শীতে থাইরয়েড রোগীদের বাড়তি সতর্কতার ৮ কার্যকরী উপায়

শীতের আমেজ চারদিকে এক উৎসবমুখর পরিবেশ নিয়ে আসে। শীতকালীন ছুটি, গ্রামে ঘুরতে যাওয়া, পিঠেপুলি খাওয়া- সব মিলে শীতকালটা অনেকের কাছেই ভীষণ পছন্দের। কিন্তু যাদের থাইরয়েডের সমস্যা আছে, তাদের কাছে শীতকালটা অনেক চ্যালেঞ্জিং। সাধারণ মানুষ যেখানে হালকা সোয়েটার গায়ে দিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন, সেখানে থাইরয়েডের রোগীরা ভারী জ্যাকেট পরেও শীতে কুঁকড়ে থাকেন।
এর পেছনের কারণটা খুবই স্বাভাবিক। আমাদের থাইরয়েড গ্রন্থি হলো শরীরের ভেতরের ‘থার্মোস্ট্যাট’ বা তাপ নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্র। এই গ্রন্থিটি যখন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, তখন শরীরের ভেতরের মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়া খুবই ধীর হয়ে যায়। এর ফলে শরীর অনেক সময় নিজের মতো করে পর্যাপ্ত তাপ তৈরি করতে পারে না। এতে ঠান্ডার অনুভূতি অনেক বেশি জেঁকে বসে।
শীতে থাইরয়েডের রোগীরা কীভাবে নিজেদের উষ্ণ ও সুস্থ রাখতে পারেন তার কিছু উপায় জেনে নিন-
লেয়ারিং বা একটার ওপর আরেকটা পোশাক পরা
শীতকালে শুধু একটা মোটা জ্যাকেট পরলেই থাইরয়েড রোগীদের ঠান্ডা দূর হয়ে যায় না।বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই সমস্যায় যারা ভোগেন তাদের জন্য ‘লেয়ারিং’ বা একাধিক স্তরে পোশাক পরা সবচেয়ে বেশি কার্যকরী।
প্রথমেই সরাসরি শরীরের সংস্পর্শে ভালো মানের থার্মাল ইনার, সুতির গেঞ্জি বা উল জাতীয় বেস-লেয়ার পরে নিন। এটি আপনার শরীরের প্রাকৃতিক তাপ বাইরে বেরিয়ে যাওয়া রোধ করে। এর উপর আরামদায়ক সোয়েটার বা হুডি আর বাইরে একটা ভালো উইন্ডপ্রুফ বা বাতাসরোধী জ্যাকেট পরতে পারেন।
থাইরয়েড রোগীদের হাত-পা বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে থাকে। তাই সবসময় ভারী উলের মোজা এবং ভালো গ্লাভস ব্যবহার করুন। রাতে ঘুমানোর সময়ও পায়ে মোজা পরে থাকাটা বেশ আরামদায়ক হতে পারে।
চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হরমোন বা টিএসএইচ চেকআপ করানো
শীতকাল আসলে শরীরের থাইরয়েড হরমোনের চাহিদাও সামান্য বদলে যায়। ঠান্ডার কারণে অনেকেরই টিএসএইচ লেভেল একটু বেড়ে যায়। এর অর্থ হলো- ঠান্ডার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে শরীর হরমোনের ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করছে।

