ক্যানসার ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে এই মাছ

মাছ বাঙালির খাবারের অন্যতম পরিচিত অংশ। ভাতের সঙ্গে এক টুকরো মাছ যেমন স্বাদ বাড়ায়, তেমনি মাছ শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও নানা পুষ্টি উপাদানেরও ভালো উৎস। তবে সব মাছের পুষ্টিগুণ এক নয়। কিছু মাছে এমন কিছু উপাদান থাকে, যা হৃদ্যন্ত্র, মস্তিষ্ক ও হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এমনই একটি মাছ হলো সার্ডিন। ছোট আকারের এই মাছটি দেখতে সাধারণ হলেও পুষ্টিগুণের দিক থেকে বেশ সমৃদ্ধ। এতে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান পাওয়া যায়। এ কারণেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় সার্ডিনকে রাখা যেতে পারে।
তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার। সার্ডিন খেলে ক্যানসার, হৃদ্রোগ বা স্ট্রোক হবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং পুষ্টিকর মাছ হিসেবে এটি সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে এবং কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সার্ডিনে কেন এত পুষ্টি?
সার্ডিনে রয়েছে উচ্চমানের প্রোটিন এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড। এ ছাড়া এতে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়।
বিশেষ করে ছোট মাছের কিছু অংশ, যেমন কাঁটা ও হাড় নরম অবস্থায় খাওয়া গেলে ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ পাওয়ার সুযোগ থাকে। তবে কাঁটা গিলে খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়, কারণ এতে গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
হৃদ্যন্ত্রের জন্য উপকারী হতে পারে
সার্ডিনে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের কারণে এই মাছ হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী খাবারের তালিকায় জায়গা পেতে পারে।
মাছ খাওয়ার সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। ওমেগা-৩ শরীরের ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমাতে এবং হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মাছ খেলেই হৃদ্রোগ বা হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ হবে, এমন দাবি করা ঠিক নয়।
বরং মাছকে সবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর খাবারের সঙ্গে মিলিয়ে খাওয়াই ভালো।
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়?
মাছের ওমেগা-৩ নিয়ে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর বিষয়েও গবেষণা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো এমন শক্ত প্রমাণ নেই যে শুধু ওমেগা-৩ বা মাছ খাওয়াকে স্ট্রোক প্রতিরোধের নিশ্চয়তামূলক উপায় বলা যায়।
তাই সার্ডিনকে স্ট্রোক প্রতিরোধের ওষুধ হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের একটি অংশ হিসেবে দেখা উচিত।
হাড়ের জন্যও ভালো
সার্ডিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এতে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। হাড় ও দাঁতের স্বাভাবিক গঠন ও শক্তি ধরে রাখতে ক্যালসিয়াম প্রয়োজন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজের পর হাড়ের দুর্বলতার ঝুঁকি বাড়ে। তাই খাদ্যতালিকায় ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
সার্ডিনের মতো ছোট মাছ নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে খেলে খাদ্য থেকে ক্যালসিয়াম পাওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হয়।
তবে শুধু মাছ খেলেই হাড়ের সব পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে না। ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি, প্রোটিন এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমও প্রয়োজন।
প্রোটিনের ভালো উৎস
শরীরের পেশি তৈরি ও মেরামত, হরমোন ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তৈরিতে প্রোটিন প্রয়োজন।
সার্ডিনে ভালো পরিমাণে প্রোটিন থাকে। তাই যারা ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চান, তাঁদের খাদ্যতালিকায় মাছের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা উপকারী হতে পারে।
তবে ওজন কমানোর ক্ষেত্রে শুধু একটি মাছের ওপর নির্ভর না করে মোট ক্যালরি গ্রহণ, খাবারের পরিমাণ, শারীরিক পরিশ্রম এবং ঘুমের দিকেও নজর দিতে হবে।
ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে পারে?
সার্ডিন নিয়ে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দাবিগুলোর একটি হলো ক্যানসারের ঝুঁকি কমানো। কিন্তু এখানে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
মাছে থাকা ওমেগা-৩সহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে সার্ডিন খেলে ক্যানসার প্রতিরোধ করা যায়, এমন সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো প্রমাণ নেই।
ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে ধূমপান না করা, স্বাস্থ্যকর ওজন ধরে রাখা, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত মাংস কম খাওয়া এবং শাকসবজি ও ফলসহ বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই সার্ডিনকে ক্যানসার প্রতিরোধের খাবার না বলে স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার একটি ভালো মাছ হিসেবে দেখা উচিত।
মস্তিষ্কের জন্যও ওমেগা-৩ গুরুত্বপূর্ণ
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড শুধু হৃদ্যন্ত্রের জন্য নয়, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
মাছ ও মাছের তেলে থাকা ওমেগা-৩ নিয়ে বয়স বাড়ার সঙ্গে স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে ওমেগা-৩ খেলেই স্মৃতিশক্তি বাড়বে বা ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
তাই নিয়মিত মাছ খাওয়াকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের একটি অংশ হিসেবে দেখা ভালো।
সার্ডিনের পাশাপাশি আর কোন মাছ?
