logo

যে ৫ অভ্যাসে বার্ধক্যেও ভালো থাকবে হৃৎপিণ্ড

যে ৫ অভ্যাসে বার্ধক্যেও ভালো থাকবে হৃৎপিণ্ড

হৃদরোগ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় উদ্বেগের কারণ। প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ হৃদরোগ ও এর জটিলতার কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন। শুধু উন্নত দেশেই নয়, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও হৃদরোগের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। অনিয়মিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, কম শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক চাপ এবং ধূমপানের মতো অভ্যাস এ ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অনেক সময় হৃদরোগ হঠাৎ করেই দেখা দেয় বলে মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে এর পেছনে দীর্ঘদিনের জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যগত নানা কারণ কাজ করে। উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস এবং অতিরিক্ত ওজনের মতো সমস্যা ধীরে ধীরে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করতে থাকে। এসব সমস্যাকে প্রায়ই নীরব ঝুঁকি বলা হয়, কারণ শুরুতে এগুলো তেমন কোনো লক্ষণ দেখায় না।

তবে আশার বিষয় হলো, সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে হৃদরোগের বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত যেমন আপনি কী খাচ্ছেন, কতটা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকছেন, পর্যাপ্ত ঘুমাচ্ছেন কিনা এবং ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে দূরে থাকছেন কিনা, এসবই হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনযাপনে কিছু সহজ পরিবর্তন আনলে হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। নিচে হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পাঁচটি কার্যকর উপায় জানানো হলো।

হৃদযন্ত্রের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার খান

আপনার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা সরাসরি হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলমূল, সবজি, পূর্ণ শস্যজাত খাবার, ডাল, শিমজাতীয় খাবার, চর্বিহীন প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি সমৃদ্ধ খাবার হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী। এসব খাবার কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে এবং রক্তনালিকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।

অন্যদিকে প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত গরু বা খাসির মাংস, সংরক্ষিত মাংস (frozen meat), অতিরিক্ত চিনি এবং বেশি লবণযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব কম খাওয়া উচিত। দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে ছোট পরিবর্তনও বড় উপকার করতে পারে। যেমন কোমল পানীয়ের বদলে পানি পান করা বা প্রতিদিনের খাবারে অতিরিক্ত একটি সবজির অংশ যোগ করা।

নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন

হৃদযন্ত্রও এক ধরনের পেশি, আর নিয়মিত ব্যবহার করলে এই পেশি আরও শক্তিশালী হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করা উচিত। দ্রুত হাঁটা, সাঁতার কাটা বা সাইকেল চালানো এর মধ্যে পড়ে।

এছাড়া সপ্তাহে অন্তত দুই দিন শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করলে শরীর আরও উপকার পায়। দৈনন্দিন জীবনের ছোট অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন সিঁড়ি ব্যবহার করা, খাবারের পর কিছুক্ষণ হাঁটা বা গাড়ি একটু দূরে পার্ক করে হেঁটে যাওয়া।

গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সূচক নিয়ন্ত্রণে রাখুন

উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং ডায়াবেটিস অনেক সময় দীর্ঘদিন ধরে কোনো লক্ষণ ছাড়াই শরীরের ক্ষতি করতে থাকে। এসবকে প্রায়ই নীরব ঝুঁকি বলা হয়, যা হৃদরোগের বড় কারণ।

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে এসব সমস্যা শুরুতেই শনাক্ত করা যায়। প্রয়োজন হলে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। রক্তচাপ, কোলেস্টেরল বা রক্তে শর্করার মাত্রা সামান্য কমলেও হৃদযন্ত্রের জন্য তা বড় উপকার বয়ে আনে।

তামাক ও মদ্যপান থেকে দূরে থাকুন

ধূমপান রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত করে, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমায় এবং ধমনিতে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই ধূমপান ছেড়ে দেওয়া হৃদযন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

অন্যদিকে মদ্যপানও বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত। এটি উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হৃদস্পন্দনসহ নানা সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে ক্যানসারের সম্ভাবনাও বাড়ায়। তাই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত হলো মদ্যপান না করা। যদি কেউ পান করেও থাকেন, তাহলে পরিমাণ যত কম হয় ততই ভালো।

পর্যাপ্ত ও ভালো মানের ঘুম নিশ্চিত করুন

ঘুমকে অনেক সময় গুরুত্ব দেওয়া হয় না, কিন্তু হৃদযন্ত্রের সুস্থতার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ভালো মানের ঘুম প্রয়োজন।

পর্যাপ্ত ঘুম না হলে স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ঘুমের সময় বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া বা স্লিপ অ্যাপনিয়া নামের একটি সমস্যা হৃদরোগের বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা অনেক সময় ধরা পড়ে না। জোরে নাক ডাকা, দিনের বেলা অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ঘুম থেকে উঠে সতেজ না লাগা এই সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। এমন লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সচেতনতা জরুরি

বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং অতিরিক্ত ওজনের সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং ব্যস্ত নগরজীবন হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং দৈনন্দিন জীবনে শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তোলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখা মূলত প্রতিরোধের ওপর নির্ভর করে। একবার গুরুতর ক্ষতি হয়ে গেলে তা পুরোপুরি ঠিক করা অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। তাই শুরু থেকেই সচেতন হওয়া জরুরি।

স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সূচক নিয়ন্ত্রণে রাখা, তামাক ও মদপান এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে। এসব সহজ অভ্যাসই দীর্ঘদিন সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপনের পথ তৈরি করে।