Advertisement

চোখ ও মুখ সব সময় শুষ্ক লাগে, নারীদের এই লক্ষণ অবহেলা করা ঠিক নয়

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
চোখ ও মুখ সব সময় শুষ্ক লাগে, নারীদের এই লক্ষণ অবহেলা করা ঠিক নয়

চোখে যেন সব সময় বালি ঢুকে আছে। একটু পরপর চোখ চুলকাচ্ছে বা জ্বালা করছে। মুখও শুকিয়ে থাকে, পানি না খেলে অস্বস্তি হয়। অনেকেই এসব সমস্যাকে আবহাওয়া, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, কম পানি খাওয়া কিংবা বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্বাভাবিক পরিবর্তন বলে ধরে নেন।

Advertisement

কিন্তু চোখ ও মুখের শুষ্কতা যদি নিয়মিত থাকে এবং এর সঙ্গে অস্বাভাবিক ক্লান্তি, গাঁটে ব্যথা বা অন্য কিছু শারীরিক সমস্যা যোগ হয়, তাহলে বিষয়টি একটু গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। কারণ কখনো কখনো এসব লক্ষণ শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থার একটি জটিল রোগের ইঙ্গিত হতে পারে। এর নাম শোগ্রেন রোগ (Sjögren’s disease)।

এই রোগ সম্পর্কে জানা জরুরি, বিশেষ করে নারীদের জন্য। কারণ পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে শোগ্রেন রোগ হওয়ার প্রবণতা অনেকটাই বেশি।

শোগ্রেন রোগ কী?

শোগ্রেন একটি স্বয়ংক্রিয় প্রতিরোধজনিত রোগ। সাধারণত শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা জীবাণু ও ক্ষতিকর পদার্থের বিরুদ্ধে লড়াই করে। কিন্তু এই রোগে প্রতিরোধব্যবস্থা ভুল করে শরীরের নিজের সুস্থ কোষ ও টিস্যুকে আক্রমণ করতে শুরু করে।

বিশেষ করে চোখের পানি তৈরি করা গ্রন্থি এবং মুখে লালা তৈরি করা গ্রন্থি আক্রান্ত হয়। ফলে চোখে পর্যাপ্ত পানি ও মুখে পর্যাপ্ত লালা তৈরি হয় না। এর ফলেই দেখা দেয় চোখ ও মুখের দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা।

তবে রোগটি শুধু চোখ ও মুখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। শরীরের অন্য অঙ্গও আক্রান্ত হতে পারে।

চোখ শুকিয়ে গেলে কেমন লাগে?

শুষ্ক চোখের সমস্যা হলে শুধু চোখে পানি কমে যাওয়াই নয়, আরও কিছু অস্বস্তি হতে পারে।

চোখে জ্বালা করা, চুলকানো, লাল হয়ে যাওয়া কিংবা মনে হওয়া চোখের ভেতর যেন বালুকণা আটকে আছে, এমন অনুভূতি হতে পারে। কারও কারও দৃষ্টিও কিছুটা ঝাপসা হয়ে যেতে পারে। উজ্জ্বল আলো সহ্য করতেও সমস্যা হতে পারে।

অনেকক্ষণ মুঠোফোন বা কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকলেও চোখ শুকিয়ে যেতে পারে। তাই শুধু চোখ শুষ্ক হলেই শোগ্রেন রোগ হয়েছে, এমন ভাবার কারণ নেই।

কিন্তু শুষ্কতা যদি দীর্ঘদিন থাকে এবং সাধারণ যত্নের পরও না কমে, তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।

মুখ সব সময় শুকিয়ে থাকার কারণ কী?

মুখ শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ধূমপান, কিছু রোগ কিংবা শরীরে পানিশূন্যতার কারণে এমন হতে পারে।

শোগ্রেন রোগের ক্ষেত্রে মুখের শুষ্কতা সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয়। মুখের ভেতর আঠালো বা শুকনো অনুভূতি হতে পারে। জিহ্বা ও গলা শুকিয়ে যেতে পারে। খাবার চিবানো, গিলতে কিংবা কথা বলতেও অস্বস্তি হতে পারে।

লালা কমে যাওয়ার আরেকটি সমস্যা হলো দাঁত ও মাড়ির স্বাভাবিক সুরক্ষা কমে যায়। ফলে দাঁতে ক্ষয়, মাড়ির সমস্যা ও মুখে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

