পুরুষের বন্ধ্যত্বের কারণ কী, শুক্রাণুর মান ভালো রাখতে যেসব খাবার উপকারী

সন্তান ধারণে সমস্যা হলে এর পেছনে শুধু নারীর শারীরিক কারণ রয়েছে, এমন ধারণা ঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যাও এর জন্য দায়ী হতে পারে। বিশেষ করে শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া, চলনক্ষমতা বা গঠনে অস্বাভাবিকতা থাকলে সন্তান ধারণের সম্ভাবনা কমতে পারে। এর পাশাপাশি হরমোনের সমস্যা, কিছু রোগ, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান, মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও শুক্রাণুর মানে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এসব সমস্যা থাকলেই যে সন্তান ধারণ অসম্ভব, তা নয়। কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাটসমৃদ্ধ কিছু খাবার শুক্রাণুর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই পুরুষের বন্ধ্যত্বের সম্ভাব্য কারণ জানার পাশাপাশি শুক্রাণুর মান ভালো রাখতে কোন খাবারগুলো খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে, সেটিও জানা গুরুত্বপূর্ণ।
পুরুষের বন্ধ্যত্বের প্রধান কারণ
ইনফার্টিলিটি কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের প্রধান পরামর্শক অধ্যাপক ডা. মোসাম্মাত রাশিদা বেগম গণমাধ্যমকে জানান, পুরুষের বন্ধ্যত্ব প্রধানত শুক্রাণুজনিত বিভিন্ন সমস্যার কারণে হয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে-
- শুক্রাণু তৈরি না হওয়া
- শুক্রাণুর সংখ্যা খুব কম হওয়া
- শুক্রাণুর গতিশীলতা কমে যাওয়া
- শুক্রাণুর আকৃতিগত ত্রুটি
- যৌন সক্ষমতার সমস্যার কারণে শুক্রাণু নারীর প্রজননপথে পৌঁছাতে না পারা
কিছু ক্ষেত্রে শুক্রাণু পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হলেও অণ্ডকোষ থেকে বীর্যে পৌঁছাতে পারে না। অণ্ডকোষে সংক্রমণ বা আঘাতের কারণে শুক্রাণু পরিবহনের নালি বন্ধ হয়ে গেলেও এমন সমস্যা হতে পারে। আবার কারও কারও জন্মগতভাবেই এই নালি অনুপস্থিত থাকতে পারে।
কেন শুক্রাণুর মান কমে যেতে পারে
অধ্যাপক ডা. মোসাম্মাত রাশিদা বেগমের মতে, অনেক ক্ষেত্রে শুক্রাণুর ঘাটতির নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে জীবনযাপন ও পরিবেশগত বিভিন্ন বিষয় শুক্রাণুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, অতিরিক্ত গরম পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাজ করা, দূষণ, অতিরিক্ত ওজন, পুষ্টির ঘাটতি এবং কিছু রাসায়নিকের সংস্পর্শ এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। ভিটামিন ও জিংকের ঘাটতিও প্রজননস্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া ডায়াবেটিস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, অণ্ডকোষের সংক্রমণ বা আঘাত এবং কিছু ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতির কারণেও শুক্রাণু উৎপাদন বা কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপিও শুক্রাণু উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই দীর্ঘদিন চেষ্টা করার পরও সন্তান না এলে নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শুক্রাণুর মান ভালো রাখতে কী খাবেন
কোনো একটি খাবার খেলেই শুক্রাণু হঠাৎ বেড়ে যাবে, এমন প্রমাণ নেই। তবে সুষম খাদ্যাভ্যাস শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার পাশাপাশি প্রজননস্বাস্থ্যের জন্যও সহায়ক হতে পারে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, স্বাস্থ্যকর চর্বি, জিংক, ভিটামিন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
আনার: আনারে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে আনার রাখা যেতে পারে।
আখরোট: আখরোটে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। স্বাস্থ্যকর চর্বি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ বাদাম সামগ্রিক প্রজননস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
টমেটো: টমেটোতে লাইকোপেন নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। কিছু গবেষণায় লাইকোপেনের সঙ্গে শুক্রাণুর গুণগত মানের ইতিবাচক সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। নিয়মিত সবজি ও ফল খাওয়ার অংশ হিসেবে টমেটো খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
কুমড়োর বীজ: কুমড়োর বীজ জিংক, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ভালো উৎস। জিংক পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ। তবে শুধু কুমড়োর বীজ খেলেই শুক্রাণু বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ডার্ক চকলেট: ডার্ক চকলেটে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও এল-আরজিনিনের মতো কিছু উপাদান রয়েছে। তবে এতে ক্যালরি ও চিনি থাকতে পারে। তাই পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো। শুক্রাণু বাড়ানোর জন্য এটিকে কোনো বিশেষ চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
শুধু খাবার নয়, জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ
মনে রাখবেন, শুক্রাণুর মান ভালো রাখতে খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি জীবনযাপনের দিকেও নজর দিতে হবে। এক্ষেত্রে নিচের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখুন-
ধূমপান বন্ধ করুন: ধূমপান শুক্রাণুর সংখ্যা, গতি ও গুণগত মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন: অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ হরমোনের ভারসাম্য ও প্রজননক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: অতিরিক্ত ওজন হরমোনের ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে, যা শুক্রাণু উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: পরিমিত শারীরিক পরিশ্রম ও নিয়মিত ব্যায়াম সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং বিপাকীয় কার্যক্রম ভালো রাখতে সাহায্য করে।
অতিরিক্ত তাপ এড়িয়ে চলুন: অণ্ডকোষের অতিরিক্ত তাপমাত্রা শুক্রাণু উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরম পরিবেশে থাকা বা অণ্ডকোষের ওপর দীর্ঘক্ষণ অতিরিক্ত তাপ প্রয়োগের বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন: দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি ও অতিরিক্ত মানসিক চাপ শরীরের হরমোন ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত
নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌনসম্পর্কের পরও এক বছর চেষ্টা করে সন্তান না এলে দম্পতির দুজনেরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। স্ত্রীর বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি হলে ছয় মাস চেষ্টা করার পরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
পুরুষের ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী সিমেন অ্যানালাইসিস বা বীর্য পরীক্ষা করতে পারেন। এই পরীক্ষার মাধ্যমে শুক্রাণুর সংখ্যা, গতিশীলতা ও গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রয়োজনে হরমোন পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাম বা অন্যান্য পরীক্ষাও করা হতে পারে।
ক্যানসারের চিকিৎসার আগে শুক্রাণু সংরক্ষণ
কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির মতো কিছু ক্যানসার চিকিৎসা শুক্রাণু উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই চিকিৎসা শুরুর আগে ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে শুক্রাণু সংরক্ষণের বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
চিকিৎসা আছে, তাই দেরি নয়
পুরুষের বন্ধ্যত্ব একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা হতে পারে। সমস্যার কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতিও ভিন্ন হয়। কারও ক্ষেত্রে জীবনযাপনে পরিবর্তন ও ওষুধ যথেষ্ট হতে পারে। আবার প্রয়োজন হলে আইইউআই, আইভিএফ বা অন্যান্য সহায়ক প্রজনন পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সন্তান না হওয়ার জন্য নারীকে একা দায়ী না করা। বন্ধ্যত্বের কারণ নারী বা পুরুষ, উভয়ের ক্ষেত্রেই থাকতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে দুজনেরই পরীক্ষা করা উচিত।
স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা পুরুষের সামগ্রিক ও প্রজননস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে কোনো নির্দিষ্ট খাবার বা ঘরোয়া উপায়কে বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও সন্তান না এলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
.png)


