নাকের এক ছিদ্র দিয়েই কেন বেশি শ্বাস নেন, জানেন কি

সর্দি বা মৌসুমি অ্যালার্জি হলে নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। তখন শ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হয়। কিন্তু অনেক সময় অসুস্থ না থাকলেও খেয়াল করলে দেখা যায়, গভীর শ্বাস নেওয়ার সময় এক পাশের নাক দিয়ে বাতাস বেশি ঢুকছে, অন্য পাশটা তুলনামূলক কম খোলা।
এটি কোনো সমস্যা নয়। বরং এটি মানুষের শরীরের একেবারে স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া।
নাকের স্বাভাবিক চক্র
মানুষের নাকে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কাজ করে, যাকে বলা হয় নাসাল সাইকেল বা নাকের চক্র। এই প্রক্রিয়ায় দিনের বিভিন্ন সময়ে এক নাসারন্ধ্র দিয়ে বেশি বাতাস প্রবেশ করে, পরে আবার অন্যটি প্রধান হয়ে ওঠে।
এই পরিবর্তন দিনে কয়েকবার ঘটে। সাধারণত প্রায় দুই ঘণ্টা পরপর নাসারন্ধ্রের আধিপত্য বদলে যায়। তবে ঘুমের সময় এই পরিবর্তন কিছুটা ধীর হয়, কারণ তখন শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি কম থাকে।
নাসাল সাইকেলের দুটি ধাপ রয়েছে
একটি ধাপে একটি নাসারন্ধ্র কিছুটা বন্ধ বা সংকুচিত থাকে, আর অন্যটি খোলা থাকে। খোলা নাসারন্ধ্র দিয়ে তখন বেশি বাতাস প্রবাহিত হয়।
খোলা নাসারন্ধ্র দিয়ে বেশি বাতাস চলাচল করার কারণে সেটি কিছুটা শুকিয়ে যায় এবং বাইরের জীবাণুর সংস্পর্শেও বেশি আসে। তাই কিছু সময় পর শরীর নিজেই নাসারন্ধ্রের ভূমিকা বদলে দেয়।
মস্তিষ্ক কীভাবে এটি নিয়ন্ত্রণ করে
এই পুরো প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয় এবং মস্তিষ্কের একটি অংশ হাইপোথ্যালামাস এটি নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষ সাধারণত এ পরিবর্তন টেরই পায় না।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে বাম নাসারন্ধ্র তুলনামূলক বেশি সক্রিয় থাকে, বিশেষ করে ডানহাতি মানুষের ক্ষেত্রে। আবার ডান নাসারন্ধ্র বেশি সক্রিয় থাকলে শরীর তুলনামূলক সতর্ক বা উত্তেজিত অবস্থায় থাকে। বাম নাসারন্ধ্র সক্রিয় হলে শরীর বেশি শান্ত ও আরামদায়ক অবস্থায় থাকতে পারে।
কেন এই চক্র গুরুত্বপূর্ণ
নাসাল সাইকেল আমাদের শ্বাসযন্ত্রের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার লিটার বাতাস নাকের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে। ফলে নাকই প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর হিসেবে কাজ করে, যেখানে ধুলো, জীবাণু ও ক্ষতিকর কণাকে আটকে দেওয়া হয়।
নাসারন্ধ্র পালাক্রমে কাজ করার ফলে নাকের ভেতরের অংশ বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায়। এতে নাকের ভেতরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে।
এ সময় নাকের রক্তনালিতেও রক্তপ্রবাহ বাড়ে, যা নাসারন্ধ্রকে আর্দ্র রাখে এবং ভেতরে ঢোকা বাতাসকে উষ্ণ ও আর্দ্র করতে সাহায্য করে।
কোন কারণে এই চক্র ব্যাহত হতে পারে
- কিছু শারীরিক সমস্যা বা পরিবেশগত কারণ নাসাল সাইকেলের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত করতে পারে।
- সর্দি বা ফ্লুর মতো শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে নাকে অতিরিক্ত শ্লেষ্মা তৈরি হয়। এতে নাসারন্ধ্রের স্বাভাবিক পরিবর্তন বাধাগ্রস্ত হয়।
- পরাগরেণু বা ধুলার মতো অ্যালার্জেন নাকের টিস্যুতে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে নাক বেশি সময় বন্ধ অনুভূত হতে পারে।
- উচ্চ রক্তচাপের কিছু ওষুধ নাকের ভেতরের আবরণে প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া নাক খোলার স্প্রে দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে উল্টো নাক আরও বেশি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
নাকের গঠনগত সমস্যাও কারণ হতে পারে
কিছু মানুষের নাকে পলিপ নামে ছোট মাংসপিণ্ড তৈরি হয়, যা বাতাস চলাচলে বাধা দেয়। আবার অনেকের নাকের মাঝের হাড় বা কার্টিলেজ একদিকে বেঁকে থাকে। এটিকে ডেভিয়েটেড সেপটাম বলা হয়। এতে প্রায়ই নাক বন্ধ অনুভূত হতে পারে এবং কখনও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়।
দৈনন্দিন অভ্যাসের প্রভাব
খুব সাধারণ কিছু বিষয়ও নাসাল সাইকেলে প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন পাশ ফিরে শোয়া বা ঝুঁকে বসে থাকা। শোয়ার সময় মাধ্যাকর্ষণের কারণে রক্ত নাকের এক পাশে জমা হতে পারে, ফলে একটি নাসারন্ধ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি তৈরি হয়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত
সাধারণত সর্দি বা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে নাক বন্ধ থাকলে তা এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। সাইনাসের সংক্রমণ হলে এটি প্রায় চার সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
কিন্তু যদি দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে একটি নাসারন্ধ্র সবসময় বন্ধ থাকে, বা নাক থেকে অস্বাভাবিক স্রাব বের হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
মানুষের নাকের ভেতরে চলা নাসাল সাইকেল একটি স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। এটি আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসকে কার্যকর রাখে এবং নাককে জীবাণু ও ক্ষতির হাত থেকে সুরক্ষা দেয়। তাই কখনও যদি মনে হয় এক নাক দিয়ে বেশি শ্বাস নিচ্ছেন, সেটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শরীরের স্বাভাবিক কাজের অংশ।
সূত্র : সিএনএন