logo
Advertisement

সকালে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কেন বেশি, যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
সকালে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কেন বেশি, যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
ছবি : বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

সকালে ঘুম থেকে উঠে অনেকের দিন শুরু হয় তাড়াহুড়ায়। ঘুম থেকে উঠেই এক কাপ চা বা কফি, তারপর নাশতা না করেই অফিসের কাজ, ই-মেইল বা মিটিং নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া। অনেক সময় পানি খাওয়ার কথাও মনে থাকে না। বাইরে থেকে এসব অভ্যাস খুব সাধারণ মনে হলেও, বিশেষ করে যাদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের জন্য সকালের এই সময়টিতে একটু বেশি সতর্ক থাকা দরকার।

Advertisement

গবেষণায় দেখা গেছে, হার্ট অ্যাটাক দিনের সব সময়ে সমান হারে ঘটে না। ঘুম থেকে ওঠার পর সকালবেলায় এর প্রকোপ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। বিভিন্ন গবেষণায় সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বেশি হওয়ার প্রবণতা পাওয়া গেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সকালে উঠলেই হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বরং ঘুম থেকে জেগে ওঠার সময় শরীরে কিছু স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে, যা হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর সাময়িক চাপ বাড়াতে পারে। এই সময় ভুল জীবনযাপন বা অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

সকালে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বেশি কেন

ঘুমের সময় শরীর অপেক্ষাকৃত শান্ত অবস্থায় থাকে। ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর শরীর ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ সময় স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম, হৃদ্‌স্পন্দন ও রক্তচাপের মতো বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সকালে কর্টিসলসহ কিছু হরমোন এবং সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমের কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটে। একই সময়ে রক্তচাপ ও হৃদ্‌স্পন্দন বাড়তে পারে। রক্ত জমাট বাঁধার সঙ্গে সম্পর্কিত প্লেটলেটের কার্যক্রমেও দিনের সময়ভেদে পরিবর্তন দেখা যায়। এসব পরিবর্তন একসঙ্গে হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।

একাধিক গবেষণায় সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। একটি গবেষণায় সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা মধ্যরাত থেকে রাত ১টার তুলনায় প্রায় ৩ দশমিক ৮ গুণ বেশি ছিল।

তাই সকালে হৃদ্‌রোগের জন্য একটি সংবেদনশীল সময় থাকতে পারে, বিশেষ করে আগে থেকেই করোনারি হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা অন্যান্য ঝুঁকি থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে।

ঘুম থেকে উঠেই কোন অভ্যাসগুলো এড়িয়ে চলবেন

পানি না খেয়ে চা বা কফি

অনেকের ঘুম ভাঙার পর প্রথম কাজই হলো চা বা কফি পান করা। কার্ডিওলজিস্ট ডা. সঞ্জয় ভোজরাজ ঘুম থেকে ওঠার পর পানি না খেয়ে সরাসরি চা বা কফি পান করার অভ্যাস নিয়ে সতর্ক করেছেন।

তবে চা বা কফি নিজেই হার্ট অ্যাটাকের কারণ, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং সকালে শরীরকে ধীরে ধীরে সক্রিয় করার অংশ হিসেবে আগে পানি পান করা এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা ভালো অভ্যাস হতে পারে।

যাদের হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চা বা কফি গ্রহণ নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

নিয়মিত ওষুধের সময় এড়িয়ে যাওয়া

যাদের উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগের জন্য সকালে ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তাদের নির্ধারিত সময়ে ওষুধ খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া সকালে ওষুধ বাদ দেওয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

medicines

তবে কোনো ওষুধের সময় নিজে থেকে পরিবর্তন করা বা ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। চিকিৎসক যে সময় ও মাত্রা নির্ধারণ করেছেন, সেটিই অনুসরণ করতে হবে।

ঘুম থেকে উঠেই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া

অনেকেই চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে ই-মেইল, অফিসের মেসেজ বা মিটিংয়ের প্রস্তুতি শুরু করেন। এর ফলে ঘুম থেকে জেগে ওঠার স্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানসিক চাপও যুক্ত হতে পারে।

ঘুম থেকে উঠেই কাজের চাপ নেওয়া এমন একটি অভ্যাস, যা সকালের সময় শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। তাই সম্ভব হলে ঘুম থেকে ওঠার পর কয়েক মিনিট নিজের শরীরকে স্বাভাবিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সময় দেওয়া ভালো।

সকালে খুব দ্রুত সবকিছু করা ঠিক নয়

ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ দৌড়ানো, ভারী ব্যায়াম শুরু করা বা খুব দ্রুত শারীরিক পরিশ্রমে চলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ব্যায়াম না করা ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ধীরে শুরু করা ভালো।

