logo
Advertisement

স্ট্রোক হলে প্রথম কয়েক মিনিটে যে ভুলগুলো বাড়াতে পারে বিপদ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
স্ট্রোক হলে প্রথম কয়েক মিনিটে যে ভুলগুলো বাড়াতে পারে বিপদ
ছবি : সংগৃহীত

হঠাৎ কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। মুখের এক পাশ বেঁকে গেছে। একটি হাত বা পা অবশ হয়ে আসছে কিংবা শরীরের এক পাশের শক্তি কমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই প্রথমে বুঝতে পারেন না কী করা উচিত। কেউ পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করেন, কেউ বাড়িতে থাকা ওষুধ খুঁজতে শুরু করেন, আবার কেউ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখেন রোগী নিজে থেকেই ভালো হয়ে যান কি না।

Advertisement

স্ট্রোকের ক্ষেত্রে এমন অপেক্ষা বিপজ্জনক হতে পারে। মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ বা কমে গেলে যত বেশি সময় চিকিৎসা ছাড়া কেটে যায়, তত বেশি মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে প্রথম কাজ হলো দ্রুত জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।


আগে বুঝুন, স্ট্রোকের লক্ষণ কী

স্ট্রোক শনাক্ত করার সহজ একটি পদ্ধতি হলো FAST।

F বা Face: রোগীকে হাসতে বলুন। মুখের এক পাশ বেঁকে গেছে কি না দেখুন।

A বা Arms: রোগীকে দুই হাত সামনে তুলতে বলুন। একটি হাত নিচে নেমে যাচ্ছে বা তুলতে পারছেন না কি না দেখুন।

S বা Speech: রোগীকে একটি সহজ বাক্য বলতে বলুন। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে কি না, অস্বাভাবিক শোনাচ্ছে কি না বা কথা বলতে পারছেন না কি না খেয়াল করুন।

T বা Time: এসবের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা গেলে সময় নষ্ট না করে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।

মুখ বেঁকে যাওয়া, এক পাশের হাত বা পা দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া এবং কথা বলায় সমস্যা হওয়া স্ট্রোকের পরিচিত লক্ষণ। এর সঙ্গে হঠাৎ দৃষ্টির সমস্যা, মাথা ঘোরা, হাঁটতে সমস্যা বা তীব্র মাথাব্যথাও হতে পারে।


প্রথম কাজ হবে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া

স্ট্রোকের চিকিৎসায় সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কিছু ধরনের ইস্কেমিক স্ট্রোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চিকিৎসা শুরু করা গেলে মস্তিষ্কের ক্ষতি কমানোর সুযোগ থাকে। আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে চিকিৎসকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ইস্কেমিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে নির্দিষ্ট ওষুধ দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তবে কোন চিকিৎসা দেওয়া যাবে, তা রোগীর পরীক্ষা ও মস্তিষ্কের স্ক্যানের ওপর নির্ভর করে।

তাই রোগী কিছুটা ভালো বোধ করছেন কি না, সেটি দেখার জন্য বাড়িতে বসে থাকা উচিত নয়।

হাসপাতালে যাওয়ার সময় সম্ভব হলে এমন ব্যবস্থা করুন, যাতে জরুরি চিকিৎসা দ্রুত পাওয়া যায়। রোগীকে নিজে গাড়ি চালাতে দেবেন না।

লক্ষণ কখন শুরু হয়েছে, সময়টা মনে রাখুন

স্ট্রোকের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, লক্ষণ কখন শুরু হয়েছে।

তাই রোগীকে শেষবার কখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক দেখা গিয়েছিল এবং কখন প্রথম মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা হাত-পা দুর্বল হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা গেছে, সেই সময়টি নোট করে রাখুন। হাসপাতালে গিয়ে এই তথ্য চিকিৎসককে জানাতে হবে।

অনেক সময় রোগী ঘুম থেকে ওঠার পর স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে কখন শেষবার স্বাভাবিক ছিলেন, সেই সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

মুখে পানি বা খাবার দেবেন না

স্ট্রোকের পর রোগীর গিলতে সমস্যা হতে পারে। বাইরে থেকে দেখে সবসময় বোঝা যায় না যে তিনি স্বাভাবিকভাবে খাবার বা পানি গিলতে পারছেন কি না।

এ অবস্থায় জোর করে পানি, খাবার বা অন্য কোনো তরল খাওয়ালে তা খাদ্যনালির বদলে শ্বাসনালিতে ঢুকে যেতে পারে। এতে ফুসফুসে গুরুতর সমস্যা তৈরি হতে পারে।

তাই হাসপাতালে নেওয়ার আগ পর্যন্ত রোগীকে মুখে পানি, খাবার বা কোনো পানীয় না দেওয়াই নিরাপদ।

নিজের সিদ্ধান্তে অ্যাসপিরিন দেবেন না

স্ট্রোক হয়েছে শুনে অনেকে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাসপিরিন খাওয়ানোর কথা ভাবেন। কিন্তু সব স্ট্রোক এক ধরনের নয়।

ইস্কেমিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কের রক্তনালি বন্ধ হয়ে যায়। আবার হেমোরেজিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোক হলে নিজে থেকে অ্যাসপিরিন দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ এতে রক্তপাত বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

তাই স্ট্রোকের ধরন নিশ্চিত করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা অন্য কোনো ওষুধ দেওয়া উচিত নয়।

হাসপাতালে পৌঁছে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, বিশেষ করে মস্তিষ্কের স্ক্যানের পর চিকিৎসকেরা ঠিক করবেন কোন চিকিৎসা প্রয়োজন।

রোগীকে একা রাখবেন না

স্ট্রোকের লক্ষণ কিছুক্ষণ পর কমে গেলেও বিষয়টি নিরাপদ ধরে নেওয়া যাবে না। কয়েক মিনিটের জন্য কথা জড়িয়ে যাওয়া, এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া বা দৃষ্টির সমস্যা পরে ঠিক হয়ে গেলেও সেটি ট্রান্সিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক বা টিআইএ হতে পারে। এটি ভবিষ্যতে বড় স্ট্রোকের সতর্কসংকেত হতে পারে।

তাই লক্ষণ চলে গেছে বলে রোগীকে বাড়িতে রেখে অপেক্ষা করা ঠিক নয়। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

রোগীকে কীভাবে রাখবেন?