শুধু সার্ডিনই ওমেগা-৩-এর উৎস নয়। সামুদ্রিক মাছের মধ্যে স্যামন ও ম্যাকেরেলেও ওমেগা-৩ পাওয়া যায়।
তবে বাংলাদেশে সব মাছ সারা বছর বা একই দামে পাওয়া যায় না। তাই দামি সামুদ্রিক মাছ না পেলেও স্থানীয়ভাবে পাওয়া পুষ্টিকর মাছ খাদ্যতালিকায় রাখা যায়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন ছোট মাছেও প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। ফলে স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই শুধু বিদেশি বা দামি মাছ খেতে হবে, এমন নয়।
মাছ রান্নার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ
মাছ কতটা স্বাস্থ্যকর হবে, তা শুধু মাছের জাতের ওপর নির্ভর করে না। রান্নার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ।
সার্ডিন বা অন্য কোনো মাছ অতিরিক্ত তেলে ভাজা হলে খাবারে ক্যালরির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত লবণও ভালো নয়।
তাই মাছ ঝোল, পাতলা ঝোল, ভাপানো বা অল্প তেলে রান্না করে খাওয়া যেতে পারে। সঙ্গে বেশি করে সবজি রাখলে খাবারটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হয়।
মাছ খেলে কি সবার উপকার হবে?
সাধারণভাবে মাছ স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে ব্যক্তিভেদে খাদ্যাভ্যাসের প্রয়োজন আলাদা।
কারও মাছের প্রতি অ্যালার্জি থাকতে পারে। আবার কিছু মানুষের কিডনি, লিভার বা অন্য স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকলে খাবারের পরিমাণ ও ধরন নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে।
গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রেও মাছ বাছাইয়ের সময় দূষণকারী পদার্থ, বিশেষ করে পারদ বেশি থাকা মাছ এড়িয়ে চলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
মাছ খাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় কী?
একটি খাবারকে আলাদা করে বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন ভাবার বদলে পুরো খাদ্যতালিকার দিকে তাকানো উচিত।
একটি স্বাস্থ্যকর খাবারের তালিকায় থাকতে পারে-
- মাছ বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিন
- বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি
- মৌসুমি ফল
- ডাল ও শিমজাতীয় খাবার
- পূর্ণ শস্য
- বাদাম ও বীজ
- পরিমিত স্বাস্থ্যকর তেল
এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত হাঁটা বা শারীরিক পরিশ্রম এবং পর্যাপ্ত ঘুমও জরুরি।
সার্ডিন কি প্রতিদিন খেতে হবে?
না। কোনো একটি খাবার প্রতিদিন খেতেই হবে এমন নিয়ম নেই।
বরং বিভিন্ন ধরনের মাছ পালা করে খাওয়া ভালো। এতে বিভিন্ন মাছের বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়ার সুযোগ থাকে এবং খাবারে বৈচিত্র্যও আসে।
মাছ খাওয়ার ক্ষেত্রে পরিমাণের পাশাপাশি মাছটি কোথা থেকে এসেছে, কতটা তাজা এবং কীভাবে রান্না করা হয়েছে, সেদিকেও খেয়াল রাখা উচিত।
ছোট দেখতে সার্ডিন পুষ্টিগুণে বেশ সমৃদ্ধ একটি মাছ। এতে প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। এসব পুষ্টি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম, হৃদ্যন্ত্র, হাড় ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সার্ডিনকে কোনো রোগের ওষুধ বা ক্যানসার প্রতিরোধের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং মাছ, শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্যসহ বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়াই সুস্থ থাকার বেশি কার্যকর পথ।
বাজারে গেলে তাই শুধু দামি মাছ খোঁজার দরকার নেই। সাধারণ, সহজলভ্য ও পুষ্টিকর মাছও প্রতিদিনের খাবারে ভালো জায়গা করে নিতে পারে। সার্ডিন পাওয়া গেলে সেটিও হতে পারে সেই তালিকার একটি ভালো পছন্দ।
সূত্র: নিউজ ১৮ বাংলা




