Advertisement

পায়ের শিরা ফুলে ওঠার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে যে ঝুঁকি

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
পায়ের শিরা ফুলে ওঠার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে যে ঝুঁকি
ভ্যারিকোজ ভেইন হলে পায়ের চামড়ার নিচে শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পায়ের চামড়ার নিচে নীলচে বা বেগুনি রঙের শিরা ফুলে উঠে আছে। কোথাও শিরাগুলো আঁকাবাঁকা হয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে পা ভারী লাগে, ব্যথা করে বা গোড়ালির কাছে সামান্য ফোলাভাবও দেখা দেয়।

Advertisement

অনেকে এসবকে শুধু সৌন্দর্যের সমস্যা মনে করেন। সত্যি বলতে, অনেকের ক্ষেত্রে পায়ের ফোলা শিরা বা ভ্যারিকোজ ভেইন গুরুতর কোনো জটিলতা তৈরি করে না। কিন্তু কখনো কখনো এর কারণে পায়ে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত বা ঘা তৈরি হতে পারে, যা সহজে শুকাতে চায় না।

তাই পায়ে শিরা ফুলে উঠলে শুধু দেখতে কেমন লাগছে, সেটি নয়, সঙ্গে অন্য কোনো লক্ষণ আছে কি না, সেটিও খেয়াল করা জরুরি।

ভ্যারিকোজ ভেইন আসলে কী?

আমাদের পায়ের শিরাগুলো দিয়ে রক্ত পা থেকে আবার হৃদ্‌যন্ত্রের দিকে ফিরে যায়। এই কাজটি করতে গিয়ে শিরাগুলোকে মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে রক্ত ওপরে তুলতে হয়।

শিরার ভেতরে ছোট ছোট কপাটিকা থাকে। এগুলো রক্তকে ওপরের দিকে যেতে সাহায্য করে এবং নিচের দিকে ফিরে আসা ঠেকায়। কোনো কারণে এসব কপাটিকা দুর্বল হয়ে গেলে রক্ত শিরার মধ্যে জমতে শুরু করতে পারে। এতে শিরার ওপর চাপ বাড়ে এবং ধীরে ধীরে সেগুলো ফুলে ও আঁকাবাঁকা হয়ে যায়। এটাই ভ্যারিকোজ ভেইন।

সাধারণত পায়েই এটি বেশি দেখা যায়।

দেখতে কেমন হয়?

ভ্যারিকোজ ভেইন হলে পায়ের চামড়ার নিচে শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এগুলো নীল, বেগুনি বা ত্বকের রঙের তুলনায় গাঢ় দেখাতে পারে। অনেক সময় শিরাগুলো দড়ির মতো মোটা ও আঁকাবাঁকা হয়ে চামড়ার ওপর উঁচু হয়ে থাকে।

তবে শুধু শিরা দেখা গেলেই যে ব্যথা হবে, এমন নয়। অনেকের ক্ষেত্রে কোনো ব্যথা বা অস্বস্তিই থাকে না।

আবার কারও কারও পা ভারী লাগতে পারে, ব্যথা বা জ্বালাপোড়া হতে পারে, পেশিতে টান ধরতে পারে এবং গোড়ালি বা পায়ের নিচের অংশ ফুলে যেতে পারে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে থাকার পর এসব সমস্যা বাড়তে পারে।

কেন পায়ে ভ্যারিকোজ ভেইন হয়?

এর প্রধান কারণ হলো শিরার ভেতরের কপাটিকা ঠিকমতো কাজ না করা। তখন রক্ত নিচের দিকে ফিরে এসে শিরার মধ্যে জমে যায় এবং চাপ বাড়তে থাকে।

তবে সবার ক্ষেত্রে একই কারণে ভ্যারিকোজ ভেইন হয় না। কয়েকটি বিষয় এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে-

বয়স বাড়লে: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিরার কপাটিকাগুলো দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ফলে রক্ত চলাচল আগের মতো কার্যকর না হওয়ায় ভ্যারিকোজ ভেইনের ঝুঁকি বাড়ে।

