কোন রক্তের গ্রুপে কোন রোগের ঝুঁকি বেশি

রক্তের গ্রুপ সাধারণত আমরা মনে রাখি জরুরি রক্তদানের প্রয়োজন হলে। এ পজিটিভ, বি পজিটিভ, ও পজিটিভ বা এবি নেগেটিভ, কোন গ্রুপের রক্ত তা জানাই যেন মূল বিষয়। কিন্তু রক্তের গ্রুপ শুধু রক্ত দেওয়া বা নেওয়ার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তের গ্রুপের সঙ্গে কিছু রোগের ঝুঁকিরও সম্পর্ক থাকতে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি। রক্তের গ্রুপ কোনো রোগের ভবিষ্যৎ বলে দেয় না। নির্দিষ্ট কোনো রক্তের গ্রুপ থাকলেই কেউ হৃদ্রোগ, স্ট্রোক বা ক্যানসারে আক্রান্ত হবেন, এমন নয়। গবেষণায় যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে, সেগুলো মূলত জনসংখ্যাভিত্তিক ঝুঁকির পার্থক্য। ব্যক্তিগত রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত শুধু রক্তের গ্রুপ দেখে নেওয়া যায় না।
রক্তের গ্রুপ আসলে কী?
মানুষের প্রধান চার ধরনের রক্তের গ্রুপ হলো এ, বি, এবি ও ও। এগুলো নির্ধারিত হয় লোহিত রক্তকণিকার বাইরের পৃষ্ঠে থাকা নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেনের মাধ্যমে।
এ গ্রুপের রক্তে এ অ্যান্টিজেন, বি গ্রুপে বি অ্যান্টিজেন, এবি গ্রুপে দুটিই থাকে। আর ও গ্রুপের লোহিত রক্তকণিকায় এ বা বি অ্যান্টিজেন থাকে না। রক্তের গ্রুপ জিনগতভাবে নির্ধারিত এবং জীবনের স্বাভাবিক সময়ে এটি পরিবর্তন হয় না।
এই অ্যান্টিজেনের পার্থক্য শুধু রক্ত সঞ্চালনের সময়ই গুরুত্বপূর্ণ নয়। শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া, রোগজীবাণুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া এবং কিছু রোগের ঝুঁকির সঙ্গেও এর সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
ও গ্রুপের তুলনায় এ, বি ও এবি গ্রুপে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কিছুটা বেশি
টাফ্টস ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসিনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ও গ্রুপের তুলনায় এ, বি ও এবি গ্রুপের মানুষের করোনারি ধমনির রোগের কারণে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কিছুটা বেশি হতে পারে। এর মধ্যে এবি গ্রুপের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
এর পেছনে রক্ত জমাট বাঁধার সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে বলে মনে করা হয়। এ, বি ও এবি গ্রুপের মানুষের কিছু রক্ত জমাট বাঁধার উপাদান, বিশেষ করে ভন উইলেব্রান্ড ফ্যাক্টর (von Willebrand factor) এবং ফ্যাক্টর ৮ (factor VIII), ও গ্রুপের রক্তের মানুষের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। এসব উপাদান রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে এ বা বি গ্রুপের মানুষকে হৃদ্রোগ নিয়ে বেশি ভয় পেতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, ধূমপান, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং পারিবারিক ইতিহাসের মতো নিয়ন্ত্রণযোগ্য বিষয় হৃদ্রোগের ঝুঁকিতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
স্ট্রোকের সঙ্গেও কি সম্পর্ক আছে?
রক্তের গ্রুপের সঙ্গে স্ট্রোকের সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা হয়েছে। টাফ্টসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, এ গ্রুপের মানুষের ৬০ বছরের আগে স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা ও গ্রুপের মানুষের তুলনায় সামান্য বেশি হতে পারে। গবেষকেরা মনে করেন, রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ার পার্থক্য এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। তবে এই সম্পর্ক বোঝার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।
অর্থাৎ, রক্তের গ্রুপ এখানে একটি সম্ভাব্য ঝুঁকির সূচক মাত্র। এটি একা কারও স্ট্রোকের ঝুঁকি নির্ধারণ করে না।
কিছু ক্যানসারের সঙ্গেও সম্পর্ক পাওয়া গেছে
রক্তের গ্রুপ এবং ক্যানসারের সম্পর্ক নিয়ে বহু বছর ধরে গবেষণা চলছে। কিছু গবেষণায় এ গ্রুপের মানুষের পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি ও গ্রুপের তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে।
এর একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে Helicobacter pylori (এটি একটি গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া যা মূলত মানুষের পাকস্থলীতে সংক্রমণ ঘটানোর জন্য পরিচিত। এটি প্রায়শই গ্যাস্ট্রিক আলসার এবং কখনও কখনও পাকস্থলীর ক্যান্সারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়) বা এইচ পাইলোরি সংক্রমণের কথা বলা হয়। এই ব্যাকটেরিয়া পাকস্থলীতে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও আলসার তৈরি করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ গ্রুপের মানুষের মধ্যে এইচ পাইলোরি সংক্রমণের সঙ্গে কিছু সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বড় পরিসরের গবেষণাতেও এ গ্রুপের সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসারের বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। একটি মেটা-বিশ্লেষণে এ গ্রুপের মানুষের পাকস্থলী ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি ও গ্রুপের তুলনায় বেশি দেখা যায়।
তবে এখানেও সতর্ক থাকা জরুরি। এসব গবেষণা থেকে বলা যায় না যে এ গ্রুপের মানুষ অবশ্যই ক্যানসারে আক্রান্ত হবেন। রক্তের গ্রুপের পাশাপাশি বয়স, খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, সংক্রমণ, পারিবারিক ইতিহাস ও অন্যান্য পরিবেশগত কারণও ক্যানসারের ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখে।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ক্ষেত্রেও কিছু সম্পর্ক আছে