হালকা হাঁটা, স্ট্রেচিং বা সহজ কিছু নড়াচড়া দিয়ে দিন শুরু করা যেতে পারে। এছাড়া ১০ থেকে ১৫ মিনিট হালকা হাঁটা, স্ট্রেচিং বা যোগব্যায়াম শরীরের জন্য ভালো।

তবে ব্যায়ামের ধরন ব্যক্তির বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও হৃদ্‌রোগের অবস্থার ওপর নির্ভর করে। হৃদ্‌রোগ থাকলে নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

নাশতা কি বাদ দেওয়া উচিত

সকালের নাশতা নিয়ে সবার জন্য একই নিয়ম নেই। তবে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে হালকা ও প্রোটিনসমৃদ্ধ নাশতার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশি খাবারের মধ্যে ডিম, ডাল, ছোলা, দই, দুধ, সবজি ও পূর্ণ শস্যের মতো খাবার দিয়ে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ নাশতা তৈরি করা যায়।

তবে নাশতা খেলেই হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমে যাবে, এমন প্রমাণ নেই। হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য পুরো দিনের খাদ্যাভ্যাস, ওজন, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল এবং শারীরিক সক্রিয়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সকালে হার্টের জন্য ভালো একটি রুটিন কেমন হতে পারে

সকালের রুটিন খুব জটিল করার প্রয়োজন নেই। কয়েকটি সাধারণ অভ্যাস রাখা যেতে পারে।

ঘুম থেকে উঠে পানি পান করুন: শরীরের স্বাভাবিক পানির চাহিদা পূরণে এটি সহায়ক।

কিছুটা সময় নিয়ে দিন শুরু করুন: ঘুম থেকে উঠেই কাজের চাপ না নিয়ে কয়েক মিনিট শান্তভাবে থাকার চেষ্টা করুন।

নির্ধারিত ওষুধ সময়মতো খান: চিকিৎসক যদি সকালে ওষুধ খেতে বলে থাকেন, তা নিয়ম মেনে গ্রহণ করুন।

ভারসাম্যপূর্ণ নাশতা করুন: প্রোটিন, আঁশ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি রয়েছে এমন খাবার বেছে নিতে পারেন।

হালকা নড়াচড়া করুন: হাঁটা বা স্ট্রেচিং দিয়ে দিন শুরু করা যেতে পারে, যদি তা আপনার জন্য উপযুক্ত হয়।

চা-কফি পরিমিত পান করুন: অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন, বিশেষ করে যদি এতে বুক ধড়ফড় বা রক্তচাপের সমস্যা বাড়ে।

এই ধরনের ধীর ও পরিকল্পিত সকালের রুটিন আমাদের সকলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু সকালের অভ্যাস নয়, আসল বিষয় হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি

সকালের কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করা ভালো হলেও হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধের বিষয়টি শুধু সকালের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং পারিবারিক ইতিহাস হৃদ্‌রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

heart attack

তাই সকালে পানি পান করা বা চা খাওয়ার আগে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি।

সকালের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি মানে কি সবাইকে ভয় পেতে হবে

না। গবেষণায় সকালে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বেশি হওয়ার একটি প্রবণতা দেখা গেলেও এর অর্থ এই নয় যে দিনের অন্য সময়ে হার্ট অ্যাটাক হয় না। আবার সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর কিছুক্ষণ চা খেলে বা নাশতা দেরিতে করলে কারও হার্ট অ্যাটাক হবেই, এমন ধারণাও ভুল।

বরং বিষয়টি বোঝা দরকার এভাবে, ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক পরিবর্তনের কারণে হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর কিছুটা বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। আগে থেকেই হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই সময় অতিরিক্ত শারীরিক বা মানসিক চাপ এড়িয়ে চলা যুক্তিসংগত।

বুকে ব্যথা হলে সময় নষ্ট নয়

সকালে হোক বা দিনের অন্য সময়ে, বুকে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমিভাব, মাথা ঘোরা বা ব্যথা হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড় কিংবা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়।

হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসর্গ শুরু হওয়ার পর নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার বদলে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া নিরাপদ।

সকালের সময় হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য তুলনামূলক সংবেদনশীল হতে পারে। তাই ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ ব্যস্ততার মধ্যে না গিয়ে শরীরকে কিছুটা সময় দেওয়া, পানি পান করা, প্রয়োজনীয় ওষুধ সময়মতো নেওয়া এবং হালকা নড়াচড়া দিয়ে দিন শুরু করা ভালো অভ্যাস। তবে এসব অভ্যাস কোনোভাবেই হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা বা প্রতিরোধের বিকল্প নয়। দীর্ঘমেয়াদে রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, ওজন ও জীবনযাপন নিয়ন্ত্রণ করাই হৃদ্‌স্বাস্থ্য ভালো রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সূত্র: বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড