logo
আলোচনা সভায় বিশিষ্টজনেরা

হাম নিয়ে দোষারোপের চেয়ে পদক্ষেপ জরুরি

হাম নিয়ে দোষারোপের চেয়ে পদক্ষেপ জরুরি
বাংলাদেশ চাইল্ড প্রোটেকশন ইনিশিয়েটিভ আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় দোষারোপের রাজনীতির চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশিষ্ট্যজনেরা। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের দায় নিয়ে তদন্ত ও বিচারের দাবিও জানিয়েছেন তারা।

শনিবার (১৬ মে) ডেইলি স্টারে তৌফিক আজিজ খান সেমিনার হলে বাংলাদেশ চাইল্ড প্রোটেকশন ইনিশিয়েটিভ আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

‘প্রতিরোধযোগ্য যোগের শিশু মৃত্যু নয়- জবাবদিহি, ন্যায়বিচার ও জরুরি জনস্বাস্থ্য পদক্ষেপ চাই’-শীর্ষক এই আলোচনা সভায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, অভিনয়শিল্পী মেহের আফরোজ শাওন, সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল অংশ নেন। এ ছাড়াও নার্স, লেখক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, উন্নয়নকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এতে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ আগামীতে প্রতিবন্ধী একটা রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে। এসব হামে আক্রান্ত শিশুদের পুনর্বাসনের জন্য, মৃত্যু ঠেকাতে রাষ্ট্রের পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। শুধু দোষারোপের রাজনীতি চলছে, কেউই দায় নিচ্ছে না। অথচ এই সময়ে দোষারোপের চেয়ে দরকার জরুরি কার্যকর পদক্ষেপ।

তারা আরও বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্বরতরা দায়িত্ব নেওয়ার আগে যতটা আগ্রহ দেখান, নেওয়ার পর আর সেটি দেখা যায় না। সংকটটা কোথায় আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। এতগুলো শিশু মারা গেল, তারপরও এখনও সবাই স্বাভাবিক। কারা এটাকে স্বাভাবিক করল, তাদেরকে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

অভিনয়শিল্পী মেহের আফরোজ শাওন বলেন, ২০২৬ সালে এসে হাম নিয়ে আমাদের কথা বলতে হচ্ছে, এটাই সবচেয়ে দুঃখজনক। আগে ডায়রিয়ার মতো রোগের বিষয়েও সচেতনতামূলক কর্মসূচি করতে দেখা যেত সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু হামের মতো একটা মরণব্যাধির বিষয়ে এমন কোনো কিছু করতে দেখা যাচ্ছে না। এই যে হঠাৎ করে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়া, টিকার প্রতি অনীহা সেগুলো যেমন বাড়ছে, উল্টো দিকে সচেতনতার জায়গাগুলো কমছে।

তিনি বলেন, ফেসবুকে অনেক সময় রাজনৈতিক বক্তব্য দিলে জেলে যেতে হয়। কিন্তু ওয়াজের মাহফিলে যখন টিকা নিতে নিষেধ করে বলা হয়, এটা ইহুদিদের তৈরি, এটা নেবেন না, এগুলো পরিকল্পনা করে তৈরি করা, টিকার মাধ্যমে শরীরে রোগের জীবাণু ঢুকিয়ে দিচ্ছে এমন বিভ্রান্তি ছড়ানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

এই অভিনেত্রী বলেন, অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার কুফল, টিকা ও গর্ভাবস্থায় নারীর পুষ্টির বিষয়ে মসজিদের খুতবায় আলোচনা হয় না। ওখানে আলাপ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরোধিতা করেছিলেন। অর্থাৎ, যে কোনো ভালো বিষয়ে না মসজিদ, আর না ওয়াজে আলোচনা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ কর্তা শিশুরাও (ছাত্র উপদেষ্টা) এটা নিয়ে কোনো কথা বলেন না। ওনারা ব্যস্ত কি যেন সনদ (জুলাই সনদ) নিয়ে। বর্তমান সরকার উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘরে চাপাচ্ছে না, তারা তারও আগের (আওয়ামী লীগ) সরকারের দোষ দিচ্ছে।

শাওন বলেন, টিকা কেনার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক গাফিলতি ছিল। আগের সরকারের টাকা বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও তারা ব্যয় করেনি। স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কাছে বারবার ফাইল গেলেও তিনি সময়মতো রাজি হননি, টিকা কেনাকে মাছের বাজার মনে করে থামিয়ে রাখেন। বলা হচ্ছে, মায়েদের পুষ্টির ঘাটতির কারণে এমন অবস্থা। কিন্তু অপুষ্টি তো নতুন কিছু নয়। এবারের হামের মৃত্যুর জন্য এগুলোর চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও তাদের নিয়োগকর্তারা দায়ী, তাই তাদের বিচার চাই আমি।

অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এতগুলো বাচ্চা আমাদের চলে গেল, অথচ কেউই দায় নিচ্ছে না। দায়টা কোথাও না কোথাও নিতে হবে। নাগরিক হিসেবে আমাদেরও। কারণ, সময়মতো আমরা সঠিক জায়গায় কথাগুলো বলিনি। এখন আমাদের দোষারোপের চেয়ে পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

নিজের গৃহকর্মীর শিশুর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আমার গৃহকর্মীর বাল্যবিয়ে হলেও তাকে প্রাপ্ত বয়স্কের আগে বাচ্চা নিতে নিষেধ করেছিলাম, সে করেছেও তাই। ২০ বছর বয়সে বাচ্চা নিয়েছে। কিন্তু সেই বাচ্চা দুই মাস বয়সে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এখন আমি তাকে কী বলে সান্ত্বনা দেব। এজন্য দোষারোপের চেয়ে বরং আত্মপলব্ধি থাকতে হবে। আক্রান্ত শিশুদের মায়ের দিকে আমরা তাকাতে পারি না।

সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, শুধু কী হামে মারা যাচ্ছে? প্রতিবছর পানিতে ডুবে বহু শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। কিন্তু এগুলো নিয়ে কী কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একটি ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) করা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। মায়েরা অপুষ্টির শিকার আমরা দেখছি, কিন্তু তাদের পুষ্টির বিষয়ে আমরা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর পাল্লায় পড়ে স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দ দিচ্ছি না আমরা। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের সব সেবাগুলো রাজস্ব খাতে আনা গেলে পুষ্টিসহ সব সেবার মান বাড়বে।

হামে শিশুদের মৃত্যুও এক ধরনের শিশু নির্যাতন বলে উল্লেখ করেন রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বলেন, হামে এতগুলো শিশু আক্রান্ত ও মারা যাচ্ছে, কিন্তু শিশুদের সুরক্ষায় নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।