খাওয়ার বদলে পায়ুপথে কফির ব্যবহার, কতটা নিরাপদ?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া স্বাস্থ্য পরামর্শের ওপর ভরসা করে একের পর এক বিপজ্জনক ট্রেন্ডের পেছনে ছুটছেন নেটিজেনরা। সম্প্রতি ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে ‘কফি এনিমা’ (মলদ্বার দিয়ে কফির বিশেষ মিশ্রণ প্রবেশ করানো)। ওয়েলনেস ইনফ্লুয়েন্সার ও অল্টারনেটিভ মেডিসিন প্রচারকদের দাবি—এটি লিভার বা যকৃৎ পরিষ্কার (ডিটক্স) করে, ওজন কমায় এবং গ্যাস্ট্রিক বা আইবিএসের মতো জটিলতা নিমেষেই দূর করে।
কফি এনিমা কী?
কফি এনিমা হলো বিকল্প চিকিৎসার একটি পদ্ধতি, যেখানে তৈরি করা ক্যাফেইনযুক্ত কফি ও পানির কুসুম গরম মিশ্রণ মলদ্বারের মাধ্যমে বৃহদন্ত্র বা কোলনে প্রবেশ করানো হয়। এটি সাধারণত শরীর বিষমুক্ত বা ‘ডিটক্স’ এবং কোলন পরিষ্কার করার মাধ্যম হিসেবে প্রচার করা হয়।
এই পদ্ধতির সঙ্গে পরবর্তীতে জার্মান-আমেরিকান চিকিৎসক ম্যাক্স গারসনের নাম বিশেষভাবে যুক্ত হয়ে যায়। তার প্রচারিত ‘গারসন থেরাপি’র অংশ হিসেবে কফি এনিমা ব্যবহারের কথা বলা হতো। এই থেরাপিতে উদ্ভিদভিত্তিক খাবার, ফল ও সবজির রস এবং কফি এনিমার মাধ্যমে শরীরকে ‘ডিটক্স’ করার ধারণা দেওয়া হয়েছিল।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অলৌকিক ডিটক্স দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তো নেই-ই, বরং ঘরে বসে অনভিজ্ঞ হাতে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করলে ঘটতে পারে মারাত্মক শারীরিক বিপর্যয়।
প্রচলিত ধারণা বনাম চিকিৎসাবিজ্ঞান
সাধারণত চরম কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে বা কোলন পরীক্ষার (যেমন: কোলনাসকপি) আগে চিকিৎসকরা বিশেষ তরল এনিমা দিয়ে থাকেন। তবে সে জায়গায় গরম বা ফুটানো ব্ল্যাক কফি ব্যবহারের চিকিৎসাগত কোনো অনুমোদন নেই।
সামাজিক মাধ্যমের দাবি, মলদ্বার দিয়ে কফি প্রবেশ করালে তা কোলন ও লিভারে জমে থাকা ক্ষতিকর টক্সিন বা বিষাক্ত বর্জ্য দ্রুত বের করে দেয়।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. রাজীবুল আলম বলেন, মানবদেহ প্রাকৃতিকভাবেই নিজেকে বিষমুক্ত রাখতে সক্ষম। ২৪ ঘণ্টা একটানা রক্ত পরিশোধন ও বর্জ্য অপসারণের কাজ করে লিভার ও কিডনি। এর জন্য কৃত্রিমভাবে বাইরে থেকে কফি ঢেলে লিভার পরিষ্কারের তথ্যটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও বিভ্রান্তিকর। মেডিকেল বিজ্ঞানে এর কোনো স্থান নেই। আমরা কোনোদিন কোনো বই পুস্তকে এমন কিছুই পড়িনি।
অসাবধানতায় যেসব ক্ষতি হতে পারে
চিকিৎসকদের মতে, কফি এনিমা করতে গিয়ে নানা কারণেই বিভিন্ন সমস্যার দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো:
কোলন ফেটে যাওয়া: ইন্টারনেট দেখে অনলাইন থেকে ‘এনিমা কিট’ কিনে ঘরে বসে এই চিকিৎসা নিতে গিয়ে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন বহু মানুষ। এনিমা টিউব সঠিকভাবে প্রবেশ করাতে না পারলে বৃহদান্ত্রের দেয়াল ছিদ্র হয়ে যেতে পারে, যা থেকে পেটজুড়ে মারাত্মক ইনফেকশন ও জীবনঘাতী অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হতে পারে।
ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা: অতিরিক্ত বা ঘনঘন এনিমা ব্যবহারের ফলে শরীর থেকে সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ দ্রুত বেরিয়ে যায়। এর প্রভাবে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া এমনকি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
অভ্যন্তরীণ অংশ পুড়ে যাওয়া ও ইনফেকশন: কফির তাপমাত্রা সামান্য বেশি থাকলে বা ব্যবহৃত উপাদান শতভাগ জীবাণুমুক্ত না হলে মলদ্বারের ভেতরের অতি সংবেদনশীল টিস্যু পুড়ে গিয়ে ঘা ও গ্যাংগ্রিন হতে পারে।
উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস: আমাদের বৃহদান্ত্রে বিপুল পরিমাণ ‘মাইক্রোবায়োম’ বা উপকারী জীবাণু থাকে, যা হজম ও অনাক্রম্যতা ঠিক রাখে। কৃত্রিমভাবে এনিমা দিলে এই প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়াগুলো ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়, ফলে স্বাভাবিক হজম ক্ষমতা চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ডিজিটাল মাধ্যমে সতর্ক থাকার পরামর্শ
অনলাইনে ভাইরাল হওয়া ভিডিও, ভিউ বাণিজ্যের চটকদার থাম্বনেইল কিংবা কোনো অনুমোদনহীন ‘হেলথ গুরু’র কথায় বিভ্রান্ত হয়ে নিজের শরীরে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন চিকিৎসাপদ্ধতি প্রয়োগ করা চরম বোকামি। যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিপাকতন্ত্রের সমস্যায় শর্টকাট না খুঁজে নিবন্ধিত ও অভিজ্ঞ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির পরামর্শ নেওয়ার কথা জানান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।



