logo

ভয় পেলেও কেন আমরা হরর পছন্দ করি, আছে বৈজ্ঞানিক কারণ

ভয় পেলেও কেন আমরা হরর পছন্দ করি, আছে বৈজ্ঞানিক কারণ

ভয়ের সিনেমা দেখে অনেকেই চোখ ঢেকে রাখেন, তবু শেষ পর্যন্ত দেখেন। ভয় লাগে, হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, অস্বস্তি হয়। তারপরও আবার এমন সিনেমা বা গল্পের দিকেই ফিরে যাই। কেন এমন হয়? আমরা কি অস্বাভাবিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ?

আচরণবিজ্ঞানী ও গবেষক কলটান স্ক্রিভনার (Coltan Scrivner) তার বই মরবিডলি কিউরিয়াস: এ সাইন্টিস্ট এক্সপ্লেইনস ওয়াই উই কান্ট লুক এওয়ে (Morbidly Curious: A Scientist Explains Why We Can’t Look Away)-এ ব্যাখ্যা করেন, ভয়ংকর গল্প, সিনেমা বা পডকাস্টের প্রতি আমাদের আকর্ষণের পেছনে রয়েছে স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক কারণ।

ভয় পাওয়ার মধ্যেই লুকানো উত্তেজনা
ভয়ের সিনেমা দেখার সময় মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এটি বিপদের সংকেত শনাক্ত করে। তখন শরীরে অ্যাড্রেনালিন নিঃসৃত হয়, হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শরীর লড়াই বা পালানোর জন্য প্রস্তুত হয়। বাস্তবে বিপদের মুখে এই প্রতিক্রিয়া আমাদের রক্ষা করে।

কিন্তু সিনেমা বা গল্পে সেই বিপদ বাস্তব নয়। আমরা জানি, সোফায় বসে আছি, পর্দার ঘটনা আমাদের ছুঁতে পারবে না। ফলে আমরা নিরাপদ অবস্থায় থেকেও উত্তেজনার অনুভূতি পাই। অনেকের কাছে এই অ্যাড্রেনালিন রাশ এক ধরনের আনন্দ।

ভয় জয় করার তৃপ্তি
হররপ্রেমীরা সব সময় ভয় পাওয়ার অনুভূতিটাই পছন্দ করেন না। বরং ভয়কে অতিক্রম করার অভিজ্ঞতাই তাদের বেশি টানে।

একদিকে অ্যামিগডালা বিপদের সংকেত দেয়, অন্যদিকে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বলে সব ঠিক আছে, এটা শুধু সিনেমা। ফলে এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি তৈরি হয়, ভয়, কৌতূহল ও স্বস্তি একসঙ্গে কাজ করে।

এই নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ভয়কে মোকাবিলা করা মানসিকভাবে এক ধরনের অর্জনের অনুভূতি দেয়। যেন নিজের ভয়কে জয় করা গেল।

উদ্বেগ কমাতেও সাহায্য করতে পারে
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, ভয়ংকর সিনেমা অনেক সময় উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে। সাধারণ উদ্বেগে ভোগা মানুষদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক সব সময় কোনো না কোনো অজানা বিপদের খোঁজে থাকে।

এ অবস্থায় একটি হরর সিনেমা মস্তিষ্ককে নির্দিষ্ট একটি কল্পিত বিপদের দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য করে। ফলে ছড়িয়ে থাকা উদ্বেগ একটি নির্দিষ্ট দিকে কেন্দ্রীভূত হয়। সিনেমা শেষ হলে এবং আমরা বুঝি যে সব ঠিক আছে, তখন শরীরের প্যারাসিমপ্যাথেটিক সিস্টেম সক্রিয় হয়ে শরীরকে শান্ত করে। এতে স্বস্তি অনুভূত হয়।

বাস্তব জীবনে সতর্ক থাকতে শেখায়
হরর সিনেমা বা ট্রু ক্রাইম গল্প আমাদের নানা সম্ভাব্য বিপদের ধারণা দেয়। যদিও এগুলো দেখে সরাসরি আত্মরক্ষার কৌশল শেখা যায় না, তবু গল্পের মাধ্যমে আমরা ঝুঁকির ধরন সম্পর্কে সচেতন হই।

