logo
Advertisement

বাসি মাংস খেলেই ক্যানসার, নাকি অন্য কোনো বিপদ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
বাসি মাংস খেলেই ক্যানসার, নাকি অন্য কোনো বিপদ
ছবি: ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস

ফ্রিজে রাখা মাংস দু-তিন দিন পর গরম করে খাওয়া অনেক পরিবারেই স্বাভাবিক বিষয়। একদিনের রান্না পরের দিন, কখনো তার পরের দিনও খাওয়া হয়। তাই বাসি মাংস নিয়ে ক্যানসারের কথা শুনলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, সত্যিই কি দুদিনের বাসি মাংস খেলেই ক্যানসার হতে পারে?

Advertisement

এর উত্তর হলো, একদিন বা দুদিন বাসি মাংস খেলে সঙ্গে সঙ্গে ক্যানসার হয়ে যায় না। ক্যানসার সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ঝুঁকির কারণে তৈরি হয়। তবে দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত মাংস ও লাল মাংস থাকলে কোলোরেক্টাল বা অন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা বাসি মাংস খেলে খাদ্যে বিষক্রিয়া ও জীবাণুর সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। তাই ক্যানসারের ঝুঁকি এবং বাসি খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি দুটি আলাদা বিষয়।

বাসি মাংস খেলেই কি ক্যানসার হয়?

না। একবার বা দুবার বাসি মাংস খাওয়ার কারণে ক্যানসার হয়ে যাবে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ক্যানসার তৈরি হতে সাধারণত দীর্ঘ সময় লাগে এবং এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে।

একটি ভারতীয় অনলাইন পত্রিকার প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের বরাতে বলা হয়েছে, একদিন বা দুদিন বাসি মাংস খেলে তাৎক্ষণিকভাবে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে ভুলভাবে সংরক্ষণ করা মাংস খেলে খাদ্যে বিষক্রিয়া, পেটের সংক্রমণ ও অন্যান্য হজমের সমস্যা হতে পারে।

অর্থাৎ ফ্রিজে রাখা আগের দিনের মাংস খাওয়ার সঙ্গে ক্যানসারের সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করা ঠিক নয়। বরং মাংস কত দিন রাখা হয়েছে, কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং খাওয়ার আগে সেটি নিরাপদ অবস্থায় আছে কি না, এসব বিষয় খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আসল চিন্তার বিষয় প্রক্রিয়াজাত মাংস

ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে যে মাংসের সম্পর্ক পাওয়া গেছে, তা হলো প্রক্রিয়াজাত মাংস।

প্রক্রিয়াজাত মাংস বলতে লবণ দেওয়া, সংরক্ষণ, গাঁজন, ধোঁয়ায় শুকানো বা স্বাদ ও সংরক্ষণক্ষমতা বাড়ানোর জন্য অন্যভাবে প্রক্রিয়াজাত করা মাংসকে বোঝায়। সসেজ, বেকন, হ্যাম, কর্নড বিফ, বিফ জার্কি এবং কিছু ধরনের ক্যানজাত মাংস এর উদাহরণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যানসার গবেষণা সংস্থা আইএআরসি প্রক্রিয়াজাত মাংসকে মানুষের জন্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী বা গ্রুপ ১ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া গেছে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ক্ষেত্রে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। গ্রুপ ১ মানে এই নয় যে প্রক্রিয়াজাত মাংস ধূমপানের মতোই বিপজ্জনক। এই শ্রেণিবিন্যাস মূলত কোনো উপাদান ক্যানসার ঘটাতে পারে কি না, সে বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের শক্তি বোঝায়। ঝুঁকির মাত্রা আলাদা বিষয়।


দিনে ৫০ গ্রাম প্রক্রিয়াজাত মাংস কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

আইএআরসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিদিন ৫০ গ্রাম প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ঝুঁকি সাধারণত মাংস খাওয়ার পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে বাড়তে থাকে।

তবে ১৮ শতাংশ বলতে ব্যক্তির ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা সরাসরি ১৮ শতাংশ হয়ে যায়, এমন নয়। এটি আপেক্ষিক ঝুঁকি বৃদ্ধির হিসাব। তাই সংখ্যাটি বোঝার সময় বিষয়টি সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা জরুরি।

লাল মাংসের ক্ষেত্রেও কি একই কথা?