এ, বি ও এবি গ্রুপের সঙ্গে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্কও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, ও গ্রুপের তুলনায় নন-ও গ্রুপের মানুষের অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
তবে গবেষকেরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন যে রক্তের গ্রুপ কীভাবে এই ঝুঁকিকে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ এখানে সম্পর্ক পাওয়া গেছে, কিন্তু সরাসরি কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক এখনো প্রমাণিত নয়।
রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকিতেও পার্থক্য থাকতে পারে
রক্তের গ্রুপের সঙ্গে venous thromboembolism বা শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকির একটি শক্তিশালী সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে। সাধারণভাবে ও গ্রুপের তুলনায় নন-ও গ্রুপ, অর্থাৎ এ, বি ও এবি গ্রুপের মানুষের এই ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।
একটি মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নন-ও রক্তের গ্রুপের মানুষের শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি ও গ্রুপের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে।
তবে এটিও আপেক্ষিক ঝুঁকি। কোনো ব্যক্তির রক্তের গ্রুপ নন-ও হলেই তার শরীরে রক্ত জমাট বাঁধবে, এমন নয়। দীর্ঘ সময় বসে থাকা, বড় অস্ত্রোপচার, গর্ভাবস্থা, ক্যানসার, স্থূলতা, ধূমপান এবং কিছু জিনগত কারণ রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মশা ও ম্যালেরিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক আছে
রক্তের গ্রুপের সঙ্গে মশার কামড়ের সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা হয়েছে। পরীক্ষাগারে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মশা ও গ্রুপের মানুষের প্রতি তুলনামূলক বেশি আকৃষ্ট হতে পারে। আবার ও গ্রুপের মানুষের গুরুতর ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে কিছুটা সুরক্ষা থাকতে পারে।
এর মানে অবশ্য এই নয় যে ও গ্রুপের মানুষ ম্যালেরিয়া থেকে নিরাপদ। মশার কামড় থেকে যে কারও ম্যালেরিয়া হতে পারে। তাই মশারি ব্যবহার, জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
কোভিড-১৯ নিয়েও রক্তের গ্রুপ নিয়ে গবেষণা হয়েছিল
কোভিড-১৯ মহামারির সময় রক্তের গ্রুপের সঙ্গে সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্ক নিয়েও অনেক গবেষণা হয়। টাফ্টসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা একটি বড় গবেষণায় ও গ্রুপের মানুষের কোভিড-১৯-এ মৃত্যুর ঝুঁকি সামান্য কম দেখা গিয়েছিল। তবে এই পার্থক্য এতটাই ছোট যে একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে শুধু রক্তের গ্রুপ দেখে কোভিডের ঝুঁকি অনুমান করা যায় না।
বর্তমানে কোভিডের ক্ষেত্রে ব্যক্তির টিকা গ্রহণ, বয়স, অন্যান্য রোগ ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য রক্তের গ্রুপের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তাহলে কি রক্তের গ্রুপ বদলালে ঝুঁকিও বদলাবে?
না। রক্তের গ্রুপ পরিবর্তন করা যায় না এবং শুধু রক্তের গ্রুপের কারণে চিকিৎসার প্রয়োজনও হয় না।
টাফ্টসের হেমাটোলজিস্ট রেমন্ড কোমেনজোর মতে, এসব গবেষণা মূলত জনসংখ্যার বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে রোগের ঝুঁকির পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। নির্দিষ্ট একজন রোগীর চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য শুধু রক্তের গ্রুপ ব্যবহার করা যায় না।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঝুঁকির যে কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেগুলোর দিকে নজর দেওয়া।
রক্তের গ্রুপ যাই হোক, যেসব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা যায়
আপনার রক্তের গ্রুপ এ, বি, এবি বা ও যেটিই হোক, হৃদ্রোগ ও অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমাতে কিছু অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত শরীরচর্চা করা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, ধূমপান না করা, অতিরিক্ত লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কম খাওয়া এবং শাকসবজি, ফল, ডাল ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা উপকারী।
পাশাপাশি রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়মিত পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো এমন ঝুঁকি, যেগুলো শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
রক্তের গ্রুপ নিয়ে অযথা ভয় নয়
রক্তের গ্রুপের সঙ্গে বিভিন্ন রোগের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে হয়তো এসব তথ্য ব্যবহার করে রোগের ঝুঁকি শনাক্ত করার আরও উন্নত পদ্ধতি তৈরি হতে পারে। কিন্তু বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, শুধু রক্তের গ্রুপ দেখে নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।
বরং বিষয়টিকে এভাবে দেখা ভালো, রক্তের গ্রুপ আমাদের শরীরের জিনগত একটি বৈশিষ্ট্য। এর সঙ্গে কিছু রোগের ঝুঁকির সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করার মতো বিষয়গুলো স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বড় ভূমিকা রাখে। টাফ্টসের বিশেষজ্ঞও ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকির বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তাই আপনার রক্তের গ্রুপ যেটিই হোক, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: টাফ্টস



