পায়ের পেশিকে কেন শরীরের দ্বিতীয় হার্ট বলা হয়, এই অংশের কাজ কী

হৃৎপিণ্ড শরীরের প্রতিটি অংশে রক্ত পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে। তবে রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখতে শরীরের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হৃৎপিণ্ডকে সাহায্য করে। এই বিষয়ে হয়তো অনেকেই জানেন না। শরীরের সেই বিশেষ অংশটি হলো পায়ের পেছনের অংশে থাকা কাফ মাসল বা পিণ্ডলির পেশি। একে বলা হয় শরীরের দ্বিতীয় হার্ট।
হাঁটা, দৌঁড়ানো বা পায়ের গোড়ালি ওঠানামা করার সময় এই পেশি সংকুচিত হয়। এতে পায়ের শিরায় থাকা রক্ত হৃৎপিণ্ডের দিকে ফিরে যেতে সাহায্য করে। বিশেষ করে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিপরীতে পা থেকে রক্ত হৃৎপিণ্ডে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কাফ মাসলের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে এই পেশির স্বাভাবিক কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই সুস্থ রক্ত সঞ্চালনের জন্য পায়ের পেশি সচল রাখা খুব জরুরি।
কাফ মাসলকে দ্বিতীয় হার্ট বলা হয় কেন?
পায়ের হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত পেছনের দিকের মাংসপেশিকে কাফ মাসল বলা হয়। এই পেশি অনেকটা প্রাকৃতিক পাম্পের মতো কাজ করে। আমরা যখন হাঁটি, সিঁড়ি দিয়ে উঠি বা পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে গোড়ালি তুলি, তখন কাফ মাসল সংকুচিত হয়।
এই সংকোচনের ফলে পায়ের শিরাগুলোতে চাপ তৈরি হয়। এতে সেখানকার রক্ত উপরের দিকে ঠেলে দেয়। শিরার ভেতরে থাকা একমুখী ভালভ রক্তকে আবার নিচের দিকে ফিরে যেতে বাধা দেয়। ফলে রক্ত ধাপে ধাপে হৃৎপিণ্ডের দিকে পৌঁছাতে পারে।
ধমনির মাধ্যমে হৃৎপিণ্ড থেকে রক্ত শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছায়। এরপর শিরার মাধ্যমে সেই রক্ত আবার হৃৎপিণ্ডে ফিরে আসে। তবে পায়ের রক্তকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিপরীতে উপরের দিকে উঠতে হয়। এ কাজে কাফ মাসল সহায়তা করে।
এ কারণে একে দ্বিতীয় হার্ট বলা হয়। তবে একে প্রকৃত হৃৎপিণ্ডের বিকল্প বলা যায় না। এটি রক্ত সঞ্চালনের কাজে হৃৎপিণ্ডকে সহযোগিতা করে।
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে কী হয়?
অফিসে একটানা কাজ বা পড়াশোনার কারণে অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন। এ সময় পায়ের পেশিগুলো খুব বেশি নড়াচড়া করে না। ফলে কাফ মাসলের পাম্পিং কার্যক্রমও কমে যায়। এর কারণে পায়ের নিচের অংশে রক্ত জমে থাকতে পারে। কিছু সমস্যাও দেখা দিতে পারে-
• পায়ের গোড়ালি ও নিচের অংশ ফুলে যাওয়া
• পায়ে ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব করা
• পা ভারী হয়ে থাকার অনুভূতি
• শিরায় রক্ত জমে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি
তাই একটানা বসে না থেকে নিয়মিত পায়ের নড়াচড়া করা জরুরি।
দুর্বল কাফ মাসল কি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়?
কাফ মাসলের পাম্পিং ক্ষমতা কমে গেলে পায়ের রক্ত সঞ্চালনে সমস্যা হওয়ার পাশাপাশি এটি সামগ্রিক শারীরিক স্বাস্থ্যের অবস্থারও ইঙ্গিত হতে পারে।
২০২০ সালে মায়ো ক্লিনিকের গবেষকেরা ২ হাজার ৭২৮ জন প্রাপ্তবয়স্কের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেন। গবেষণায় দেখা যায়, যাদের কাফ মাসলের পাম্পিং কার্যকারিতা কম, তাদের পরবর্তী বছরগুলোতে মৃত্যুর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি ছিল। ১০ বছর পর স্বাভাবিক পাম্পিং কার্যকারিতার ব্যক্তিদের মৃত্যুহার ছিল প্রায় ৬ শতাংশ। অন্যদিকে, যাদের এই কার্যকারিতা কম ছিল, তাদের ক্ষেত্রে তা ছিল প্রায় ১৮ শতাংশ।
২০২৪ সালে একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি গবেষণায় প্রায় ৬ হাজার রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানেও দেখা যায়, কাফ মাসলের মাধ্যমে রক্ত সঞ্চালনের কার্যকারিতা যত কম, মৃত্যুর ঝুঁকিও তত বেশি।
তবে গবেষণাগুলো পর্যবেক্ষণমূলক। অর্থাৎ কাফ মাসলের দুর্বলতা সরাসরি মৃত্যুর কারণ, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, পেশির ক্ষয়, জয়েন্টের সমস্যা, স্নায়ু বা পেশির রোগ এবং সামগ্রিকভাবে দুর্বল স্বাস্থ্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
কাফ মাসল সচল রাখবেন যেভাবে
কাফ মাসল সক্রিয় রাখতে খুব কঠোর কোনো ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনের কিছু সাধারণ অভ্যাসই এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। যেমন-
প্রতিদিন হাঁটুন
কাফ মাসল সচল রাখার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো হাঁটা। প্রতিবার পা ফেললে পায়ের পেশি সংকুচিত হয় আর রক্তকে হৃৎপিণ্ডের দিকে ফিরতে সাহায্য করে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস করতে পারেন।
প্রতি ঘণ্টায় নড়াচড়া করুন
দীর্ঘ সময় বসে কাজ করলে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত একবার উঠে কয়েক মিনিট হাঁটুন। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও দীর্ঘক্ষণ বসে না থেকে নিয়মিত উঠে হাঁটাচলার পরামর্শ দেয়।
গোড়ালি ওঠানামা করুন
বসে থাকা অবস্থায় পায়ের সামনের অংশ মেঝেতে রেখে গোড়ালি উপরে তুলুন। এরপর ধীরে ধীরে নিচে নামান। কয়েকবার এই ব্যায়াম করলে কাফ মাসল সক্রিয় হয়।
সিঁড়ি ব্যবহার করুন
সম্ভব হলে লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করলে পায়ের পেশি সক্রিয় থাকে এবং শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
গোড়ালি ঘোরান ও পা স্ট্রেচ করুন
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে পায়ের গোড়ালি দুই দিকে ঘোরান। পাশাপাশি নিয়মিত কাফ মাসল স্ট্রেচ করার অভ্যাস করুন।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
হাঁটার পাশাপাশি দৌঁড়ানো, সাইকেল চালানো ও পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করতে পারেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম করা উচিত। পাশাপাশি সপ্তাহে দুই দিন বা তার বেশি সময় পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করতে পারেন।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন
শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও রক্ত সঞ্চালন বজায় রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। পাশাপাশি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করুন। এমন জুতা পরুন, যাতে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করা যায়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
পায়ের গোড়ালি বা নিচের অংশ দীর্ঘদিন ফুলে থাকলে, ব্যথা হলে বা পা ভারী মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে একটি পায়ে হঠাৎ ব্যথা, ফোলাভাব, লালচে ভাব বা অস্বাভাবিক গরম অনুভূত হলে অবহেলা করবেন না। এগুলো পায়ের শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার লক্ষণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
সুস্থ রক্ত সঞ্চালনের জন্য শুধু হৃৎপিণ্ডের যত্ন নিলেই হবে না। এর সঙ্গে পায়ের কাফ মাসলকেও সচল রাখতে হবে। প্রতিদিন হাঁটা, দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে না থাকা আর নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস আপনার দ্বিতীয় হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করতে পারে।
তথ্যসূত্র:
NDTV: Why Is Your Calf Muscle Called The 'Second Heart'?
Science Alert: Your Body Has a 'Second Heart', And It's Crucial You Keep It Pumping


