logo

শুধু নারীদের নয়, পুরুষদেরও হতে পারে স্তন ক্যানসার

শুধু নারীদের নয়, পুরুষদেরও হতে পারে স্তন ক্যানসার
ছবি: টপলাইন এমডি

স্তন ক্যানসার উঠলেই সাধারণত নারীদের কথাই প্রথমে মনে আসে। কিন্তু এই রোগ শুধু নারীদের হয়, এমন ধারণা ঠিক না। পুরুষদের শরীরেও স্তনের টিস্যু থাকে। আর সেই টিস্যুতেও ক্যানসার তৈরি হতে পারে। নারীদের তুলনায় সংখ্যায় কম হলেও পুরুষদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি আছে। আর তাই সচেতনতার অভাব এবং লক্ষণ চিনতে না পারার কারণে অনেক সময় রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয়।

পুরুষদের স্তন ক্যানসারের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো বুকের এক পাশে, বিশেষ করে স্তনবৃন্তের আশপাশে শক্ত গাঁট তৈরি হওয়া। এ ছাড়া স্তনবৃন্ত থেকে তরল বা রক্ত বের হওয়া, স্তনবৃন্ত ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া এবং ত্বকের রং বা গঠনে পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, পুরুষদের স্তন ক্যানসার বিরল ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রে শনাক্ত হওয়া মোট স্তন ক্যানসারের ১ শতাংশেরও কম পুরুষদের মধ্যে দেখা যায়। তবে বিরল বলে এর লক্ষণ উপেক্ষা করা উচিত না।

পুরুষদের স্তন ক্যানসার কী

স্তনের কোষ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করলে স্তন ক্যানসার হতে পারে। পুরুষদের স্তনেও কিছু নালি ও অন্যান্য টিস্যু থাকে। আর এসব কোষে ক্যানসারও তৈরি হতে পারে।

পুরুষদের স্তন ক্যানসারের বেশির ভাগই দুধ পরিবহনের নালির কোষ থেকে শুরু হয়। এই ধরনের ক্যানসারকে ‘ডাক্টাল কার্সিনোমা’ বলা হয়।

পুরুষদের স্তনের টিস্যু তুলনামূলক কম হওয়ায় গাঁট বা ত্বকের পরিবর্তন সহজেই চোখে পড়ে। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে পুরুষদেরও স্তন ক্যানসার হতে পারে। কেউ কেউ আবার বুকের গাঁটকে সাধারণ চর্বি জমা বা অন্য কোনো সমস্যা ভেবে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন যা ঠিক না।

পুরুষদের স্তন ক্যানসারের ৬টি লক্ষণ

বুকের এক পাশে শক্ত গাঁট: পুরুষদের স্তন ক্যানসারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো বুকের এক পাশে, বিশেষ করে স্তনবৃন্তের নিচে বা আশপাশে শক্ত গাঁট তৈরি হওয়া। অনেক ক্ষেত্রে গাঁটটি ব্যথাহীন হয়। ফলে অনেকে এটিকে তেমন গুরুত্ব দেন না।

তবে বুকের গাঁট হলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। পুরুষদের স্তনের টিস্যু বড় হয়ে যাওয়ার সমস্যা, যাকে গাইনেকোমাস্টিয়া বলা হয়, সেটিও গাঁট বা ফোলাভাবের মতো মনে হতে পারে।

কিন্তু বুকের এক পাশে নতুন গাঁট দেখা দিলে, সেটি শক্ত মনে হলে কিংবা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

স্তনবৃন্ত থেকে তরল বা রক্ত বের হওয়া: স্তনবৃন্ত থেকে কোনো কারণ ছাড়াই তরল বের হলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না। বিশেষ করে তরলের সঙ্গে রক্ত থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

এ ধরনের লক্ষণ স্তন ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে সংক্রমণ বা অন্যান্য সমস্যার কারণেও স্তনবৃন্ত থেকে তরল বের হতে পারে।

তাই নিজে থেকে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের মাধ্যমে কারণ খুঁজে বের করা উচিত।

স্তনবৃন্ত ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া: স্তনবৃন্তের আকৃতি বা অবস্থান হঠাৎ বদলে গেলে সতর্ক হওয়া দরকার। আগে স্বাভাবিক থাকা স্তনবৃন্ত যদি নতুন করে ভেতরের দিকে ঢুকে যায়, তাহলে এটি স্তনের ভেতরে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তনের লক্ষণ হতে পারে।

বিশেষ করে এর সঙ্গে বুকের গাঁট, ত্বকে পরিবর্তন বা স্তনবৃন্ত থেকে তরল বের হওয়ার সমস্যা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

তবে কারও স্তনবৃন্ত জন্মগতভাবেই ভেতরের দিকে থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে শুধু এই বৈশিষ্ট্যকে ক্যানসারের লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। নতুন পরিবর্তন হয়েছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

বুকের ত্বকে লালচে ভাব, কুঁচকে যাওয়া বা ক্ষত: স্তনের ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে সেটি খেয়াল করা প্রয়োজন। যেমন, ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, কুঁচকে যাওয়া, গর্তের মতো দেবে যাওয়া, খসখসে হয়ে ওঠা কিংবা দীর্ঘদিনেও না শুকানো ক্ষত তৈরি হওয়া।

কিছু ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসার ত্বকের গঠন ও চেহারায় পরিবর্তন ঘটাতে পারে। তবে সংক্রমণ, অ্যালার্জি বা অন্যান্য ত্বকের সমস্যাতেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায়।

পরিবর্তনটি স্থায়ী হলে, বাড়তে থাকলে বা এর সঙ্গে গাঁট থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

বগল বা কলারবোনের কাছে গাঁট: স্তন ক্যানসার আশপাশের লসিকাগ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়লে বগল বা কলারবোনের কাছে গাঁট কিংবা ফোলা দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে স্তনে বড় গাঁট স্পষ্ট হওয়ার আগেও লসিকাগ্রন্থি ফুলে উঠতে পারে।

তবে বগলে গাঁট হওয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে সংক্রমণও রয়েছে। তাই শুধু গাঁট দেখে ক্যানসার নিশ্চিত করা যায় না।

গাঁটটি দীর্ঘদিন থাকলে, বড় হতে থাকলে কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে দেখা দিলে চিকিৎসকের পরীক্ষা করানো জরুরি।

স্তনবৃন্তের আশপাশে ব্যথা বা অস্বস্তি: পুরুষদের স্তন ক্যানসারের গাঁট অনেক সময় ব্যথাহীন হয়। তবে স্তনবৃন্ত বা বুকের নির্দিষ্ট অংশে ব্যথা, অস্বস্তি কিংবা স্পর্শে সংবেদনশীলতা দেখা দিতে পারে।

বুকের ব্যথা বা অস্বস্তির পেছনে পেশির টান, আঘাত, হরমোনের পরিবর্তন এবং অন্যান্য কারণও থাকতে পারে। তাই ব্যথা হলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়।

তবে ব্যথার সঙ্গে গাঁট, স্তনবৃন্তের পরিবর্তন বা ত্বকের অস্বাভাবিকতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

পুরুষদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কাদের বেশি?

পুরুষদের স্তন ক্যানসারের সুনির্দিষ্ট কারণ সব ক্ষেত্রে জানা যায় না। তবে কয়েকটি বিষয় এই রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বয়স বৃদ্ধি: বয়স বাড়ার সঙ্গে পুরুষদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। রোগটি সাধারণত বেশি বয়সে শনাক্ত হয়, বিশেষ করে ৬০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে।

পরিবারে স্তন ক্যানসারের ইতিহাস: মা, বোন, মেয়ে বা পরিবারের অন্য ঘনিষ্ঠ রক্তসম্পর্কীয় সদস্যের স্তন ক্যানসার থাকলে পুরুষদের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

বংশগত জিনের পরিবর্তন: বিআরসিএ১ ও বিআরসিএ২ জিনের কিছু বংশগত পরিবর্তন পুরুষদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বুকে রেডিয়েশন চিকিৎসার ইতিহাস: আগে অন্য কোনো রোগের চিকিৎসায় বুকের অংশে রেডিয়েশন নেওয়া থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।

কিছু শারীরিক অবস্থা: ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোম, যকৃতের দীর্ঘমেয়াদি গুরুতর রোগ এবং শরীরে হরমোনের ভারসাম্যে কিছু পরিবর্তনের সঙ্গে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। স্থূলতাও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তবে এসব ঝুঁকির কোনো একটি থাকলেই স্তন ক্যানসার হবে, এমন নয়। আবার ঝুঁকির কারণ না থাকলেও এই রোগ হতে পারে।

পুরুষদের স্তন ক্যানসার শনাক্ত করা হয় কীভাবে?

বুকে গাঁট বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসক প্রথমে রোগীর শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চাইবেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকটি পরীক্ষা করা হতে পারে।

শারীরিক পরীক্ষা: বুক, স্তনবৃন্ত ও বগলের লসিকাগ্রন্থি পরীক্ষা করা হয়।

আলট্রাসনোগ্রাম বা ম্যামোগ্রাম: গাঁটের ধরন ও অবস্থান বুঝতে এসব পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

বায়োপসি: সন্দেহজনক টিস্যুর ছোট নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। ক্যানসার নিশ্চিত করার জন্য সাধারণত বায়োপসি গুরুত্বপূর্ণ।

সব পরীক্ষাই সবার প্রয়োজন হয় না। রোগীর বয়স, লক্ষণ ও শারীরিক পরীক্ষার ফল অনুযায়ী চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।

পুরুষদের সবার জন্য নিয়মিত ম্যামোগ্রাম করার পরামর্শ সাধারণত দেওয়া হয় না। তবে বংশগত ঝুঁকি বেশি থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে আগাম মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

পুরুষদের স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা কী?

রোগের ধরন, কোন পর্যায়ে শনাক্ত হয়েছে এবং ক্যানসার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়েছে কি না, তার ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে।

চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন, কেমোথেরাপি, হরমোন চিকিৎসা বা নির্দিষ্ট ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে। সব রোগীর ক্ষেত্রে একই চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না।

প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসার সুযোগ তুলনামূলক ভালো হতে পারে। তাই বুকের গাঁট বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখলে লজ্জা বা সংকোচের কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি করা উচিত নয়।

পুরুষদের স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব?

পুরুষদের স্তন ক্যানসার পুরোপুরি প্রতিরোধ করার নিশ্চিত কোনো উপায় নেই। কারণ, এই রোগের সব কারণ জানা যায়নি। তবে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং কয়েকটি ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।

  • স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন
  • নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করুন
  • সুষম খাবার খান
  • ধূমপান এড়িয়ে চলুন
  • অস্বাভাবিক গাঁট বা স্তনবৃন্তের পরিবর্তন অবহেলা করবেন না
  • পরিবারে স্তন ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করুন।

মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করলেও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। তাই শরীরে নতুন বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।

পুরুষদের স্তন ক্যানসার বিরল হলেও এটি বাস্তব। বুকের এক পাশে শক্ত গাঁট, স্তনবৃন্ত থেকে রক্ত বা তরল বের হওয়া, স্তনবৃন্ত ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া কিংবা ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে অবহেলা করা উচিত নয়।

এসব লক্ষণ মানেই ক্যানসার নয়। কিন্তু পরিবর্তনগুলো নতুন হলে বা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে পরিবারে স্তন ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে আরও সচেতন থাকা প্রয়োজন।

রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়াই প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ ও উপযুক্ত চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।

সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের ‘Breast Cancer in Men’ এবং আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির 'Signs and Symptoms of Breast Cancer in Men' ও 'Causes, Risk Factors, and Prevention of Breast Cancer in Men' আর্টিকেল থেকে নেওয়া তথ্য। সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।