পিরিয়ডের ব্যথা কখন স্বাভাবিক, কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন

মাসিকের সময় পেটব্যথা অনেক নারীর কাছেই পরিচিত একটি সমস্যা। কারও ক্ষেত্রে ব্যথা সহনীয় হলেও, কারও জন্য এটি এতটাই তীব্র হয় যে স্বাভাবিক কাজকর্মও ব্যাহত হয়। অনেকেই মনে করেন, তীব্র ব্যথা মানেই স্বাভাবিক মাসিকের অংশ। কিন্তু সব সময় তা নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি মাসিকের ব্যথা খুব বেশি হয়, প্রতি মাসেই একইভাবে তীব্র থাকে বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে, তাহলে এটি এন্ডোমেট্রিওসিসের লক্ষণও হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন এমন সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
এন্ডোমেট্রিওসিস কী?
এন্ডোমেট্রিওসিস এমন একটি অবস্থা, যেখানে জরায়ুর ভেতরের আস্তরণের মতো টিস্যু জরায়ুর বাইরে, যেমন ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান টিউব বা পেলভিসের অন্য অংশে বেড়ে ওঠে।
মাসিকের সময় এই টিস্যুগুলোও হরমোনের প্রভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে প্রদাহ, তীব্র ব্যথা এবং অনেক ক্ষেত্রে দাগ বা স্কার টিস্যু তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব প্রজননক্ষমতার ওপরও পড়তে পারে।
সাধারণ মাসিকের ব্যথা কেমন হয়?
সাধারণ মাসিকের ব্যথা সাধারণত-
- মাসিক শুরুর এক বা দুই দিন আগে বা প্রথম দিন শুরু হয়
- দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ধীরে ধীরে কমে যায়
- ব্যথানাশক ওষুধ বা গরম সেঁক দিলে কিছুটা আরাম পাওয়া যায়
- দৈনন্দিন কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না
এ ধরনের ব্যথাকে প্রাইমারি ডিসমেনোরিয়া বলা হয় এবং এটি অনেক নারীর ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক।
এন্ডোমেট্রিওসিসের ব্যথা কীভাবে আলাদা?
এন্ডোমেট্রিওসিসের ব্যথা সাধারণ মাসিকের ব্যথার তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে মাসিকের আগে থেকেই তীব্র ব্যথা শুরু হওয়া, মাসিক শেষ হওয়ার পরও ব্যথা থেকে যাওয়া, ব্যথার কারণে অফিস/পড়াশোনা বা দৈনন্দিন কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া, ব্যথানাশক ওষুধেও পর্যাপ্ত আরাম না পাওয়া এবং প্রতি মাসে একই ধরনের তীব্র ব্যথা হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যেতে পারে।
আরও যেসব লক্ষণ থাকতে পারে-
এন্ডোমেট্রিওসিসের ক্ষেত্রে শুধু মাসিকের ব্যথাই নয়, আরও কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
- মলত্যাগ বা প্রস্রাবের সময় ব্যথা, বিশেষ করে মাসিকের সময়ে
- অতিরিক্ত বা অনিয়মিত রক্তপাত
- দীর্ঘদিন তলপেটে ব্যথা
- সহবাসের সময় বা পরে ব্যথা
- গর্ভধারণে সমস্যা বা বন্ধ্যাত্ব
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
- পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়ার মতো হজমের সমস্যা
তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে সব লক্ষণ দেখা যায় না। কারও কারও শুধু তীব্র মাসিকের ব্যথাই থাকতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের পরিস্থিতিগুলোর কোনোটি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
- মাসিকের ব্যথা প্রতি মাসেই অসহ্য হয়
- ব্যথার কারণে নিয়মিত স্কুল, কলেজ বা কর্মস্থলে যেতে সমস্যা হয়
- ব্যথানাশক ওষুধেও উপকার পাওয়া যায় না
- সহবাসের সময় ব্যথা হয়
- এক বছরের বেশি সময় চেষ্টা করেও গর্ভধারণ না হলে
- মাসিকের বাইরে দীর্ঘদিন তলপেটে ব্যথা থাকে
রোগ নির্ণয়
চিকিৎসক প্রথমে রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক পরীক্ষা করেন। প্রয়োজন হলে আল্ট্রাসাউন্ড, এমআরআই বা ল্যাপারোস্কোপির মতো পরীক্ষা করা হতে পারে।
বর্তমানে ল্যাপারোস্কোপিকে এন্ডোমেট্রিওসিস নিশ্চিত করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে ধরা হয়।
চিকিৎসা কী?
রোগের তীব্রতা, বয়স এবং ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। চিকিৎসায় থাকতে পারে ব্যথানাশক ওষুধ, হরমোনভিত্তিক চিকিৎসা, জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এবং প্রয়োজন হলে অস্ত্রোপচার।
মাসিকের সময় ব্যথা হওয়া সাধারণ বিষয় হলেও, তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথাকে কখনোই স্বাভাবিক ধরে নেওয়া উচিত নয়। যদি প্রতি মাসে ব্যথার কারণে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয় বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। সময়মতো এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্ত করা গেলে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যতের জটিলতা কমানোর সুযোগ অনেক বেড়ে যায়।
সূত্র: এনডিটিভি
.png)

