্যতায় শুধুমাত্র ডেক্সট্রোজ স্যালাইন ব্যবহার করা যাবে না।
হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. কে. এম. মজিবুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন-অর-রশীদ, মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহীন রহমান চৌধুরী এবং কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মেহেরুন নেসা।
অনুষ্ঠানে কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. ফারহানা হক হাসপাতাল সম্পর্কিত এবং মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সায়েম মোহাম্মদ ‘হাম চিকিৎসা নির্দেশিকা’ নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। ১৪টি ক্লিনিক্যাল মডিউল নিয়ে প্রণীত ৫০ পৃষ্ঠার এই নির্দেশিকাটির প্রধান সম্পাদক ডা. ফারহানা হক ও ডা. সায়েম মোহাম্মদ।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় ডা. সায়েম মোহাম্মদ বিশ্বব্যাপী হাম রোগের পুনরুত্থান সম্পর্কে আলোকপাত করেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ হাম রোগীর মধ্যে ১ লাখ ৭ হাজার ৫০০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের ৯৫ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ; এর সংক্রমণ হার ১২–১৮, যা অধিকাংশ পরিচিত সংক্রামক রোগের তুলনায় অনেক বেশি। গত বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ শিশু প্রথম ডোজ এবং প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ শিশু কোনো টিকাই পায়নি।
১৭ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশে বিভিন্ন বিভাগে, বিশেষ করে শহুরে বস্তি ও কম টিকাদান কভারেজ এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। এতদিন দেশে হাম চিকিৎসার কোনো জাতীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশিকা না থাকায় চিকিৎসকদের মানসম্মত গাইডলাইন ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে হতো। ফলে নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস ও মারাত্মক পানিশূন্যতার মতো জটিলতার ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্য দেখা দিত এবং প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু ঘটত।
