আলু কি সত্যিই গ্যাসের কারণ, কারা সতর্ক থাকবেন

আলু আমাদের প্রতিদিনের খাবারের খুব পরিচিত একটি অংশ। ভর্তা, ভাজি, তরকারি, দম কিংবা নানা ধরনের নাশতায় আলুর ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু অনেকেই আলু খাওয়ার পর পেট ফাঁপা, ঢেকুর বা গ্যাসের সমস্যায় ভোগেন। তখন প্রশ্ন ওঠে, আলুই কি এর জন্য দায়ী?
সহজ উত্তর হলো, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে বেশি আলু খেলে গ্যাস ও পেট ফাঁপার সমস্যা হতে পারে। তবে আলু সবার জন্য গ্যাসের খাবার নয়। আলুতে থাকা শর্করা ও প্রতিরোধী শ্বেতসার অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ভাঙার সময় গ্যাস তৈরি করতে পারে। যাদের হজমশক্তি সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি অনুভূত হতে পারে।
আলু খেলে গ্যাস হয় কেন?
আলু মূলত শর্করাজাতীয় খাবার। এর কিছু অংশ শরীরে পুরোপুরি হজম না হয়ে বৃহদান্ত্রে পৌঁছাতে পারে। সেখানে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া এসব অপাচ্য শর্করা ভাঙার সময় গ্যাস তৈরি করে। ফলে পেট ফাঁপা, পেটে চাপ বা ঢেকুরের মতো সমস্যা হতে পারে।
বিশেষ করে আলু রান্না করে ঠান্ডা করার পর এতে প্রতিরোধী শ্বেতসারের পরিমাণ বাড়তে পারে। সংবেদনশীল অন্ত্রের মানুষের ক্ষেত্রে এই ধরনের শ্বেতসার ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ভাঙার সময় গ্যাস ও পেট ফাঁপার সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে আলু খেলেই গ্যাস হবে।
কতটা আলু খেলে সমস্যা হতে পারে?
এখানে নির্দিষ্ট কোনো পরিমাণ সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। একজন মানুষ এক বাটি আলু খেলেও কোনো সমস্যা অনুভব নাও করতে পারেন, আবার অন্য কারও অল্প পরিমাণ আলুতেও পেট ফাঁপতে পারে।
খাবারের পরিমাণ, রান্নার ধরন, সঙ্গে কী খাওয়া হচ্ছে এবং ব্যক্তির হজমের ধরন, সবকিছুই এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে একসঙ্গে অনেক আলু খেলে হজমের ওপর চাপ বাড়তে পারে। অতিরিক্ত খাবার খাওয়াই অনেক সময় পেট ফাঁপা ও গ্যাসের কারণ হতে পারে।
আলুর চেয়ে রান্নার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ
আলু খেয়ে গ্যাস হচ্ছে মনে হলে শুধু আলুকে দায়ী না করে কীভাবে আলুটি খাওয়া হচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে।
অনেক তেল দিয়ে ভাজা আলু, অতিরিক্ত মসলা দেওয়া আলুর তরকারি বা আলুর সঙ্গে পেঁয়াজ, রসুন, ডালসহ অন্য গ্যাস তৈরি করতে পারে এমন খাবার একসঙ্গে খেলে অস্বস্তি বাড়তে পারে। পেট ফাঁপার পেছনে একটি নির্দিষ্ট খাবারের পাশাপাশি একাধিক খাবারের সম্মিলিত প্রভাবও থাকতে পারে।
তাই আলু খাওয়ার পর গ্যাস হলেই শুধু আলু বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
আলু খেলে কারা বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন?
যাদের অন্ত্র তুলনামূলক সংবেদনশীল, তাদের কিছু শর্করা বা খাবার হজমে সমস্যা হতে পারে। এ ধরনের খাবার খেলে গ্যাস, পেট ফাঁপা, পেটে ব্যথা বা পায়খানার পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
যাদের খিটখিটে অন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও কিছু খাবার পেট ফাঁপার সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে শুধু আলু খেলে গ্যাস হচ্ছে মানেই কোনো রোগ আছে, এমনটা ভাবার কারণ নেই।
আলু পুরোপুরি বাদ দিতে হবে?
