নিয়মিত কফি পানকারীদের নিয়ে গবেষণায় চমক

সকালের ঘুম ঘুম চোখে এক কাপ কফি অনেকেরই দিনের শুরুটা সহজ করে দেয়। ক্লান্তি কাটাতে কিংবা কাজের মাঝে সতেজ থাকতে কফির জনপ্রিয়তা অনেক দিন ধরেই। এবার নতুন এক গবেষণায় কফি নিয়ে আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য সামনে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত বেশি কফি পান করেন, তাদের শরীরে মোট চর্বি ও পেটের ভেতরের ক্ষতিকর চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক কম এবং কঙ্কালের পেশির পরিমাণ কিছুটা বেশি হতে পারে।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। গবেষণাটি কফি পান এবং শরীরের গঠনের মধ্যে একটি সম্পর্ক দেখিয়েছে, কিন্তু কফি পান করলেই যে চর্বি কমে যাবে বা পেশি বাড়বে, তা প্রমাণ করেনি। তাই ওজন কমানোর উপায় হিসেবে শুধু কফির ওপর নির্ভর করা ঠিক হবে না।
ফিনল্যান্ডের ওউলু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২ হাজার ২৬৪ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। অংশগ্রহণকারীদের সবার বয়স ছিল ৪৬ বছর এবং তারা নর্দার্ন ফিনল্যান্ড বার্থ কোহর্ট ১৯৬৬-এর অংশ ছিলেন।
গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের কফি পানের অভ্যাসের সঙ্গে শরীরের গঠন, রক্তের বিভিন্ন উপাদান, রক্তে শর্করা ও ইনসুলিনের মাত্রা এবং যৌন হরমোনের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। দেখা যায়, যারা বেশি কফি পান করতেন, তাদের শরীরে মোট চর্বি এবং পেটের ভেতরের চর্বি তুলনামূলক কম ছিল। একই সঙ্গে তাদের কঙ্কালের পেশির পরিমাণও বেশি দেখা গেছে।
মজার বিষয় হলো, বিভিন্ন দলের মানুষের দেহসূচক বা বিএমআইয়ের মধ্যে খুব বড় পার্থক্য ছিল না। অর্থাৎ একই বিএমআই থাকা দুজন মানুষের একজনের শরীরে তুলনামূলক বেশি চর্বি এবং অন্যজনের বেশি পেশি থাকতে পারে। শুধু বিএমআই দিয়ে শরীরে চর্বি ও পেশির প্রকৃত অনুপাত বোঝা যায় না।
কফি কি সত্যিই চর্বি পোড়ায়?
কফিতে থাকা ক্যাফেইন স্নায়ুতন্ত্র এবং শরীরের শক্তি ব্যবহারের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। আগের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যাফেইন শরীরের শক্তি খরচ সামান্য বাড়াতে এবং ক্ষুধা ও চর্বি বিপাকের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন গবেষণার ফলও কফি পানের সঙ্গে তুলনামূলক কম শরীরের চর্বির সম্পর্ক দেখিয়েছে। কিন্তু গবেষণাটি এমনভাবে করা হয়নি, যাতে নিশ্চিতভাবে বলা যায় কফি পান করাই শরীরের চর্বি কমিয়েছে। গবেষকেরা একটি নির্দিষ্ট সময়ে মানুষের কফি পানের অভ্যাস ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তাই এখানে সম্পর্ক পাওয়া গেছে, কারণ ও ফলাফলের সরাসরি প্রমাণ নয়।
অর্থাৎ সকালে এক কাপ কফি পান করলেই পেটের মেদ গলতে শুরু করবে, এমনটা ভাবা ঠিক হবে না।
পেশি বাড়াতেও কি সাহায্য করে?
