রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভাঙে, যে রোগগুলোর লক্ষণ হতে পারে

রাতের ঘুম বারবার ভেঙে যাচ্ছে। ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যেতে হচ্ছে। একবার গিয়ে আবার বিছানায় ফেরার কিছুক্ষণ পরই আবার প্রস্রাবের চাপ। এমন হলে শুধু ঘুমের ব্যাঘাতই নয়, দিনের বেলাতেও ক্লান্তি, ঝিমুনি ও কাজে মনোযোগের সমস্যা হতে পারে।
রাতে ঘুম ভেঙে প্রস্রাব করার এই সমস্যাকে বলা হয় নকচুরিয়া। বয়স বাড়ার সঙ্গে এটি বেশি দেখা গেলেও শুধু বয়সের কারণে এমন হয় না। সন্ধ্যার পর বেশি পানি পান, চা-কফি বা অ্যালকোহল পান, কিছু ওষুধ, ডায়াবেটিস, মূত্রনালির সংক্রমণ, অতিসক্রিয় মূত্রথলি, কিডনির সমস্যা কিংবা পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট বড় হয়ে যাওয়ার মতো নানা কারণ থাকতে পারে।
তাই প্রতিদিন রাতে বারবার ঘুম ভেঙে গেলে বিষয়টিকে শুধু বেশি পানি খাওয়ার সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
নকচুরিয়া আসলে কী?
ঘুমের মধ্যে প্রস্রাবের প্রয়োজন হওয়ায় বারবার জেগে ওঠাকে নকচুরিয়া বলা হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে এই সমস্যা বাড়তে পারে। রাতে একবার প্রস্রাব করার প্রয়োজন অনেকেরই হতে পারে এবং সেটি সবসময় অস্বাভাবিক নয়। তবে নিয়মিতভাবে একাধিকবার ঘুম ভেঙে গেলে কারণটি খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
এখানে শুধু কতবার প্রস্রাব হচ্ছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কতটা প্রস্রাব হচ্ছে, দিনে কতবার প্রস্রাব হচ্ছে, প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথা হচ্ছে কি না এবং অতিরিক্ত তৃষ্ণা বা পা ফুলে যাওয়ার মতো অন্য কোনো লক্ষণ আছে কি না, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুমের আগে বেশি পানি পান করছেন?
নকচুরিয়ার সবচেয়ে সহজ কারণগুলোর একটি হতে পারে ঘুমানোর কাছাকাছি সময়ে বেশি তরল পান করা। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বেশি পানি, চা, কফি বা অন্য পানীয় পান করলে রাতে প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। ক্যাফেইন মূত্রথলির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে একসঙ্গে অনেক পানি পান না করে দিনের বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান করা ভালো। তবে পানি কমানোর নামে সারাদিন পর্যাপ্ত পানি না খাওয়াও ঠিক নয়।
ডায়াবেটিসের সংকেত হতে পারে
রাতে বারবার প্রস্রাব হওয়ার সঙ্গে অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রবণতা থাকলে রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা দরকার হতে পারে।
রক্তে শর্করা বেশি হলে শরীর অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা করে। এর সঙ্গে বেশি পানি বেরিয়ে যেতে পারে এবং তৃষ্ণাও বাড়তে পারে। ফলে দিনে ও রাতে বারবার প্রস্রাবের প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষ করে অকারণে ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্ষুধা বা তৃষ্ণা এবং সবসময় দুর্বল লাগার মতো লক্ষণও থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রোস্টেটের সমস্যা
বয়স বাড়ার সঙ্গে পুরুষদের প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে যেতে পারে। একে বেনাইন প্রোস্টেটিক হাইপারপ্লাসিয়া বা বিএইচপি বলা হয়। প্রোস্টেট বড় হলে মূত্রনালিতে চাপ পড়তে পারে এবং মূত্রথলি পুরোপুরি খালি হতে সমস্যা হতে পারে। ফলে বারবার প্রস্রাবের চাপ তৈরি হতে পারে এবং রাতে ঘুম ভেঙে বাথরুমে যেতে হতে পারে।
রাতে প্রস্রাবের পাশাপাশি যদি প্রস্রাব শুরু হতে সময় লাগে, প্রস্রাবের ধারা দুর্বল বা থেমে থেমে আসে, প্রস্রাব শেষে ফোঁটা ফোঁটা ঝরে বা মূত্রথলি পুরোপুরি খালি হয়নি বলে মনে হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
মূত্রনালির সংক্রমণও কারণ হতে পারে
মূত্রনালির সংক্রমণ বা ইউটিআই হলে বারবার প্রস্রাবের চাপ তৈরি হতে পারে, এমনকি মূত্রথলিতে খুব বেশি প্রস্রাব জমা না থাকলেও।
এর সঙ্গে প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথা, তলপেটে অস্বস্তি, প্রস্রাব ঘোলা বা দুর্গন্ধযুক্ত হওয়া কিংবা প্রস্রাবে রক্ত দেখা যেতে পারে।
জ্বর, কাঁপুনি, বমি বা পিঠ ও কোমরের পাশে ব্যথা থাকলে সংক্রমণ কিডনিতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কিডনির সমস্যার সঙ্গেও সম্পর্ক থাকতে পারে
কিডনি শরীরের অতিরিক্ত পানি ও বর্জ্য প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে। কিডনির কার্যকারিতায় সমস্যা হলে প্রস্রাবের ধরনে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। রাতে বারবার প্রস্রাব করার সমস্যার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগেরও সম্পর্ক থাকতে পারে।
তবে রাতে প্রস্রাব বেশি হলেই কিডনির রোগ হয়েছে, এমনটা বলা যাবে না। একই উপসর্গের পেছনে আরও অনেক সাধারণ কারণ থাকতে পারে।
যদি এর সঙ্গে পা বা গোড়ালি ফুলে যাওয়া, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, প্রস্রাবে রক্ত বা ফেনা, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা অন্য কোনো কিডনি-সংক্রান্ত সমস্যা থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
