অস্থির সময়ে মানসিক চাপ সামলাতে সহায়ক যে ৯ উপায়

আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল ও অনিশ্চিত বিশ্বে উদ্বিগ্ন বা চাপ অনুভব করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রতিদিনের খারাপ খবর, বিশ্বজুড়ে বড় পরিবর্তন, ব্যক্তিগত কোনো দুর্ঘটনা বা জীবনের দৈনন্দিন চাপ অনেক সময় মানুষকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে দিতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানসিক স্থিতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে গবেষণাভিত্তিক কিছু কৌশল রয়েছে, যা মানুষকে এই সময়ে ধৈর্য ও মানসিক শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। উদ্বেগকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করা থেকে শুরু করে বই পড়া বা নিজের অনুভূতিকে ভালোভাবে বোঝা পর্যন্ত, এমনই কিছু উপায় তুলে ধরা হয়েছে এখানে।
নিজের অনুভূতিকে সঠিকভাবে বোঝার চেষ্টা করুন
মানুষ যে ভাষায় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে, তা তার মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, যদি কেউ তার অনুভূতিকে আরও নির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, তবে তা মানসিকভাবে তাকে স্থিতিশীল হতে সাহায্য করে।
শুধু আমি খুব চাপের মধ্যে আছি বলার বদলে আপনি বলতে পারেন আপনি হতাশ, উদ্বিগ্ন, চিন্তিত বা অনিশ্চিত বোধ করছেন।
মনোবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় ইমোশনাল গ্রানুলারিটি। অর্থাৎ বিভিন্ন অনুভূতির পার্থক্য বুঝতে পারার ক্ষমতা। এটি মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
কিছু গবেষক মনে করেন, অন্য সংস্কৃতির অনুভূতির ভাষা সম্পর্কে জানাও সহায়ক হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ফিনল্যান্ডের একটি ধারণা আছে সিসু, যার অর্থ কঠিন পরিস্থিতিতেও অদম্য দৃঢ়তা।
উদ্বেগকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করুন
উদ্বেগ শব্দটির উৎস প্রাচীন ল্যাটিন ও গ্রিক ভাষা থেকে, যার অর্থ অস্বস্তি বা চাপা অনুভূতি। তাই উদ্বেগকে সাধারণত নেতিবাচক মনে করা হয়।
কিন্তু গবেষণা বলছে, স্বাভাবিক মাত্রার উদ্বেগ অনেক সময় মানুষকে আরও মনোযোগী ও সৃজনশীল করে তোলে। এটি মানুষকে নতুন ধারণা খুঁজতে এবং সমস্যার সমাধান করতে উৎসাহ দেয়।
যদি উদ্বেগকে বিপদের সংকেত হিসেবে না দেখে একটি প্রস্তুতির বার্তা হিসেবে দেখা যায়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে মানুষ চাপের পরিস্থিতিতে আরও ভালো কাজ করতে পারে।
গঠনমূলকভাবে দুশ্চিন্তা করতে শিখুন
দুশ্চিন্তা সাধারণত ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে হয়। তাই এটি কখনও কখনও সমস্যার সমাধানের জন্য পরিকল্পনা করতেও সাহায্য করতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে দুশ্চিন্তাকে কাজে লাগানোর একটি সহজ পদ্ধতি হলো
- প্রথমে দুশ্চিন্তার বিষয়টি চিহ্নিত করা
- সমস্যার সমাধানের সম্ভাব্য উপায়গুলো নিয়ে ভাবা
- যদি করার মতো কিছু না থাকে, তাহলে মনকে অন্য ইতিবাচক কাজে ব্যস্ত রাখা
মনোযোগী কাজ, ধ্যান বা প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুভব করা দুশ্চিন্তা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
বই, গান বা পরিবেশ দিয়ে মন ভালো রাখুন
একটি ভালো বই অনেক সময় মানুষকে মানসিকভাবে অন্য এক জগতে নিয়ে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত আনন্দের জন্য বই পড়েন তারা তুলনামূলকভাবে কম মানসিক চাপ অনুভব করেন এবং সামাজিকভাবে বেশি আত্মবিশ্বাসী হন।
বর্তমানে বইয়ের মাধ্যমে মানসিক সহায়তা দেওয়ার একটি পদ্ধতি রয়েছে, যাকে বলা হয় বিবলিওথেরাপি। এতে ব্যক্তির মানসিক অবস্থা অনুযায়ী বই পড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বইয়ের পাশাপাশি গানও মানুষের আবেগে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। প্রিয় কোনো গান মুহূর্তেই মন ভালো করে দিতে পারে।
এ ছাড়া নিজের আশপাশের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। ঘরে গাছ রাখা, সবুজ প্রকৃতির ছবি দেখা বা প্রিয়জনের ছবি দেখাও মানসিক স্বস্তি এনে দিতে পারে।
ভৌতিক সিনেমা দেখা
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও ভৌতিক সিনেমা দেখা অনেক সময় উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
কারণ নিরাপদ পরিবেশে বসে ভয়ের গল্প বা সিনেমা দেখা এক ধরনের মানসিক অনুশীলনের মতো। এতে মানুষ বিপজ্জনক পরিস্থিতি কল্পনায় অনুভব করে এবং বাস্তব জীবনের চাপের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ভয়ের গল্প বা সিনেমা পছন্দ করেন তারা কঠিন পরিস্থিতিতে তুলনামূলকভাবে বেশি স্থির থাকতে পারেন।
প্রতিদিনের ভালো ঘটনাগুলো মনে করুন
কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। প্রতিদিন রাতে দিনের তিনটি ভালো ঘটনা লিখে রাখার অভ্যাস অনেক মানুষের মানসিক সুস্থতা বাড়াতে সাহায্য করেছে।
২০০৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত এমন তালিকা লিখেছেন তাদের মধ্যে এক মাসের মধ্যেই সুখের অনুভূতি বাড়তে শুরু করে এবং হতাশার মাত্রা কমে যায়।
এই ভালো ঘটনাগুলো বড় কিছু হতে হবে এমন নয়। বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়া বা ভালো একটি কথোপকথনও হতে পারে।
কী নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব আর কী নয় তা বুঝুন
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এপিকটেটাস বলেছিলেন, মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো কোন বিষয়গুলো তার নিয়ন্ত্রণে আছে আর কোনগুলো নেই তা বোঝা।
আমাদের চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও কাজ আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু অনেক ঘটনা বা পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
অনেক সময় মানুষ এই বাস্তবতা মেনে নিতে না পারার কারণেই বেশি মানসিক চাপ অনুভব করে। তাই কোন বিষয়গুলো আমরা বদলাতে পারি এবং কোনগুলো মেনে নিতে হবে তা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
সঠিকভাবে আশা ধরে রাখুন
অনেকে মনে করেন শুধু ভালো কিছু ঘটার আশা করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, কার্যকর আশা সবসময় কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
অর্থাৎ শুধু অপেক্ষা না করে নিজের লক্ষ্য ঠিক করা এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য পদক্ষেপ নেওয়াই সত্যিকারের আশাবাদী হওয়ার উপায়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে আশা তৈরি হয় ব্যক্তিগত লক্ষ্য ও সেই লক্ষ্য পূরণের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা থেকে।
শিশুদের সঙ্গে কঠিন বিষয় নিয়ে কথা বলুন
কঠিন সময় শুধু বড়দের নয়, শিশুদেরও প্রভাবিত করে। কিন্তু অনেক সময় বড়রা বুঝতে পারেন না কীভাবে শিশুদের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলা উচিত।
গবেষণায় দেখা গেছে, যখন বাবা-মা শিশুদের অভিজ্ঞতা নিয়ে বেশি প্রশ্ন করেন এবং তাদের অনুভূতি নিয়ে আলোচনা করেন, তখন শিশুদের মনোযোগ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ে।
শিশুদের অনুভূতি স্বীকার করা, খোলামেলা আলোচনা করা এবং সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার উপায় শেখানোকে বলা হয় ইমোশন কোচিং। এটি শিশুদের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা জীবনের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সঠিক কৌশল ব্যবহার করলে এই অনুভূতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।
নিজের অনুভূতি বোঝা, বাস্তবসম্মত আশা রাখা, কৃতজ্ঞতা চর্চা করা এবং প্রিয় কাজের মাধ্যমে মনকে স্থির রাখা কঠিন সময়েও মানুষকে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে সাহায্য করতে পারে।
সূত্র : বিবিসি