ব্রেন স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে দৈনন্দিন ৫ অভ্যাস, সতর্ক হোন এখনই

ব্রেন স্ট্রোক এমন একটি গুরুতর শারীরিক সমস্যা, যা অল্প সময়ের মধ্যেই মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতি করতে পারে। মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে অথবা কোনো রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হয়। এর ফলে কথা বলতে সমস্যা, শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়লেও শুধু বয়স্কদেরই এই সমস্যা হয়, এমন ধারণা ঠিক নয়। উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং ডায়াবেটিসের মতো বিষয় স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এর মধ্যে কিছু ঝুঁকির কারণ আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাসের সঙ্গে জড়িত।
তাই জীবনযাপনের কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন আনা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে যে ৫ অভ্যাস
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, শরীরচর্চা না করা
অনেকেই দিনের বেশির ভাগ সময় অফিসে, বাড়িতে বা মোবাইলের সামনে বসে কাটান। নিয়মিত হাঁটাচলা বা শরীরচর্চা না করলে ওজন বেড়ে যেতে পারে। এর পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরলের সমস্যা তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। এসব সমস্যা স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ।
তাই প্রতিদিনের রুটিনে হাঁটাহাঁটি বা শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তুলুন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক পরিশ্রম করা উচিত। দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করলে মাঝেমধ্যে বিরতি নিয়ে একটু হাঁটুন।
অতিরিক্ত লবণ ও অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া
নিয়মিত ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং বেশি লবণযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত লবণ উচ্চ রক্তচাপ বাড়াতে পারে, যা স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ।
খাবারের তালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল, গোটা শস্য ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিন রাখুন। রান্নায় লবণের পরিমাণ কমান। প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় লবণ বা সোডিয়ামের পরিমাণও দেখে নিতে পারেন।
ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপানের অভ্যাস
ধূমপান শুধু ফুসফুসের ক্ষতি করে না, রক্তনালির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি স্ট্রোকসহ বিভিন্ন হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে অতিরিক্ত মদ্যপান উচ্চ রক্তচাপসহ নানা স্বাস্থ্যসমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই ধূমপান এড়িয়ে চলুন এবং ধূমপান করলে তা ছাড়ার জন্য চিকিৎসকের সহায়তা নিতে পারেন। মদ্যপানও এড়িয়ে চলা ভালো।
উচ্চ রক্তচাপকে অবহেলা করা
উচ্চ রক্তচাপকে অনেক সময় নীরব স্বাস্থ্যসমস্যা বলা হয়। কারণ, অনেকের ক্ষেত্রে রক্তচাপ বেড়ে গেলেও স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। কিন্তু দীর্ঘদিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মস্তিষ্কের রক্তনালির ক্ষতি হতে পারে। এতে রক্তনালি বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন। রক্তচাপ বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন এবং জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনুন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রক্তচাপের ওষুধ বন্ধ করবেন না।
ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে না রাখা
রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন বেশি থাকলে রক্তনালির ক্ষতি হতে পারে। একইভাবে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল বেশি থাকলে রক্তনালির ভেতরে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এসব সমস্যা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
ডায়াবেটিস বা উচ্চ কোলেস্টেরল থাকলে নিয়মিত পরীক্ষা করান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিন। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের মাধ্যমে এসব সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
স্ট্রোকের লক্ষণ চিনবেন যেভাবে
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। নিচের লক্ষণগুলো হঠাৎ দেখা দিলে সতর্ক হোন-
- মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া।
- শরীরের এক পাশের হাত বা পা দুর্বল হয়ে যাওয়া কিংবা অবশ লাগা।
- কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়া।
- হঠাৎ চোখে ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া।
- হঠাৎ ভারসাম্য হারানো বা হাঁটতে সমস্যা হওয়া।
- কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা শুরু হওয়া।
এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা করবেন না। অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিন। লক্ষণ কয়েক মিনিটের মধ্যে সেরে গেলেও চিকিৎসা প্রয়োজন। উপসর্গ কখন শুরু হয়েছে, সেই সময়টি মনে রাখুন এবং চিকিৎসককে জানান।
স্ট্রোকের সব ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বয়স, বংশগত বিষয় ও কিছু শারীরিক অবস্থার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে ধূমপান এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা করা এবং রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
তাই অসুস্থ হওয়ার অপেক্ষা না করে এখন থেকেই দৈনন্দিন অভ্যাসের দিকে নজর দিন। আর স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে ঘরোয়া চিকিৎসা না করে দ্রুত হাসপাতালে যান।
তথ্যসূত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা: স্ট্রোকের কারণ, ঝুঁকি ও প্রতিরোধ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা: হৃদ্রোগ ও রক্তনালির রোগ