গবেষণার আরেকটি উল্লেখযোগ্য ফল হলো, বেশি কফি পানকারীদের কঙ্কালের পেশির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কফি নিজেই পেশি তৈরি করে। পেশি বাড়ানোর জন্য নিয়মিত শরীরচর্চা, বিশেষ করে শক্তিবর্ধক ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। নতুন গবেষণায় কফি পান এবং পেশির পরিমাণের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে, কিন্তু কফি সরাসরি পেশির বৃদ্ধি ঘটায় এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তাই কেউ যদি পেশি বাড়ানোর জন্য ব্যায়াম না করে শুধু কফি পান করতে শুরু করেন, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
রক্তের কিছু উপাদানেও পরিবর্তন
গবেষকেরা শুধু শরীরের চর্বি ও পেশি নয়, রক্তের বিভিন্ন বিপাকীয় উপাদানও পরীক্ষা করেছেন। বেশি কফি পানের সঙ্গে রক্তে কিছু শাখাযুক্ত অ্যামাইনো অ্যাসিডের মাত্রা কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
লিউসিন, আইসোলিউসিন ও ভ্যালিনের মতো এসব অ্যামাইনো অ্যাসিড শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়। তবে রক্তে এগুলোর মাত্রা দীর্ঘদিন বেশি থাকার সঙ্গে ইনসুলিন প্রতিরোধ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সম্পর্ক আগের গবেষণায় পাওয়া গেছে।
পুরুষদের ক্ষেত্রে বেশি কফি পানের সঙ্গে রক্তে শর্করা ও ইনসুলিনের তুলনামূলক অনুকূল বৈশিষ্ট্যের সম্পর্কও দেখা গেছে। তবে এসব ফলাফল থেকেও কফিকে কোনো রোগ প্রতিরোধের উপায় হিসেবে ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া যায় না।
হরমোনের সঙ্গেও সম্পর্ক পাওয়া গেছে
গবেষণায় কফি পানের সঙ্গে কিছু যৌন হরমোনের পরিবর্তনের সম্পর্কও দেখা গেছে। বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে বেশি কফি পানের সঙ্গে মোট টেস্টোস্টেরন এবং জৈবিকভাবে সক্রিয় টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বেশি থাকার সম্পর্ক পাওয়া যায়। একই সঙ্গে কিছু অন্যান্য হরমোন সূচকেও পরিবর্তন দেখা গেছে।
নারীদের ক্ষেত্রেও কিছু হরমোনের সূচকের সঙ্গে কফি পানের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এসব ফলাফল দেখে হরমোন বাড়ানো বা কমানোর জন্য কফি পান করা উচিত নয়। গবেষণাটি এমন কোনো চিকিৎসা পরামর্শ দেয় না।
তাহলে কি ওজন কমাতে কফি খাবেন?
কফি ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে কি না, তা নিয়ে আগেও বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় কফি পানের সঙ্গে শরীরের কম চর্বি বা দীর্ঘমেয়াদে ওজন বৃদ্ধির তুলনামূলক কম প্রবণতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে ফলাফল সব গবেষণায় একরকম নয় এবং কারণ ও ফলাফলের সম্পর্কও নিশ্চিত নয়।
তাই ওজন কমানোর ক্ষেত্রে কফিকে মূল উপায় হিসেবে না দেখে একটি সাধারণ পানীয় হিসেবেই দেখা ভালো। ওজন কমাতে হলে মোট ক্যালরি গ্রহণ, খাবারের মান, শারীরিক পরিশ্রম, ঘুম এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের দিকে নজর দিতে হবে।
কফি খাওয়ার সময় যে বিষয়টি খেয়াল রাখবেন
কফির উপকারের কথা শুনে কাপে কাপে চিনি, ক্রিম বা মিষ্টি সিরাপ মিশিয়ে খেলে কিন্তু হিসাবটা বদলে যেতে পারে। এক কাপ কালো কফি এবং প্রচুর চিনি, দুধ বা মিষ্টি উপকরণ দেওয়া কফি শরীরের জন্য একই ধরনের পানীয় নয়।
কফি খেলে চিনি কম ব্যবহার করা ভালো। বিশেষ করে যারা ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চান, তারা অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি উপকরণ এড়িয়ে চলতে পারেন।
আর কফি বেশি খেলেই বেশি উপকার হবে, এমন কোনো প্রমাণও নেই। অতিরিক্ত ক্যাফেইন ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা বা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই নিজের সহনশীলতা অনুযায়ী পরিমাণ ঠিক করা গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন গবেষণায় নিয়মিত কফি পানের সঙ্গে কম শরীরের চর্বি, কম পেটের ভেতরের চর্বি এবং বেশি কঙ্কালের পেশির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। পাশাপাশি রক্তের কিছু বিপাকীয় উপাদান ও হরমোনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের সম্পর্ক দেখা গেছে।
তবে গবেষণাটি পর্যবেক্ষণমূলক। ফলে কফিই এসব পরিবর্তনের কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। বরং ফলাফলটি কফি, বিপাকক্রিয়া এবং শরীরের গঠনের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে গবেষণার সুযোগ তৈরি করেছে।
তাই ওজন কমানোর আশায় হঠাৎ করে বেশি কফি পান শুরু করার দরকার নেই। পরিমিত কফি, কম চিনি, সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম, এই সমন্বয়ই সুস্থ শরীর ও স্বাস্থ্যকর ওজন ধরে রাখার বেশি কার্যকর পথ।
সূত্র: এনডিটিভি