তাই শীতের শুরুতেই একবার ডাক্তারের কাছে গিয়ে হরমোন টেস্ট (যেমন- TSH, Free T3, Free T4) করিয়ে নেওয়া উচিত।
অনেক সময় ঠান্ডার প্রকোপে থাইরয়েড রোগীদের ওষুধের মাত্রা একটু বাড়িয়ে দেওয়ার দরকার হয়। তবে ভুলেও নিজে নিজে কখনো ওষুধের ডোজ পরিবর্তন করতে যাবেন না। সবসময় চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেই সিদ্ধান্ত নেবেন।
অলসতা ছেড়ে শারীরিক সক্রিয়তা বজায় রাখুন
শীতের সকালে কম্বল ছেড়ে উঠতেই ইচ্ছে করে না। কিন্তু থাইরয়েড রোগীদের জন্য মেটাবলিজম বা শরীরকে সচল রাখা খুবই জরুরি। হালকা ব্যায়াম বা নড়াচড়া করলে রক্ত চলাচল বাড়ে। এর ফলে শরীর নিজেই তাপ তৈরি করতে শুরু করে।
বাইরে অতিরিক্ত কুয়াশা বা ঠান্ডা থাকলে বাইরে যাওয়ার দরকার নেই। ঘরের ভেতরেই ইয়োগা, স্ট্রেচিং বা হালকা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতে পারেন। এটি আপনার শীতের ক্লান্তি ও জড়তা দূর করতে বেশ ভালো কাজ করবে।
শুষ্ক ও খসখসে ত্বকের যত্ন নেওয়া
থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে এমনিতেই ত্বক শুষ্ক বা রুক্ষ হয়ে যাওয়ার সমস্যা থাকে। শীতের ঠান্ডা বাতাস সেই শুষ্কতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে, ফলে ত্বক ফাটতে শুরু করে।
গোসলের পর বা দিনে নিয়মিত ভালো ময়েশ্চারাইজার, কোল্ড ক্রিম বা বডি লোশন ব্যবহার করুন। খুব বেশিক্ষণ ধরে গরম পানিতে গোসল করতে যাবেন না, কারণ এটি ত্বকের ভেতরের প্রাকৃতিক তেল ধুয়ে ফেলে ত্বককে আরও বেশি খসখসে করে তোলে। ঘরের ভেতর একটা হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করতে পারেন, যা বাতাসের আর্দ্রতা ঠিক রাখে।
থাইরয়েডবান্ধব খাবার খাওয়া
শীতে অনেকেরই গরম গরম কফি, চা বা অস্বাস্থ্যকর জাঙ্ক ফুড খাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। কিন্তু এগুলো শরীরের ভেতরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। ক্যাফেইন কমিয়ে খাবারে পর্যাপ্ত আয়োডিন, সেলেনিয়াম (যেমন- ডিম, টুনা মাছ, বিভিন্ন বাদাম) এবং জিঙ্কসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। এগুলো থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য ঠিক রাখতে সাহায্য করতে পারে।

থার্মোজেনিক খাবার, যেমন- আদা, গোলমরিচ, দারুচিনি আর ভালো চর্বিযুক্ত খাবার শরীরের ভেতর থেকে প্রাকৃতিক উষ্ণতা জোগাতে সাহায্য করে। রান্নায় এগুলো নিয়মিত ব্যবহার করতে পারেন।
পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি পেতে সূর্যের আলোতে যান
শীতকালে সাধারণত রোদ কম পাওয়ার কারণে আমাদের শরীরে ভিটামিন ডি- এর ঘাটতি দেখা দেয়। আর এই ভিটামিন ডি থাইরয়েডের কার্যক্ষমতা ও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
প্রতিদিন অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট রোদে বসার অভ্যাস করুন। রোদের সংস্পর্শে যাওয়া ভিটামিন ডি- এর ঘাটতিই পূরণ করার পাশাপাশি মন ভালো রাখতে এবং শীতকালীন বিষণ্ণতা দূর করতেও সাহায্য করে।
মানসিক চাপ কমানো ও পর্যাপ্ত ঘুম
শীতের দিনগুলোতে অনেকেরই মনমেজাজ কেমন যেন খিটখিটে হয়ে থাকে। মনে রাখবেন, মানসিক চাপ বাড়লে শরীরে ‘কর্টিসল’ হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা থাইরয়েডের কার্যক্ষমতাকে আরও কমিয়ে দেয়।

প্রতিদিন রাতে অন্তত ৭/৮ ঘণ্টা গভীর ও শান্তিপূর্ণ ঘুম নিশ্চিত করুন। প্রয়োজনে মেডিটেশন করুন, পছন্দের বই পড়ুন বা হালকা মিউজিক শুনে মনকে শান্ত রাখুন।
শীতকালীন বিষণ্ণতা দূর করা
শীতকালে সূর্যের আলো কম পাওয়ার কারণে অনেকের মধ্যে ‘সিজনাল অ্যাক্টিভ ডিজঅর্ডার’ বা মন খারাপের সমস্যা দেখা দেয়। থাইরয়েড রোগীদের ক্ষেত্রে এটি ক্লান্তি ও অবসাদকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
নিজেকে সবসময় ইতিবাচক কাজে ব্যস্ত রাখুন। ঘরের পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা রাখুন। মন ভালো রাখতে পরিবারের সবার সঙ্গে সময় কাটান। মন ভালো থাকলে শরীরের ভেতরের হরমোনগুলোও অনেক ভালোভাবে কাজ করে।
একটু সচেতন হলে, খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন আনলে আর শরীরের অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিলে থাইরয়েড রোগীরাও খুব আরামেই সুস্থতার সঙ্গে শীতকাল কাটাতে পারেন। নিজের শরীরের অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিন। কোনো সমস্যা মনে হলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ভেরি ওয়েল হেলথে ‘8 Cold Weather Tips for Thyroid Patients’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সাবিহা তাবাসসুম।