Advertisement

ফিট শরীরেও যে কারণে হতে পারে হার্ট অ্যাটাক

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ফিট শরীরেও যে কারণে হতে পারে হার্ট অ্যাটাক

হার্ট অ্যাটাকের কথা উঠলে আমাদের চোখের সামনে সাধারণত এমন একজন মানুষের ছবি ভেসে ওঠে, যিনি অতিরিক্ত ওজনের, শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় বা ধূমপান করেন। কিন্তু বাস্তবে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি সব সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না।

Advertisement

শরীর ছিপছিপে, নিয়মিত হাঁটেন বা ব্যায়াম করেন, খাবারদাবার নিয়েও সচেতন, তারপরও কেউ হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। কারণ হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি শুধু ওজন বা শরীরের গড়ন দিয়ে বিচার করা যায় না। রক্তে এলডিএল (LDL) কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, পারিবারিক ইতিহাস, জিনগত কারণ এবং দীর্ঘদিনের অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কোলেস্টেরল কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

কোলেস্টেরল শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি পদার্থ। কোষ তৈরি, কিছু হরমোন তৈরি এবং শরীরের বিভিন্ন কাজে এর প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু রক্তে বিশেষ করে এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকলে তা ধমনির দেয়ালে জমে প্লাক তৈরি করতে পারে।

সময় গড়ানোর সঙ্গে এই প্লাক ধমনিকে সরু করে দিতে পারে। কখনো প্লাকের একটি অংশ ফেটে গিয়ে সেখানে রক্তের জমাট তৈরি হয়। সেই জমাট রক্তপ্রবাহ বন্ধ করে দিলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।

এ কারণেই কোলেস্টেরলকে নীরব সমস্যা বলা হয়। অনেকের রক্তে এলডিএল বেশি থাকলেও কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই জীবনযাপন করতে থাকেন, অথচ ধমনির ভেতরে ধীরে ধীরে পরিবর্তন চলতে পারে।

শরীর পাতলা হলেই হৃদ্‌যন্ত্র সুস্থ, এমন নয়

শরীরের ওজন স্বাভাবিক থাকা অবশ্যই ভালো। কিন্তু শুধু ওজন দিয়ে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বোঝা যায় না।

একজন মানুষের ওজন স্বাভাবিক হলেও তার উচ্চ রক্তচাপ থাকতে পারে। রক্তে শর্করা বেশি থাকতে পারে। এলডিএল কোলেস্টেরল বেশি হতে পারে। আবার পরিবারের কারও অল্প বয়সে হৃদ্‌রোগ হয়ে থাকলে তাঁর নিজের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের হালনাগাদ নির্দেশনায়ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি নির্ধারণে শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়, ব্যক্তির সামগ্রিক ঝুঁকি বিবেচনা করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বয়স, সামগ্রিক স্বাস্থ্য, ডায়াবেটিস, পারিবারিক ইতিহাস এবং আগে হৃদ্‌রোগ বা স্ট্রোকের ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

নিয়মিত ব্যায়াম করলেও ঝুঁকি থাকতে পারে

নিয়মিত ব্যায়াম হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি রক্তচাপ, ওজন, রক্তে শর্করা ও সামগ্রিক হৃদ্‌স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু ব্যায়াম কোনো ব্যক্তিকে হৃদ্‌রোগের সব ধরনের ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি সুরক্ষিত করে না।

বিশেষ করে কারও যদি বংশগতভাবে এলডিএল কোলেস্টেরল বেশি থাকে, তাহলে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করেও সেই মাত্রা স্বাভাবিক নাও থাকতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পারিবারিক হাই কোলেস্টেরল বা পারিবারিক হাইপারকোলেস্টেরোলেমিয়ার (familial hypercholesterolemia- জন্মগত ও বংশগত একটি সাধারণ জিনগত ব্যাধি, যার ফলে রক্তে 'লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন' (LDL) বা 'খারাপ' কোলেস্টেরলের মাত্রা অত্যন্ত বেড়ে যায়) মতো সমস্যা থাকতে পারে।

এ কারণে শরীর ভালো লাগছে বা নিয়মিত ব্যায়াম করছেন বলে কোলেস্টেরল পরীক্ষা প্রয়োজন নেই, এমন ধারণা ঠিক নয়।

পারিবারিক ইতিহাসকে অবহেলা করবেন না

পরিবারে বাবা, মা, ভাই বা বোনের অল্প বয়সে হৃদ্‌রোগ বা স্ট্রোক হয়ে থাকলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।

কিছু মানুষের শরীরে জিনগত কারণেই এলডিএল কোলেস্টেরল অনেক বেশি থাকতে পারে। আবার কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য হৃদ্‌রোগের সামগ্রিক ঝুঁকিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের নির্দেশনায় অল্প বয়সে হৃদ্‌রোগের পারিবারিক ইতিহাস এবং উচ্চ এলডিএল-কে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে অল্প বয়সে এলডিএল বেশি থাকলে দীর্ঘ সময় ধরে ধমনিগুলো বেশি মাত্রার ক্ষতিকর লিপোপ্রোটিনের সংস্পর্শে থাকে, যা ভবিষ্যতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।


স্বাভাবিক কোলেস্টেরল মানেই ঝুঁকি নেই?

এখানেও কিছুটা সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

কোলেস্টেরল স্বাভাবিক থাকা অবশ্যই ভালো খবর। কিন্তু হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি নির্ধারণের জন্য শুধু মোট কোলেস্টেরলের সংখ্যা দেখা যথেষ্ট নয়।

এলডিএল, এইচডিএল (HDL), ট্রাইগ্লিসারাইড, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, ধূমপানের অভ্যাস, বয়স, পারিবারিক ইতিহাস এবং আগের কোনো হৃদ্‌রোগের তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন বলছে, সবার জন্য একই এলডিএল লক্ষ্য প্রযোজ্য নয়। কারও ক্ষেত্রে এলডিএল ১০০ মিলিগ্রাম প্রতি ডেসিলিটারের (mg/dL) নিচে রাখা লক্ষ্য হতে পারে, আবার হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি খুব বেশি হলে আরও কম মাত্রা লক্ষ্য করা হতে পারে। তাই রিপোর্ট হাতে নিয়ে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

উচ্চ কোলেস্টেরল বোঝা কঠিন কেন

উচ্চ কোলেস্টেরলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, বেশির ভাগ মানুষের কোনো উপসর্গ থাকে না। মাথা ঘোরা, বুকব্যথা বা দুর্বলতা না থাকলেও রক্তে এলডিএল বেশি থাকতে পারে।

তাই শুধু শরীরের কোনো লক্ষণ দেখে কোলেস্টেরল বোঝার চেষ্টা করা ঠিক নয়। লিপিড প্রোফাইল রক্ত পরীক্ষা করে এলডিএল, এইচডিএল, ট্রাইগ্লিসারাইড ও মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা জানা যায়।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়মিত কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা উচিত। তবে কারও ঝুঁকি বেশি হলে চিকিৎসক আরও ঘন ঘন পরীক্ষা করতে বলতে পারেন।

শুধু কোলেস্টেরল নয়, আরও যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ

হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন অনেক বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-

  • উচ্চ রক্তচাপ
  • ডায়াবেটিস
  • ধূমপান
  • অতিরিক্ত ওজন
  • শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
  • অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
  • পারিবারিক ইতিহাস
  • বয়স বাড়া
  • কিছু জিনগত কারণ
  • দীর্ঘমেয়াদি কিছু রোগ

তাই শুধু কোলেস্টেরলের রিপোর্ট ভালো আছে কি না, সেটি দেখলেই হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে পুরো ধারণা পাওয়া যায় না।

কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়

হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করা।

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে। শাকসবজি, ফল, ডাল, বাদাম, গোটা শস্য ও মাছের মতো স্বাস্থ্যকর খাবার খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট, অতিরিক্ত চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানো ভালো।

ধূমপান না করা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস থাকলে সেটিও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

তবে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার পরও যদি এলডিএল বেশি থাকে, তাহলে শুধু খাবার ও ব্যায়ামের ওপর নির্ভর করা সব সময় যথেষ্ট নাও হতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে।

কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সব মানুষের ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা হালকা লাগা কিংবা ব্যথা হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এ ধরনের উপসর্গ হঠাৎ দেখা দিলে এটিকে গ্যাস বা সাধারণ ক্লান্তি ভেবে অপেক্ষা করা ঠিক নয়। দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

হৃদ্‌রোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো, দেখতে ফিট মানেই হৃদ্‌যন্ত্রও পুরোপুরি নিরাপদ। বাস্তবে শরীরের বাইরের গড়ন ধমনির ভেতরের অবস্থা সব সময় বলে দিতে পারে না।

নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং স্বাভাবিক ওজন অবশ্যই হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কোলেস্টেরল, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা এবং পারিবারিক ইতিহাসের মতো বিষয়গুলোর দিকেও নজর দিতে হবে।

বিশেষ করে পরিবারে অল্প বয়সে হৃদ্‌রোগের ইতিহাস থাকলে বা এলডিএল কোলেস্টেরল বেশি থাকলে শুধু নিজেকে সুস্থ মনে করে নিশ্চিন্ত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি যত আগে শনাক্ত করা যায়, তা কমানোর সুযোগও তত বেশি।

সূত্র: এনডিটিভি