লাল মাংসের ক্ষেত্রে প্রমাণ প্রক্রিয়াজাত মাংসের তুলনায় দুর্বল। আইএআরসি লাল মাংসকে মানুষের জন্য সম্ভবত ক্যানসার সৃষ্টিকারী বা গ্রুপ ২এ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ক্ষেত্রে।

লাল মাংস বলতে সাধারণত গরু, খাসি, ভেড়া ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাংস বোঝানো হয়। এর অর্থ এই নয় যে লাল মাংস খাওয়া মাত্রই ক্যানসার হবে। বরং দীর্ঘদিন বেশি পরিমাণে খাওয়ার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় রাখা দরকার।

আইএআরসির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ১০০ গ্রাম লাল মাংস খাওয়ার সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ১৭ শতাংশ বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে লাল মাংসের ক্ষেত্রে কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক প্রক্রিয়াজাত মাংসের তুলনায় কম নিশ্চিত।

মাংস রান্না করার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ

শুধু মাংসের ধরন নয়, রান্নার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। খুব বেশি তাপমাত্রায় বা সরাসরি আগুনের সংস্পর্শে মাংস রান্না করলে কিছু রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হতে পারে। যেমন, হেটেরোসাইক্লিক অ্যারোমেটিক অ্যামাইন এবং পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন। এসব পদার্থের কিছু ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে পরিচিত বা সন্দেহভাজন।

বিশেষ করে পুড়িয়ে ফেলা, অতিরিক্ত ঝলসানো বা সরাসরি আগুনে দীর্ঘ সময় রান্না করার ক্ষেত্রে এই রাসায়নিকগুলোর পরিমাণ বাড়তে পারে।

তবে আইএআরসি বলেছে, রান্নার নির্দিষ্ট পদ্ধতি মাংস খাওয়ার সঙ্গে ক্যানসারের ঝুঁকি কতটা বদলায়, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তাই শুধু রান্নার পদ্ধতিকে ক্যানসারের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

বাসি মাংস গরম করে খেলেই কি নিরাপদ?

এখানেই খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো মাংস দীর্ঘ সময় অনুপযুক্ত তাপমাত্রায় পড়ে থাকলে তাতে ক্ষতিকর জীবাণু বাড়তে পারে। কিছু জীবাণু এমন বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করতে পারে, যা পরে রান্না বা গরম করার পরও পুরোপুরি নষ্ট নাও হতে পারে।

তাই মাংসের গন্ধ বা রং অস্বাভাবিক হয়ে গেলে শুধু ভালোভাবে গরম করে খাওয়ার চেষ্টা না করাই নিরাপদ। অর্থাৎ বাসি মাংসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক আশঙ্কা ক্যানসার নয়, বরং খাদ্যে বিষক্রিয়া ও সংক্রমণ।

মাংস কি তাহলে পুরোপুরি বাদ দিতে হবে?

না। মাংসেরও পুষ্টিগুণ রয়েছে। লাল মাংসে উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি আয়রন, জিংক ও বিভিন্ন বি ভিটামিন পাওয়া যায়। তাই ক্যানসারের ঝুঁকির কথা শুনে সবাইকে মাংস পুরোপুরি বাদ দিতে হবে, এমন সিদ্ধান্ত আইএআরসি দেয়নি। বরং প্রক্রিয়াজাত মাংস ও লাল মাংসের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

খাদ্যতালিকায় মাছ, ডাল, শাকসবজি, ফল ও গোটা শস্যের মতো খাবারও রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এতে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আসে এবং অতিরিক্ত মাংসনির্ভরতা কমে।

তাহলে মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে কী করবেন?

মাংস খেতে চাইলে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা যেতে পারে।

প্রথমত, সসেজ, বেকন, হ্যামসহ প্রক্রিয়াজাত মাংস যতটা সম্ভব কম খাওয়া ভালো। দ্বিতীয়ত, লাল মাংস প্রতিদিন বেশি পরিমাণে না খেয়ে পরিমিত রাখা যেতে পারে। তৃতীয়ত, মাংস পুড়িয়ে বা অতিরিক্ত ঝলসে না দিয়ে সঠিকভাবে রান্না করা উচিত।

আর রান্না করা মাংস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপদ তাপমাত্রা বজায় রাখা জরুরি। খাবারের গন্ধ, রং বা স্বাদ অস্বাভাবিক মনে হলে ঝুঁকি না নেওয়াই ভালো।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একদিনের বাসি মাংস খেয়ে ক্যানসারের ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত মাংস ও লাল মাংস থাকলে সেটি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো অভ্যাস নয়। ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে তাই কোনো একটি খাবারকে হঠাৎ ভয় পাওয়ার চেয়ে পুরো খাদ্যাভ্যাসকে ভারসাম্যপূর্ণ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস