প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা শরীরের কোন অঙ্গের বিকল হওয়ার লক্ষণ

সকালে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে গিয়ে হঠাৎ দেখলেন, প্রস্রাবের ওপর বেশ কিছু ফেনা জমেছে। একবার এমন হলে হয়তো বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায় না। কিন্তু কয়েক দিন ধরে একই ঘটনা ঘটতে থাকলে মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, শরীরে কি কোনো সমস্যা হচ্ছে?
প্রস্রাবে সামান্য বুদ্বুদ বা ফেনা সব সময় রোগের লক্ষণ নয়। দ্রুত গতিতে প্রস্রাব হলে, পানিশূন্যতা থাকলে বা অন্য কিছু সাময়িক কারণেও এমন হতে পারে। কিন্তু প্রস্রাবে নিয়মিত ও বেশি ফেনা দেখা গেলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ কখনো কখনো এর পেছনে প্রস্রাবে অতিরিক্ত প্রোটিন চলে আসার মতো সমস্যা থাকতে পারে, যা কিডনির কার্যকারিতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রস্রাবে ফেনা কেন হয়?
সুস্থ কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি ছেঁকে প্রস্রাব তৈরি করে। প্রয়োজনীয় প্রোটিন শরীরেই ধরে রাখে। কিন্তু কিডনির সূক্ষ্ম ছাঁকনি বা গ্লোমেরুলাস ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রোটিন প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যেতে পারে। এই অবস্থাকে বলা হয় প্রোটিনিউরিয়া বা প্রস্রাবে অতিরিক্ত প্রোটিন থাকা।
প্রস্রাবে প্রোটিনের পরিমাণ বেড়ে গেলে অনেকের প্রস্রাব ফেনাযুক্ত বা বুদ্বুদযুক্ত দেখাতে পারে। বিশেষ করে ফেনা যদি বারবার হয় এবং সহজে না কমে, তাহলে পরীক্ষা করানো জরুরি।
তবে মনে রাখতে হবে, ফেনা মানেই কিডনি রোগ নয়। দ্রুত গতিতে প্রস্রাব হওয়া, পানিশূন্যতা কিংবা কিছু সাময়িক শারীরিক অবস্থাতেও প্রস্রাবে বুদ্বুদ দেখা দিতে পারে।
কখন বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করবেন?
একবার প্রস্রাবে ফেনা দেখা গেলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং খেয়াল করুন, বিষয়টি নিয়মিত হচ্ছে কি না।
যদি প্রায়ই প্রস্রাবে বেশি ফেনা দেখা যায়, ফেনা দীর্ঘক্ষণ থেকে যায় অথবা এর সঙ্গে শরীরের অন্য কোনো পরিবর্তন দেখা দেয়, তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বিশেষ করে নিচের লক্ষণগুলো থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত-
- চোখের চারপাশে ফোলাভাব
- পা, গোড়ালি বা শরীরের অন্য অংশ ফুলে যাওয়া
- প্রস্রাবের পরিমাণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন
- প্রস্রাবের সময় ব্যথা বা জ্বালাপোড়া
- প্রস্রাবে রক্ত
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
- শ্বাসকষ্ট
- উচ্চ রক্তচাপ
এসব লক্ষণ সব সময় কিডনি রোগের কারণে হয় না। তবে প্রস্রাবে ফেনার সঙ্গে এগুলো থাকলে পরীক্ষা করানো জরুরি।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্ক কী?
দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস কিডনির ক্ষতি করতে পারে। একইভাবে দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালির ওপর চাপ পড়ে এবং কিডনির ছাঁকনির কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে প্রস্রাবে প্রোটিন চলে আসতে পারে।
তাই যাঁদের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাঁদের নিয়মিত কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু শরীরে কোনো ব্যথা হচ্ছে কি না, তার ওপর নির্ভর করে কিডনি ভালো আছে কি না বোঝা যায় না। কিডনি রোগের শুরুতে অনেক সময় স্পষ্ট কোনো উপসর্গও থাকে না।
আরও যেসব কারণে প্রস্রাবে প্রোটিন আসতে পারে
কিডনি রোগ ছাড়াও কিছু সাময়িক অবস্থায় প্রস্রাবে প্রোটিনের পরিমাণ বাড়তে পারে। যেমন-
- শরীরে পানির ঘাটতি
- জ্বর
- অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম
- তীব্র মানসিক চাপ
- কিছু সংক্রমণ
- কিছু ওষুধের প্রভাব
তাই একটি পরীক্ষায় প্রস্রাবে প্রোটিন পাওয়া গেলেই কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়। অনেক সময় চিকিৎসক আবার পরীক্ষা করে দেখেন প্রোটিনের উপস্থিতি স্থায়ী কি না।
কী পরীক্ষা করা হয়?
প্রস্রাবে নিয়মিত ফেনা দেখা গেলে চিকিৎসক প্রথমে সাধারণ প্রস্রাব পরীক্ষা করতে বলতে পারেন। এতে প্রস্রাবে প্রোটিন, রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা এবং অন্যান্য উপাদান আছে কি না দেখা যায়।
প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের পরিমাণ বোঝার জন্য অ্যালবুমিন-ক্রিয়েটিনিন অনুপাত পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজন হলে ২৪ ঘণ্টার প্রস্রাব সংগ্রহ করে মোট কতটা প্রোটিন বের হচ্ছে, সেটিও পরীক্ষা করা যেতে পারে।
প্রয়োজনে চিকিৎসক রক্তে ক্রিয়েটিনিন, কিডনির ছাঁকার ক্ষমতা এবং অন্যান্য পরীক্ষাও করতে পারেন। কিডনির সমস্যা আছে কি না এবং থাকলে তার কারণ কী, তা বুঝতে এসব পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু বেশি পানি খেলেই কি ফেনা বন্ধ হবে?
পানি কম খেলে প্রস্রাব ঘন হতে পারে এবং এর চেহারায় পরিবর্তন আসতে পারে। তাই পর্যাপ্ত পানি পান করা অবশ্যই জরুরি।
কিন্তু যদি প্রস্রাবে সত্যিই অতিরিক্ত প্রোটিন বের হতে থাকে, শুধু বেশি পানি পান করলেই সমস্যার চিকিৎসা হবে না। কারণ তখন প্রোটিন কেন প্রস্রাবে যাচ্ছে, সেটি খুঁজে বের করতে হবে।
তাই নিয়মিত ফেনাযুক্ত প্রস্রাব হলে নিজের মতো করে শুধু পানি খেয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
খাবারের দিকে কীভাবে নজর দেবেন?
কিডনির সমস্যা থাকলে খাবারের ধরন রোগের কারণ ও মাত্রার ওপর নির্ভর করে। সবার জন্য একই খাদ্যতালিকা প্রযোজ্য নয়।
সাধারণভাবে অতিরিক্ত লবণ খাওয়া কমানো উপকারী। বেশি লবণ শরীরে পানি ধরে রাখতে পারে এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে প্রস্রাবের সঙ্গে প্রোটিন যাচ্ছে বলে নিজের ইচ্ছায় একেবারে প্রোটিন বন্ধ করে দেওয়াও ঠিক নয়। কতটা প্রোটিন প্রয়োজন, তা কিডনির অবস্থা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে। এ বিষয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
ফেনা দেখলেই কিডনি নষ্ট হচ্ছে ভাববেন না
প্রস্রাবে ফেনা দেখা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি একটি লক্ষণ, নিজে কোনো রোগের নাম নয়।
কখনো এটি সম্পূর্ণ সাময়িক হতে পারে। আবার নিয়মিত ফেনাযুক্ত প্রস্রাব কিডনির সমস্যার প্রাথমিক সংকেতও হতে পারে। তাই ভয় পাওয়ারও প্রয়োজন নেই, আবার অবহেলা করাও ঠিক নয়।
বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা আগে থেকেই কিডনির সমস্যা থাকলে নিয়মিত পরীক্ষা করানো আরও গুরুত্বপূর্ণ।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি প্রস্রাবে বারবার ফেনা দেখা যায় এবং এর সঙ্গে শরীর ফুলে যায়, প্রস্রাবে রক্ত আসে, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়, শ্বাসকষ্ট হয় বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কারণ কিডনির সমস্যা শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব। প্রস্রাবে প্রোটিন থাকলে চিকিৎসা সাধারণত শুধু ফেনা কমানোর জন্য নয়, বরং যে কারণে প্রোটিন বের হচ্ছে সেটি নিয়ন্ত্রণ করার দিকে দেওয়া হয়।
বাথরুমে প্রস্রাবের ওপর ফেনা দেখলে প্রথমেই ভয় পাওয়ার দরকার নেই। একবার বা মাঝে মাঝে সামান্য বুদ্বুদ দেখা স্বাভাবিকও হতে পারে। কিন্তু প্রায়ই বেশি ফেনা হওয়া বা ফেনা দীর্ঘক্ষণ থেকে যাওয়া শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে।
এর পেছনে প্রস্রাবে অতিরিক্ত প্রোটিন থাকা, কিডনির সমস্যা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। আবার পানিশূন্যতা বা অতিরিক্ত ব্যায়ামের মতো সাময়িক কারণেও প্রোটিন সাময়িকভাবে বাড়তে পারে।
তাই শুধু প্রস্রাবের চেহারা দেখে রোগ নির্ণয় করার চেষ্টা না করে প্রয়োজন হলে সাধারণ প্রস্রাব পরীক্ষা করান। বিশেষ করে নিয়মিত ফেনা দেখা গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কিডনির সমস্যা শুরুতেই ধরা পড়লে তা নিয়ন্ত্রণের সুযোগও বেশি থাকে।
সূত্র: এই সময়



