স্ন্যাকস কি আসলেই ভালো ঘুমে সাহায্য করে

ঘুমের সমস্যা এখন বিশ্বজুড়ে অনেক মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা। ব্যস্ত জীবন, কাজের চাপ, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার এবং অনিয়মিত জীবনযাপন অনেকের ঘুমের মান কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে অনেকে দ্রুত সমাধান খুঁজতে নানা ধরনের সাপ্লিমেন্ট বা খাবারের দিকে ঝুঁকছেন, যেগুলো ভালো ঘুমে সহায়ক বলে দাবি করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে নতুন ধরনের কিছু পণ্য জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, যেগুলোকে বলা হচ্ছে স্লিপ এনহ্যান্সিং স্ন্যাকস। অর্থাৎ এমন খাবার যা খাওয়ার পর শরীর শান্ত হয় এবং ঘুম সহজে আসে বলে দাবি করা হয়। চকোলেট, গামি, বার বা পানীয়ের মতো এই পণ্যগুলো স্বাস্থ্য সাপ্লিমেন্ট এবং সাধারণ খাবারের মাঝামাঝি একটি নতুন শ্রেণি তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ ধরনের একটি আলোচিত পণ্য হলো অ্যালিস মাশরুমস নামের একটি ব্র্যান্ডের তৈরি বিশেষ চকোলেট। তিন বছর আগে বাজারে আসার পর থেকেই এটি ক্রেতাদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের নাইটক্যাপ নামের চকোলেটটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় দুই হাজার দোকানে বিক্রি হচ্ছে। এই চকোলেটের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে রেইশি মাশরুম, ক্যামোমাইল, ম্যাগনেসিয়াম, জিঙ্ক এবং এল থিয়ানিন, যেগুলো শরীরকে শান্ত করতে এবং ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন বাড়াতে সহায়ক বলে বলা হয়।
এই পণ্যটি তৈরি করেছেন প্রতিষ্ঠানের সহপ্রতিষ্ঠাতা শার্লট ক্রুজ এবং লিন্ডসে গুডস্টেইন। তাদের মতে, ঘুমের সমস্যার কারণ অনেক ধরনের হতে পারে। তাই তারা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক, গবেষক এবং পণ্য উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে এই ফর্মুলা তৈরি করেছেন, যাতে ঘুমের বিভিন্ন ধাপে সম্ভাব্য সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা যায়।
বর্তমানে ভালো ঘুমের প্রতিশ্রুতি দেয় এমন পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। একটি জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি দুই জনের প্রায় একজন কোনো না কোনো ধরনের ঘুমের সহায়ক ব্যবহার করেন। এর মধ্যে মেলাটোনিনের মতো প্রাকৃতিক সাপ্লিমেন্ট সবচেয়ে জনপ্রিয়। যুক্তরাজ্যেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যদিও সেখানে এখনও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে প্রাকৃতিক সমাধান খোঁজার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।
বিশ্বজুড়ে ঘুমের মান নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। একটি আন্তর্জাতিক ঘুম বিষয়ক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য উভয় দেশই ভালো ঘুমের মানের দিক থেকে নিচের দিকের দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে চকোলেট বা স্ন্যাকসের মাধ্যমে ঘুমের সহায়তা পাওয়ার ধারণা অনেকের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। কারণ অনেকের কাছে একটি চকোলেট খাওয়া একটি পুরস্কারের মতো অনুভূত হয়, যেখানে একটি ক্যাপসুল খাওয়া চিকিৎসার মতো মনে হয়।
ফলে এই ধরনের স্লিপ ট্রিট পণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। বিভিন্ন কোম্পানি এখন এল থিয়ানিন, মেলাটোনিন, ম্যাগনেসিয়াম বা ক্যামোমাইলের মতো উপাদান দিয়ে তৈরি চকোলেট বা স্ন্যাকস বাজারে আনছে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এসব পণ্যের পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কতটা শক্ত।
গবেষণায় দেখা গেছে, মেলাটোনিন ও ম্যাগনেসিয়ামের ঘুমের ওপর কিছু ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। তবে ক্যামোমাইলের ক্ষেত্রে ঘুমের উপকারিতা অনেক সময় স্বল্পমেয়াদি বা প্লাসিবো প্রভাবের মতো হতে পারে। অর্থাৎ মানুষ বিশ্বাস করে বলে কিছুটা উপকার অনুভব করতে পারে।
রেইশি মাশরুম হাজার বছর ধরে এশিয়ার বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ঔষধি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এ নিয়ে আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনও সীমিত এবং ছোট আকারের।
অন্যদিকে এল থিয়ানিন নিয়ে গবেষণা এখনও চলমান। এটি গ্রিন টি বা সবুজ চায়ে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় এবং শরীরকে কিছুটা শান্ত করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে গবেষণায় ব্যবহৃত মাত্রা সাধারণ খাবারে থাকা পরিমাণের চেয়ে বেশি হওয়ায় বাস্তব খাবারে এর প্রভাব কতটা কার্যকর তা স্পষ্ট নয়।
গবেষকরা আরও একটি বিষয় নিয়ে সতর্ক করছেন। এখন অনেক খাবারেই ঘুম বাড়ানোর উপাদান যোগ করা হচ্ছে। ফলে একজন ব্যক্তি যদি একাধিক পণ্য একসঙ্গে খান, তাহলে একই উপাদান শরীরে অতিরিক্ত পরিমাণে প্রবেশ করতে পারে। এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে এখনও পর্যাপ্ত গবেষণা নেই।
ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পণ্যের কার্যকারিতা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। কারণ প্রতিটি উপাদান শরীরে কাজ করতে ভিন্ন সময় নেয় এবং খাবারের অন্য উপাদান যেমন চিনি, ফ্যাট বা প্রোটিনের সঙ্গে মিশে গেলে তার প্রভাব বদলাতেও পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক সময় মানুষ ঘুমের প্রকৃত সমস্যাটি খুঁজে বের করার পরিবর্তে সহজ সমাধানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু বাস্তবে দেরি করে মোবাইল ব্যবহার করা, অনিয়মিত ঘুমের সময়, মানসিক চাপ বা অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণই ঘুমের সমস্যার মূল কারণ হতে পারে।
এমনকি এই পণ্য তৈরির উদ্যোক্তারাও স্বীকার করেন, জীবনযাত্রা ঠিক না করলে কোনো খাবারই ভালো ঘুম নিশ্চিত করতে পারে না। রাত জেগে ফোন ব্যবহার করলে বা ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় সামাজিক মাধ্যমে কাটালে ঘুমের সমস্যা থেকেই যাবে।
ঘুমের উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তৈরি স্ন্যাকস বা চকোলেট এখন নতুন এক বাজার তৈরি করেছে। কিছু উপাদানের সীমিত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকলেও এসব পণ্যকে এখনই নিশ্চিত সমাধান বলা যায় না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভালো ঘুমের জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখা, রাতের স্ক্রিন ব্যবহার কমানো, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণ করা। খাবারভিত্তিক স্লিপ সাপোর্ট পণ্যগুলো হয়তো সহায়ক হতে পারে, তবে এগুলোকে ঘুমের সমস্যার একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়।
সূত্র : বিবিসি