পরিবারে কারও থাকলে: পরিবারের অন্য সদস্যের ভ্যারিকোজ ভেইন থাকলে নিজেরও এই সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।

দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে থাকা: যাদের কাজের কারণে দিনের বড় সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাদের পায়ের শিরায় চাপ বাড়তে পারে। একইভাবে দীর্ঘ সময় বসে থাকাও রক্ত চলাচলে সমস্যা তৈরি করতে পারে। নিয়মিত নড়াচড়া করলে পায়ের পেশি রক্তকে হৃদ্‌যন্ত্রের দিকে ফেরাতে সাহায্য করে।

অতিরিক্ত ওজন: শরীরের অতিরিক্ত ওজন পায়ের শিরায় চাপ বাড়াতে পারে। ফলে ভ্যারিকোজ ভেইনের ঝুঁকি বাড়ে।

গর্ভাবস্থা: গর্ভাবস্থায় শরীরে রক্তের পরিমাণ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে হরমোনের পরিবর্তন ও জরায়ুর বাড়তি চাপ পায়ের শিরায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এ সময় ভ্যারিকোজ ভেইন দেখা দিতে পারে।

আগে রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা থাকলে: পায়ের গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা বা ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস হলে শিরার কপাটিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরবর্তী সময়ে ভ্যারিকোজ ভেইন বা পায়ের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

কখন শুধু সৌন্দর্যের সমস্যা নয়?

ভ্যারিকোজ ভেইন অনেক সময় ক্ষতিকর নয়। কিন্তু এর সঙ্গে যদি নিয়মিত ব্যথা, পা ভারী লাগা, চুলকানি, ফোলাভাব বা ত্বকের পরিবর্তন দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

বিশেষ করে পায়ের গোড়ালির কাছে ত্বকের রঙ বদলে গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। দীর্ঘদিনের শিরার সমস্যায় ওই এলাকার ত্বক শক্ত, শুষ্ক বা কালচে হয়ে যেতে পারে। পরে সেখানে ক্ষত তৈরি হতে পারে।

ভ্যারিকোজ ভেইন থেকে কীভাবে পায়ে ঘা হয়?

পায়ের শিরায় দীর্ঘদিন ধরে রক্তের চাপ বেশি থাকলে আশপাশের ছোট রক্তনালি ও ত্বকের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। ধীরে ধীরে ত্বক দুর্বল হয়ে যায়।

এমন অবস্থায় সামান্য আঘাত, আঁচড় বা ক্ষত থেকেও পায়ে ঘা তৈরি হতে পারে। এই ঘাকে ভেনাস লেগ আলসার বলা হয়।

এই ধরনের ক্ষত সাধারণ ক্ষতের মতো দ্রুত শুকাতে চায় না। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কোনো ক্ষত না শুকালে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


পায়ের ক্ষত হলে কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?

ভেনাস লেগ আলসার সাধারণত হাঁটু ও গোড়ালির মাঝামাঝি, বিশেষ করে গোড়ালির ভেতরের দিকে তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে থাকতে পারে-

  • পায়ে ব্যথা বা চাপ লাগা
  • গোড়ালি ও পায়ের নিচের অংশ ফুলে যাওয়া
  • ক্ষতের চারপাশের ত্বক কালচে বা অন্য রঙের হয়ে যাওয়া
  • ত্বক শক্ত হয়ে যাওয়া
  • পায়ে চুলকানি বা শুষ্কতা
  • পা ভারী লাগা
  • ক্ষত থেকে তরল বা দুর্গন্ধযুক্ত পদার্থ বের হওয়া
  • ক্ষত থেকে দুর্গন্ধ বের হলে সতর্ক হোন

পায়ের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতে সংক্রমণ হতে পারে। তখন ব্যথা বাড়তে পারে, ক্ষতের চারপাশ লাল ও ফুলে যেতে পারে এবং দুর্গন্ধযুক্ত বা সবুজাভ তরল বের হতে পারে। জ্বরও আসতে পারে।

এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

কারা পায়ের ঘায়ের বেশি ঝুঁকিতে?

ভ্যারিকোজ ভেইন থাকলেই যে পায়ে ঘা হবে, এমন নয়। তবে কিছু মানুষের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। যাদের-

  • অতিরিক্ত ওজন রয়েছে
  • হাঁটাচলায় সমস্যা আছে
  • আগে পায়ে রক্ত জমাট বেঁধেছিল
  • পায়ে বড় ধরনের আঘাত বা অস্ত্রোপচার হয়েছে
  • দীর্ঘদিন ধরে ভ্যারিকোজ ভেইন রয়েছে
  • বয়স বেশি
  • দীর্ঘ সময় বসে বা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়

পা ফুলে গেলে কী করবেন?

ভ্যারিকোজ ভেইনের কারণে পা ভারী বা ফুলে থাকলে নিয়মিত হাঁটাচলা উপকারী হতে পারে। দীর্ঘ সময় একই অবস্থায় বসে বা দাঁড়িয়ে না থেকে মাঝেমধ্যে অবস্থান পরিবর্তন করা ভালো। বিশ্রামের সময় পা কিছুটা উঁচু করে রাখলেও অস্বস্তি কমতে পারে।

শরীরের অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর ওজনের দিকে আসার চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে নিজের মতো করে চাপযুক্ত মোজা ব্যবহার শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। বিশেষ করে যাদের পায়ের রক্তনালিতে অন্য কোনো সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সঠিক ধরনের চিকিৎসা আগে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

ভ্যারিকোজ ভেইন কি প্রতিরোধ করা যায়?

সব ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে এবং উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।

নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা করুন। দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে বা দাঁড়িয়ে থাকবেন না। বিশ্রামের সময় পা কিছুটা উঁচু করে রাখুন। শরীরের ওজন স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করুন। ধূমপান এড়িয়ে চলুন।

এ ছাড়া পায়ের ত্বক ভালোভাবে দেখভাল করা জরুরি। কারণ ত্বক দুর্বল হয়ে গেলে ছোট আঘাত থেকেও ক্ষত তৈরি হতে পারে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

পায়ে ভ্যারিকোজ ভেইন দেখা গেলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে নিচের যেকোনো সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত-

  • শিরার জায়গায় নিয়মিত ব্যথা বা চুলকানি হচ্ছে
  • পা বা গোড়ালি বারবার ফুলে যাচ্ছে
  • ত্বকের রঙ বদলে যাচ্ছে
  • শিরার ওপরের ত্বক শুষ্ক বা শক্ত হয়ে যাচ্ছে
  • পায়ে কোনো ক্ষত হয়েছে এবং দুই সপ্তাহেও শুকাচ্ছে না
  • ভ্যারিকোজ ভেইন থেকে রক্তপাত হচ্ছে

বিশেষ করে পায়ে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি হলে ঘরোয়া চিকিৎসায় সময় নষ্ট না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ভেনাস লেগ আলসার সাধারণত বিশেষায়িত চিকিৎসা ছাড়া ভালো হতে চায় না।

পায়ের শিরা ফুলে ওঠা অনেকের কাছেই প্রথমে শুধুই সৌন্দর্যের সমস্যা মনে হতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে যদি পা ব্যথা, ভারী লাগা, ফোলাভাব বা ত্বকের পরিবর্তন দেখা দেয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।

কারণ দীর্ঘদিনের ভ্যারিকোজ ভেইন কখনো কখনো পায়ের ত্বক দুর্বল করে ক্ষত তৈরি করতে পারে। সেই ক্ষত আবার সহজে শুকাতে নাও পারে।

তাই পায়ে অস্বাভাবিক শিরা দেখা দিলে নিয়মিত নড়াচড়া করা, দীর্ঘক্ষণ একই অবস্থায় না থাকা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি পায়ের ত্বক ও ক্ষতগুলোর দিকে নজর রাখুন। কোনো ক্ষত দুই সপ্তাহেও না শুকালে বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

সূত্র: নিউজ ১৮ , মায়ো ক্লিনিক