যেমন, দ্য সাইলেন্স অব দা ল্যাম্বস (The Silence of the Lambs)-এর মতো সিনেমা অনেককে অচেনা মানুষের ব্যাপারে বেশি সতর্ক হতে প্রভাবিত করেছে। গল্প আমাদের নিরাপদ দূরত্বে রেখে বিপদের চিত্র দেখায়। এতে ঝুঁকি ছাড়াই শেখার সুযোগ মেলে।

আবেগ নিয়ন্ত্রণের অনুশীলন
হরর সিনেমা দেখা এক ধরনের ইমোশন রেগুলেশন অনুশীলন। দর্শক চেষ্টা করেন ভয়কে একেবারে চরমে যেতে না দিতে, আবার একদম নিষ্প্রভও রাখতে চান না। এই ওঠানামা নিয়ন্ত্রণের চর্চা বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, কর্মক্ষেত্র বা চাপপূর্ণ পরিস্থিতিতে আবেগ সামলাতে সহায়ক হতে পারে।

সবাই কেন হরর পছন্দ করেন না

মানুষের ব্যক্তিত্ব ভিন্ন। কেউ তীব্র উত্তেজনা উপভোগ করেন, কেউ এড়িয়ে চলেন। গবেষণায় দেখা গেছে, হররপ্রেমীরা সহানুভূতিশীল নন এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে তারা অন্যদের মতোই, কখনো কখনো আরও বেশি সহমর্মী।

কারণ একটি হরর গল্প সাধারণত দুর্বল কোনো চরিত্রকে শক্তিশালী খলনায়কের আক্রমণের মুখে ফেলে। ভয় অনুভব করতে হলে দর্শককে ভুক্তভোগীর সঙ্গে মানসিকভাবে সংযুক্ত হতে হয়। ফলে সহানুভূতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সিনেমা, বই ও পডকাস্টে পার্থক্য

চলচ্চিত্রে দৃশ্য ও শব্দ একসঙ্গে কাজ করে, ফলে প্রভাব দ্রুত ও তীব্র হয়। যেমন দ্য কনজিউরিং (The Conjuring) বা আমেরিকান হরর স্টোরি (American Horror Story)-এর মতো প্রযোজনায় ভয় দৃশ্যমানভাবে উপস্থিত থাকে।

অন্যদিকে হরর উপন্যাসে পাঠককে কল্পনার বেশি ব্যবহার করতে হয়। যেমন স্টেফেন কিং (Stephen King)-এর লেখা গল্পে ধীরে ধীরে আতঙ্ক তৈরি হয়, যা দীর্ঘ সময় ধরে মনে থেকে যেতে পারে। পডকাস্ট মাঝামাঝি অবস্থানে, যেখানে শব্দ আছে, কিন্তু দৃশ্য কল্পনা করতে হয় নিজেকেই।

ভয় ও কৌতূহল মানুষের চিরন্তন সঙ্গী

শত শত বছর ধরে লোককাহিনি ও রূপকথায় শিকারি প্রাণী, অন্ধকার চরিত্র ও অজানা বিপদের গল্প বলা হয়েছে। এসব গল্প একদিকে বিনোদন, অন্যদিকে সতর্কবার্তা।

শুধু মানুষ নয়, প্রাণীরাও সম্ভাব্য শিকারিকে পর্যবেক্ষণ করে শেখে। মানুষ সেই কাজটি করে গল্পের মাধ্যমে।

ভয়ংকর সিনেমা বা গল্প উপভোগ করা মানেই কেউ অস্বাভাবিক বা নিষ্ঠুর নন। বরং এটি মানুষের স্বাভাবিক কৌতূহল, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ও শেখার প্রক্রিয়ার অংশ। নিরাপদ পরিবেশে ভয় অনুভব করে, তাকে সামলে নিয়ে শেষ পর্যন্ত স্বস্তি পাওয়া আমাদের মস্তিষ্কের জটিল ও আকর্ষণীয় কাজেরই প্রকাশ।