শুধু কোমরেই নয়, কিডনির রোগের লক্ষণ শরীরের যেসব জায়গায় দেখা দিতে পারে

কিডনিতে সমস্যা হলে কোমর বা প্রস্রাবের জায়গায় ব্যথা হবে, এমনটাই অনেকের ধারণা। কিন্তু বাস্তবে কিডনির দীর্ঘমেয়াদি রোগের শুরুটা অনেক সময় একেবারেই নীরবে হয়। এমনকি শরীরে যে পরিবর্তনগুলো দেখা দিচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে কিডনির সম্পর্ক আছে, সেটিও সহজে বোঝা যায় না। তাই ক্লান্তিকে অনেকে কাজের চাপ বলে এড়িয়ে যান, চোখের নিচে ফোলাভাবকে ঘুম কম হওয়ার ফল ভাবেন। অথচ কিছু ক্ষেত্রে এগুলো কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।
কিডনি শরীরের রক্ত ছেঁকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত তরল বের করে। একই সঙ্গে শরীরে পানি ও খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজও করে। তাই কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে তার প্রভাব শরীরের বিভিন্ন অংশে দেখা দিতে পারে।
চোখের চারপাশে ফোলাভাব
সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখের নিচে বা চারপাশে সামান্য ফোলাভাব অনেকেরই হয়। ঘুম কম হওয়া, বেশি লবণ খাওয়া বা অন্য কারণেও এমন হতে পারে। তবে নিয়মিত চোখের চারপাশে ফোলাভাব দেখা দিলে বিষয়টি খেয়াল করা দরকার।
কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও সোডিয়াম বের হতে সমস্যা হতে পারে। ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশে তরল জমে পা, গোড়ালি, পায়ের পাতা এবং চোখের চারপাশে ফোলাভাব দেখা দিতে পারে।
তবে শুধু চোখ ফুলে গেলেই কিডনির রোগ হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া যাবে না। অন্য অনেক কারণেও এ সমস্যা হতে পারে।
সব সময় ক্লান্ত লাগা
পর্যাপ্ত ঘুমের পরও যদি সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগে, শরীরে শক্তি না থাকে বা দৈনন্দিন কাজ করতেই কষ্ট হয়, সেটিকে শুধু ব্যস্ততা বা ঘুমের অভাব বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে রক্তে বর্জ্য পদার্থ জমতে পারে। পাশাপাশি কিডনি থেকে লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তাকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন কম তৈরি হতে পারে। এর ফলে রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি তৈরি হতে পারে।
প্রস্রাবের ধরনে পরিবর্তন
কিডনির সমস্যা বোঝার ক্ষেত্রে প্রস্রাবের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকেত। স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বা কম প্রস্রাব হওয়া, প্রস্রাবে রক্ত দেখা কিংবা দীর্ঘদিন ধরে ফেনার মতো প্রস্রাব হওয়া অবহেলা করা উচিত নয়।
বিশেষ করে প্রস্রাব নিয়মিত ফেনাযুক্ত হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। এর একটি কারণ হতে পারে প্রস্রাবের সঙ্গে অতিরিক্ত প্রোটিন বের হওয়া। কিডনির ছাঁকনির অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে এমনটি হতে পারে।
তবে একবার ফেনাযুক্ত প্রস্রাব হলেই কিডনির রোগ হয়েছে, এমন নয়। বারবার এমন হচ্ছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
ত্বক শুষ্ক ও চুলকানি
কিডনির কার্যক্ষমতা অনেকটা কমে গেলে শরীরে বর্জ্য পদার্থ জমতে পারে। এর সঙ্গে ত্বক শুষ্ক হওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে চুলকানির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অনেকে এসব সমস্যাকে আবহাওয়া, অ্যালার্জি বা ত্বকের সাধারণ সমস্যা বলে ধরে নেন। কিন্তু অন্য কোনো কারণ ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে চুলকানি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বমি বমি ভাব ও খাবারে অরুচি
কিডনি ভালোভাবে কাজ না করলে শরীরে বর্জ্য জমে যেতে পারে। এর প্রভাবে বমি বমি ভাব, বমি, ক্ষুধা কমে যাওয়া বা খাবারের প্রতি অনীহা দেখা দিতে পারে। কিডনি রোগের অগ্রসর পর্যায়ে এসব উপসর্গ বেশি দেখা যায়।
তাই দীর্ঘদিন ধরে অরুচি বা বমি বমি ভাব থাকলে শুধু গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ধরে না নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা
কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীরে বর্জ্য পদার্থ জমে যাওয়ার পাশাপাশি রক্তস্বল্পতাও হতে পারে। এর প্রভাবে দুর্বলতা, মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা বা চিন্তাভাবনা কিছুটা ধীর হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
এ ধরনের উপসর্গের আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। তাই একে কিডনি রোগের নিশ্চিত লক্ষণ হিসেবে দেখা যাবে না।
উচ্চ রক্তচাপও হতে পারে সংকেত
কিডনি ও রক্তচাপের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কিডনি শরীরে তরল ও বিভিন্ন হরমোনের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। আবার দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপ কিডনির রক্তনালির ক্ষতি করে কিডনির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে একে অন্যের সমস্যা বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে কারও যদি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ থাকে এবং একই সঙ্গে শরীরে ফোলাভাব, প্রস্রাবের পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে কিডনি পরীক্ষা করার বিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।
কখন পরীক্ষা করা জরুরি?
কিডনির দীর্ঘমেয়াদি রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকের কোনো স্পষ্ট উপসর্গই থাকে না। জাতীয় কিডনি ফাউন্ডেশনও বলছে, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে কিডনি রোগের লক্ষণ দেখা দেয় তখনই, যখন রোগ অনেকটা এগিয়ে গেছে।
তাই শুধু উপসর্গের ওপর নির্ভর না করে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিয়মিত পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্রোগ আছে, অথবা পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা উচিত।
কিডনি পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে রক্তের ক্রিয়েটিনিন ও ইজিএফআর পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। ইজিএফআর কিডনি প্রতি মিনিটে কতটা রক্ত ছেঁকে নিতে পারছে, তার একটি ধারণা দেয়। পাশাপাশি প্রস্রাবে অ্যালবুমিন ও ক্রিয়েটিনিনের অনুপাত বা ইউএ সি আর পরীক্ষা করেও কিডনির ছাঁকনির ক্ষতির প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।
উপসর্গ দেখলেই ভয় পাওয়ার কারণ নেই
শরীরে এসব পরিবর্তন দেখা দিলেই কিডনির রোগ হয়েছে, এমন নয়। চোখের নিচে ফোলাভাব ঘুমের অভাবেও হতে পারে, ক্লান্তির পেছনে থাকতে পারে রক্তস্বল্পতা বা অন্য কোনো সমস্যা, আবার প্রস্রাবের পরিবর্তনেরও বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
তাই একটি উপসর্গ দেখে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করা ঠিক নয়। তবে একই ধরনের কয়েকটি পরিবর্তন যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে, বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো ঝুঁকি থাকলে, বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কিডনি শরীরের এমন একটি অঙ্গ, যার ক্ষতি অনেক সময় অনেক দেরিতে ধরা পড়ে। তাই শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করানোই কিডনি রোগ দ্রুত শনাক্ত করার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায়।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া



