logo

পাখি দেখা কি মস্তিষ্কের বয়স বাড়ার গতি কমাতে পারে? গবেষণায় মিলল ইতিবাচক ইঙ্গিত

পাখি দেখা কি মস্তিষ্কের বয়স বাড়ার গতি কমাতে পারে? গবেষণায় মিলল ইতিবাচক ইঙ্গিত
ছবি: বিবিসি

সকালে বারান্দায় বসে পাখির ডাক শোনা, গাছের ডালে বসে থাকা চড়ুই দেখা বা আকাশে উড়ে যাওয়া পাখির পরিচয় খোঁজা। আমাদের কাছে এসব কাজ নিছক অবসর কাটানোর উপায় মনে হতে পারে। কিন্তু পাখি পর্যবেক্ষণের এই অভ্যাস মস্তিষ্কের জন্যও উপকারী হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে সাম্প্রতিক গবেষণা।

বিজ্ঞানীদের মতে, পাখি পর্যবেক্ষণের সময় মনোযোগ দিয়ে পাখির আকার, রং, ডাক ও আচরণ লক্ষ করতে হয়। নতুন প্রজাতি চিনতে হয়, আগের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয় এবং মনে রাখতে হয় কোন পাখি কোথায় দেখা গেছে। এসব কাজ মস্তিষ্কের বিভিন্ন দক্ষতা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।

বিবিসি ফিউচারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিজ্ঞ পাখি পর্যবেক্ষকদের মস্তিষ্কের কিছু অঞ্চলে এমন পার্থক্য দেখা গেছে, যা মনোযোগ, দৃশ্য শনাক্তকরণ ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে, প্রবীণ ব্যক্তি এবং ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পাখি দেখা আনন্দ, সামাজিক যোগাযোগ ও স্মৃতিচর্চার একটি সহজ উপায় হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

তবে পাখি দেখলেই স্মৃতিভ্রংশ ঠেকানো যাবে বা মস্তিষ্কের বয়স বাড়া বন্ধ হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই। গবেষণাগুলো কী বলছে, তা বুঝতে হলে বিষয়টি একটু বিস্তারিত জানা প্রয়োজন। চলুন জেনে নিই।

পাখি দেখলে মস্তিষ্কে কী ধরনের পরিবর্তন হতে পারে

কানাডার টরন্টোর বেক্রেস্ট একাডেমি ফর রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশনের গবেষক এরিক উইংয়ের নেতৃত্বে একটি গবেষণায় অভিজ্ঞ পাখি পর্যবেক্ষক ও নতুনদের মস্তিষ্কের তুলনা করা হয়। এ জন্য তাদের ‍মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যান পরীক্ষা করা হয়েছিল।

গবেষণায় দেখা যায়, অভিজ্ঞ পাখি পর্যবেক্ষকদের মস্তিষ্কের কিছু অঞ্চলে গঠন ও কার্যকলাপের পার্থক্য আছে। বিশেষ করে মনোযোগ দেওয়া, চোখে দেখা বিষয় বিশ্লেষণ করা এবং পরিচিত বা অপরিচিত পাখি শনাক্ত করার সঙ্গে যুক্ত অঞ্চলগুলোতে এই পার্থক্য দেখা গেছে।

অপরিচিত প্রজাতির পাখি শনাক্ত করার সময় অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকদের মস্তিষ্কের এসব অঞ্চলে বেশি কার্যকলাপও দেখা যায়। গবেষকদের ধারণা, নিয়মিত পাখি পর্যবেক্ষণের মতো জটিল কাজ মস্তিষ্কের গঠন ও কাজের ধরনে পরিবর্তন আনতে পারে। এই ক্ষমতাকে বলা হয় নিউরোপ্লাস্টিসিটি। অর্থাৎ অভিজ্ঞতা ও শেখার মাধ্যমে মস্তিষ্কের সংযোগ ও কার্যপ্রণালিতে পরিবর্তন আসতে পারে।

তবে গবেষণাটি থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে পাখি পর্যবেক্ষণের কারণেই মস্তিষ্কে এই পার্থক্য তৈরি হয়েছে। এমনও হতে পারে, যাদের মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি আগে থেকেই ভালো, তারা পাখি পর্যবেক্ষণে বেশি আগ্রহী হন এবং এই কাজে দক্ষ হয়ে ওঠেন।

বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতার সম্পর্ক

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং নতুন তথ্য মনে রাখার ক্ষমতায় পরিবর্তন আসে। কারও ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন স্বাভাবিক বয়স বৃদ্ধির অংশ, আবার কারও ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়ার মতো রোগের কারণে দৈনন্দিন কাজেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।

গবেষণায় অভিজ্ঞ পাখি পর্যবেক্ষকদের মস্তিষ্কের কিছু অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে বেশি সংগঠিত সংযোগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের কিছু অঞ্চলের সংগঠিত কার্যপ্রণালি কমে যেতে পারে, যা চিন্তা ও স্মৃতিসংক্রান্ত দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এ কারণে গবেষকদের ধারণা, পাখি শনাক্ত করার মতো মনোযোগ ও স্মৃতিনির্ভর দক্ষতা দীর্ঘদিন চর্চা করলে বয়স বাড়ার পরও মস্তিষ্কের কিছু কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্যও উপকারী হতে পারে পাখি দেখা

পাখি পর্যবেক্ষণের সম্ভাব্য উপকার শুধু মস্তিষ্কের গঠন নিয়ে গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না। প্রবীণ ব্যক্তি এবং ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতেও এই অভ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে।

জার্মানির একটি গবেষণা প্রকল্পে ৬৫টি পরিচর্যাকেন্দ্রে পাখিদের খাবার দেওয়ার জায়গা তৈরি করা হয়েছিল। এসব জায়গা এমনভাবে রাখা হয়, যাতে বাসিন্দারা ঘরের ভেতর থেকেই পাখি দেখতে পারেন। কয়েক সপ্তাহ পর তাদের আচরণ ও সুস্থতার কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় বলে গবেষকেরা জানান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে কিছু বাসিন্দার মনোযোগ ও স্মৃতিচর্চায় উন্নতির লক্ষণ দেখা যায়। তারা পরিচিত পাখি চিনতে, কথোপকথনে অংশ নিতে এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে আগের চেয়ে বেশি আগ্রহ দেখান।

তবে এসব ফলাফলকে সতর্কতার সঙ্গে দেখা জরুরি। পাখি দেখা ডিমেনশিয়ার চিকিৎসার বিকল্প না। বরং এটি আক্রান্ত ব্যক্তিদের দৈনন্দিন জীবনকে আনন্দময় করা, আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত রাখা এবং সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরির একটি সহায়ক পদ্ধতি হতে পারে।

পাখি দেখার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়া জরুরি না

পাখি পর্যবেক্ষণ উপভোগ করতে দামি দূরবীন বা বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। বাড়ির জানালা, বারান্দা অথবা কাছের পার্ক থেকেই শুরু করা যায়। অভ্যাসটি সহজ করতে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করতে পারেন-

প্রতিদিন কিছু সময় রাখুন: সকালে বা বিকেলে ১০ থেকে ১৫ মিনিট আশপাশের পাখি দেখার চেষ্টা করুন।

পাখির বৈশিষ্ট্য লক্ষ করুন: পাখির রং, আকার, ডাক ও চলাফেরার ধরন খেয়াল করুন।

নতুন প্রজাতি চিনুন: আগে কখনো দেখেননি এমন পাখি দেখলে তার পরিচয় জানার চেষ্টা করুন।

মনে রাখার চেষ্টা করুন: আগের দিন কোন পাখি কোথায় দেখেছিলেন, তা মনে করার চেষ্টা করুন।

অন্যদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ভাগ করুন: পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সঙ্গে পাখি নিয়ে আলোচনা করলে সামাজিক যোগাযোগও বাড়তে পারে।

প্রকৃতির প্রতি আগ্রহ তৈরি করুন: পাখির পাশাপাশি গাছপালা, পোকামাকড় ও আশপাশের পরিবেশও পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।

পাখি দেখার সময় শুধু পাখির নাম মুখস্থ করাই লক্ষ্য না। বরং মনোযোগ দিয়ে দেখা, নতুন কিছু শেখা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো হতে পারে এই অভ্যাস

পাখি পর্যবেক্ষণ অনেকের মধ্যে শান্তি, আনন্দ ও নতুন কিছু জানার আগ্রহ তৈরি করে। পোল্যান্ডের ৩৮৮ জন পাখি পর্যবেক্ষকের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা এই শখকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেন, তাদের মধ্যে মানসিক প্রশান্তি ও স্বস্তি অনুভব করার প্রবণতা বেশি ছিল।

এ ধরনের অভ্যাসে প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগ, মনোযোগ, কৌতূহল এবং অন্যদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ একসঙ্গে তৈরি হয়। ফলে এটি মানসিক সুস্থতার জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে সবার অভিজ্ঞতা এক রকম হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

পাখি দেখা কি ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করতে পারে?

এ প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিত না। বর্তমান গবেষণায় অভিজ্ঞ পাখি পর্যবেক্ষকদের মস্তিষ্কে কিছু ইতিবাচক পার্থক্য দেখা গেছে। আবার পরিচর্যাকেন্দ্রে পাখি দেখার সুযোগ তৈরি করায় কিছু প্রবীণ ব্যক্তির মনোযোগ, স্মৃতিচর্চা ও মানসিক অবস্থার উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

কিন্তু এসব ফলাফল থেকে বলা যায় না যে পাখি দেখলেই ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ বিষয়ে আরও বড় ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।

মস্তিষ্কের সুস্থতা ধরে রাখতে নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার, সামাজিক যোগাযোগ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

পাখি দেখা শুধু অবসর কাটানোর শখ না, এটি নতুন কিছু শেখা, মনোযোগ ধরে রাখা এবং প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগের একটি সহজ উপায়। গবেষণায় অভিজ্ঞ পাখি পর্যবেক্ষকদের মস্তিষ্কে কিছু ইতিবাচক পার্থক্যের ইঙ্গিত মিলেছে। প্রবীণদের মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এই অভ্যাস উপকারী হতে পারে।

তবে পাখি দেখার মাধ্যমে মস্তিষ্কের বয়স বাড়া থামানো বা ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করা যায়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। তাই একে নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে না দেখে আনন্দদায়ক ও সম্ভাবনাময় একটি অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত।

সূত্র: বিবিসি