রোগী সচেতন থাকলে তাকে নিরাপদ ও আরামদায়ক অবস্থায় রাখুন এবং অযথা হাঁটাচলা করতে দেবেন না। মাথা কিছুটা উঁচু করে শোয়ানো যেতে পারে।

রোগী অচেতন হয়ে গেলে এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে থাকলে তাকে এক পাশে কাত করে রাখুন, যাতে বমি হলে শ্বাসনালিতে ঢোকার ঝুঁকি কমে। একই সঙ্গে দ্রুত জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।

যদি রোগী স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নেন বা সাড়া না দেন, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নেওয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ থাকলে প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী পদক্ষেপ শুরু করতে হবে।

আর কী কী করবেন না?

স্ট্রোকের সময় কয়েকটি সাধারণ ভুল এড়িয়ে চলা জরুরি।

মালিশ করবেন না: হাত-পা অবশ হয়ে গেছে দেখে জোরে মালিশ বা ঘষাঘষি করার প্রয়োজন নেই। এতে মূল সমস্যার চিকিৎসা হয় না এবং হাসপাতালে নিতে দেরি হতে পারে।

হাঁটিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করবেন না: রোগীর শরীরের ভারসাম্য ও শক্তি কমে যেতে পারে। পড়ে গিয়ে আরও আঘাত লাগার ঝুঁকি থাকে।

ঘরোয়া চিকিৎসায় সময় নষ্ট করবেন না: তেল, পানি, মধু, ভেষজ উপাদান বা অন্য কোনো ঘরোয়া উপায় দিয়ে স্ট্রোকের চিকিৎসা করার চেষ্টা করা উচিত নয়।

নিজে থেকে ওষুধ দেবেন না: বিশেষ করে রক্ত পাতলা করার ওষুধ বা অ্যাসপিরিন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দেওয়া উচিত নয়।

লক্ষণ কমে গেলে বিষয়টি এড়িয়ে যাবেন না: কয়েক মিনিটের মধ্যে সব ঠিক হয়ে গেলেও দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া দরকার।

কেন এত দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে?

মস্তিষ্কের প্রতিটি অংশের কাজ নির্ভর করে সেখানে পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছানোর ওপর। রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে সেই অংশের মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।

তাই স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালে চিকিৎসকেরা প্রথমে রোগীর লক্ষণ ও শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করবেন। প্রয়োজন অনুযায়ী মস্তিষ্কের স্ক্যান করে বোঝার চেষ্টা করবেন স্ট্রোকটি রক্তনালি বন্ধ হওয়ার কারণে হয়েছে, নাকি রক্তক্ষরণের কারণে হয়েছে। এরপর সেই অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হবে।

স্ট্রোকের আগে টিআইএ হলে কী করবেন?

কখনো স্ট্রোকের মতো লক্ষণ কয়েক মিনিট বা অল্প সময়ের জন্য দেখা দিয়ে আবার পুরোপুরি চলে যেতে পারে। যেমন কথা জড়িয়ে যাওয়া, এক হাত দুর্বল হয়ে যাওয়া, মুখ বেঁকে যাওয়া বা হঠাৎ চোখে কম দেখা।

এমন ঘটনা টিআইএ হতে পারে। লক্ষণ চলে গেছে বলে এটিকে সামান্য সমস্যা ভাবা যাবে না। কারণ এটি ভবিষ্যৎ স্ট্রোকের ঝুঁকির সতর্কসংকেত হতে পারে।

তাই এমন ঘটনা একবার হলেও দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

মনে রাখার সহজ নিয়ম

কেউ হঠাৎ স্ট্রোক করলে কয়েকটি বিষয় মনে রাখুন।

  • লক্ষণ চিনুন। মুখ বেঁকে যাওয়া, এক পাশ দুর্বল হওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা বুঝতে সমস্যা হলে সতর্ক হোন।
  • সময় লিখে রাখুন। লক্ষণ কখন শুরু হয়েছে বা রোগীকে শেষ কখন স্বাভাবিক দেখা গেছে, সেটি মনে রাখুন।
  • মুখে কিছু দেবেন না। পানি, খাবার বা নিজের ইচ্ছায় ওষুধ দেবেন না।
  • দ্রুত হাসপাতালে নিন। লক্ষণ কমে গেলেও অপেক্ষা করবেন না।
  • রোগীকে একা রাখবেন না। নিরাপদ অবস্থায় রেখে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।

স্ট্রোক এমন একটি জরুরি অবস্থা যেখানে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে দ্রুত এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মুখ বেঁকে যাওয়া, এক পাশের হাত-পা দুর্বল হওয়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখলে অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা নিন। কয়েক মিনিটের দেরিও চিকিৎসার সুযোগ ও রোগীর ভবিষ্যৎ সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্র: স্ট্রোক অ্যাসোসিয়েশন