অতিসক্রিয় মূত্রথলিও হতে পারে কারণ
কিছু মানুষের মূত্রথলি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সক্রিয় হয়ে যায়। তখন হঠাৎ তীব্র প্রস্রাবের চাপ আসে এবং বারবার বাথরুমে যেতে হয়। কখনো প্রস্রাব ধরে রাখাও কঠিন হতে পারে। এই সমস্যার নাম ওভারঅ্যাকটিভ ব্লাডার। নকচুরিয়াও এর একটি উপসর্গ হতে পারে।
দিনের বেলাতেও যদি ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ আসে, হঠাৎ খুব জোরে প্রস্রাবের বেগ হয় বা প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারেন, তাহলে বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো উচিত।
হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার সঙ্গেও সম্পর্ক আছে
শরীরে অতিরিক্ত তরল জমে গেলে রাতের প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়তে পারে। হৃদ্যন্ত্রের কিছু সমস্যায় দিনের বেলায় পা ও গোড়ালিতে তরল জমে থাকতে পারে। রাতে শুয়ে পড়লে সেই তরল রক্তপ্রবাহে ফিরে আসে এবং কিডনি তা প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। ফলে রাতে প্রস্রাবের প্রয়োজন বাড়তে পারে।
যদি রাতে বারবার প্রস্রাবের পাশাপাশি পা ফুলে যায়, হাঁটলে বা শুয়ে থাকলে শ্বাসকষ্ট হয় কিংবা অস্বাভাবিক ক্লান্তি থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কিছু ওষুধেও বাড়তে পারে প্রস্রাব
কিছু ওষুধ প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে শরীরের অতিরিক্ত পানি বের করার জন্য ব্যবহৃত মূত্রবর্ধক ওষুধের কারণে প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়া স্বাভাবিক। কিছু ওষুধের সময় পরিবর্তন করলে রাতে বাথরুমে ওঠার সমস্যা কমতে পারে, তবে তা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া করা উচিত নয়।
আপনি নিয়মিত কোনো ওষুধ খেলে রাতে বারবার প্রস্রাব শুরু হওয়ার পর সেটি চিকিৎসককে জানানো ভালো।
বয়স বাড়লে কেন সমস্যা বাড়ে?
বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরে রাতে প্রস্রাব কমানোর জন্য কাজ করা অ্যান্টিডাইইউরেটিক হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন হতে পারে। ফলে রাতে কিডনি বেশি প্রস্রাব তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বয়সের সঙ্গে মূত্রথলি, প্রোস্টেট ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যার ঝুঁকিও বাড়ে।
তবে বয়স হয়েছে বলে প্রতিদিন রাতে বারবার বাথরুমে যাওয়া স্বাভাবিক ধরে নেওয়া উচিত নয়। ঘুমে নিয়মিত ব্যাঘাত ঘটলে কারণ খুঁজে দেখা দরকার।
কীভাবে রাতে প্রস্রাবের সমস্যা কমাবেন?
কিছু সাধারণ অভ্যাস পরিবর্তন করে সমস্যা কমানো সম্ভব হতে পারে। যেমন-
- ঘুমানোর ঠিক আগে একসঙ্গে অনেক পানি পান করবেন না।
- দিনের বেলায় পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
- বিকেল বা সন্ধ্যার পর চা, কফি ও অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় কমিয়ে দেখুন।
- রাতে অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন।
- ঘুমানোর আগে মূত্রথলি খালি করে নিন।
- পা ও গোড়ালি ফুলে থাকলে দিনের বেলায় কিছু সময় পা উঁচু করে বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে।
- নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার চেষ্টা করুন।
- কোনো ওষুধ খাওয়ার পর সমস্যা বেড়ে গেলে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসককে জানান।
তবে পানি একেবারে কমিয়ে দেওয়া উচিত নয়। শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
রাতে মাঝে মাঝে একবার প্রস্রাবের জন্য উঠতেই পারেন। কিন্তু নিয়মিতভাবে রাতে একাধিকবার ঘুম ভাঙলে এবং এতে ঘুম বা দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা ভালো।
বিশেষ করে নিচের লক্ষণগুলো থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন-
- প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথা
- প্রস্রাবে রক্ত
- প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হয়ে যাওয়া
- প্রস্রাব শুরু করতে সমস্যা
- মূত্রথলি পুরোপুরি খালি না হওয়ার অনুভূতি
- অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও ঘন ঘন প্রস্রাব
- পা বা গোড়ালি ফুলে যাওয়া
- জ্বর, কাঁপুনি বা পিঠে ব্যথা
- প্রস্রাব একেবারেই না হওয়া
- রাতে বারবার প্রস্রাবের কারণে নিয়মিত ঘুম নষ্ট হওয়া
প্রয়োজনে চিকিৎসক প্রস্রাব পরীক্ষা, রক্তে শর্করা, কিডনির কার্যকারিতা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্য পরীক্ষা করতে পারেন।
রাতে একবার প্রস্রাব হওয়া অনেকের জন্য স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু প্রতিরাতে বারবার ঘুম ভেঙে গেলে সেটিকে শুধু বয়স বা বেশি পানি খাওয়ার সমস্যা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ এর পেছনে ডায়াবেটিস, মূত্রনালির সংক্রমণ, মূত্রথলির সমস্যা, প্রোস্টেটের সমস্যা, কিডনি বা হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার মতো কারণও থাকতে পারে। শরীরের এই পরিবর্তন নিয়মিত হলে কারণটি জানা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
সূত্র: এই সময় অনলাইন