সাধারণভাবে নয়। আলু পুষ্টিকর খাবারের অংশ হতে পারে। এতে শর্করা থাকে, যা শরীরের শক্তির উৎস। তাই আলু খেলে সমস্যা হচ্ছে না এমন ব্যক্তির জন্য শুধু গ্যাসের ভয় থেকে আলু পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
বরং যদি আলু খাওয়ার পর নিয়মিত অস্বস্তি হয়, তাহলে কিছুদিন পরিমাণ কমিয়ে দেখে নিতে পারেন। একই সঙ্গে কোন ধরনের রান্না খেলে বেশি সমস্যা হচ্ছে, সেটিও লক্ষ্য করা দরকার।
গ্যাস কমাতে কীভাবে আলু খাবেন?
কয়েকটি সহজ অভ্যাস কাজে লাগতে পারে।
পরিমাণ কমান: একসঙ্গে অনেক আলু না খেয়ে পরিমিত পরিমাণে খান।
ধীরে ধীরে খান: দ্রুত খাবার খেলে খাবারের সঙ্গে বেশি বাতাস পেটে ঢুকতে পারে, যা পরে পেট ফাঁপা ও গ্যাস বাড়াতে পারে।
অতিরিক্ত তেল এড়িয়ে চলুন: খুব তেলযুক্ত আলুর ভাজা খাবারের বদলে সেদ্ধ বা কম তেলে রান্না করা আলু বেছে নিতে পারেন।
কোন খাবারের সঙ্গে সমস্যা হচ্ছে খেয়াল করুন: আলুর সঙ্গে পেঁয়াজ, ডাল বা অন্য কোনো খাবার খেলে সমস্যা বাড়ছে কি না, তা লক্ষ্য করুন।
একবারে বেশি খাবেন না: অল্প অল্প করে খাওয়া অনেকের পেটের অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
আলু খাওয়ার পর পেট ফাঁপলে কী করবেন?
প্রথমে অতিরিক্ত খাওয়া এড়িয়ে চলুন এবং পানি পান করুন। খাবারের পর হালকা হাঁটাচলাও উপকারী হতে পারে। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা হজমের গতি ঠিক রাখতে সাহায্য করতে পারে।
তবে প্রতিবার আলু খাওয়ার পর একই সমস্যা হলে কয়েকদিন খাবারের তালিকা ও উপসর্গের দিকে নজর রাখুন। এতে কোন খাবার বা কোন ধরনের রান্না আপনার সমস্যা বাড়াচ্ছে, তা বোঝা সহজ হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
মাঝেমধ্যে গ্যাস বা পেট ফাঁপা সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু সমস্যা যদি নিয়মিত হতে থাকে বা দৈনন্দিন জীবনে অস্বস্তি তৈরি করে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বিশেষ করে গ্যাসের সঙ্গে যদি তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, দীর্ঘদিনের ডায়রিয়া, পায়খানায় রক্ত, অকারণে ওজন কমে যাওয়া বা জ্বর থাকে, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
আলু নিজে এমন কোনো খাবার নয়, যা সবার গ্যাসের কারণ হবে। তবে বেশি পরিমাণে খেলে বা কারও হজমতন্ত্র সংবেদনশীল হলে আলুর শর্করা ও প্রতিরোধী শ্বেতসার অন্ত্রে গ্যাস তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই আলু পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বদলে পরিমাণ কমিয়ে, কম তেলে এবং ধীরে ধীরে খেয়ে নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা বেশি যুক্তিযুক্ত। আর গ্যাসের সমস্যা নিয়মিত বা তীব্র হলে শুধু খাবারকে দায়ী না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা উচিত।
সূত্র: বিবিসি বাংলা