শুধু শুষ্ক চোখ ও মুখ নয়

শোগ্রেন রোগকে অনেকে শুধু চোখ ও মুখের সমস্যা মনে করেন। আসলে বিষয়টি তার চেয়ে বড়।

এই রোগে দীর্ঘদিনের ক্লান্তি, গাঁট ও পেশিতে ব্যথা, ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, ত্বকে ফুসকুড়ি, হাত-পায়ে ঝিনঝিন বা অবশভাব, দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশি এবং শরীরের অন্য অংশে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কিছু রোগীর ফুসফুস, কিডনি, স্নায়ু, রক্তনালি বা অন্য অঙ্গও আক্রান্ত হতে পারে। তবে এসব জটিলতা সবার হয় না।

তাই শুধু একটি লক্ষণ নয়, একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

নারীদের মধ্যে বেশি কেন?

শোগ্রেন রোগ নারী ও পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। তবে নারীদের মধ্যে এটি অনেক বেশি দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দন্ত ও মুখগহ্বর গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, পুরুষের তুলনায় নারীদের শোগ্রেন রোগ হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নয় গুণ বেশি।

কেন নারীদের মধ্যে এত বেশি দেখা যায়, তার সঠিক উত্তর এখনো জানা যায়নি। গবেষকেরা মনে করেন, বংশগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশগত কিছু কারণ এবং হরমোনের প্রভাব একসঙ্গে ভূমিকা রাখতে পারে।

সাধারণত মধ্য বয়সের পর রোগটি শনাক্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি হলেও শুধু এই বয়সেই হবে, এমন নয়।

কী কারণে এই রোগ হয়?

শোগ্রেন রোগের একটি নির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি।

গবেষকদের ধারণা, বংশগত প্রবণতা এবং পরিবেশগত কিছু কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের পর শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন শুরু হতে পারে বলেও ধারণা করা হয়।

তবে কোনো সংক্রমণ হলেই শোগ্রেন রোগ হবে, এমন নয়।

অন্য রোগের সঙ্গেও থাকতে পারে

শোগ্রেন রোগ কখনো একাই দেখা দিতে পারে। আবার কারও আগে থেকেই অন্য কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রতিরোধজনিত রোগ থাকলে তার সঙ্গেও এটি দেখা দিতে পারে।

যেমন বাতের একটি নির্দিষ্ট ধরনের রোগ বা লুপাসের সঙ্গে শোগ্রেন রোগ থাকতে পারে।

এ কারণেই রোগ শনাক্ত করার সময় চিকিৎসক শুধু চোখ ও মুখের শুষ্কতার দিকে তাকান না। রোগীর অন্য শারীরিক সমস্যাগুলোর কথাও জানতে চান।

কীভাবে বোঝা যায় শোগ্রেন রোগ হয়েছে?

শোগ্রেন রোগ শনাক্ত করার জন্য একটি মাত্র পরীক্ষা নেই। চিকিৎসক প্রথমে রোগীর লক্ষণ, কত দিন ধরে সমস্যা হচ্ছে এবং অন্য কোনো রোগ বা ওষুধ ব্যবহারের ইতিহাস জানতে চান।

এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েক ধরনের পরীক্ষা করা হতে পারে। রক্ত পরীক্ষা, চোখে কতটা পানি তৈরি হচ্ছে তা পরীক্ষা এবং মুখে কতটা লালা তৈরি হচ্ছে তা পরিমাপ করা হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে লালাগ্রন্থির ছবি তোলার পরীক্ষা বা ছোট একটি টিস্যু পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

তাই দীর্ঘদিনের শুষ্কতা থাকলে নিজের মতো করে রোগের নাম ধরে নেওয়ার বদলে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করানোই ভালো।

এর কি চিকিৎসা আছে?

বর্তমানে শোগ্রেন রোগ পুরোপুরি সারিয়ে দেওয়ার নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে এর লক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং রোগের কারণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে যে সমস্যা তৈরি হয়, সেগুলোর চিকিৎসা করা যায়।

চোখের শুষ্কতার জন্য কৃত্রিম চোখের পানি ব্যবহার করা যেতে পারে। মুখের শুষ্কতার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পানি পান, লালা তৈরিতে সাহায্য করে এমন কিছু ওষুধ বা লালার বিকল্প ব্যবহার করা হয়।

যদি শরীরের অন্য অঙ্গ আক্রান্ত হয়, তাহলে চিকিৎসক পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রদাহ কমানোর বা প্রতিরোধব্যবস্থার অস্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের ওষুধ দিতে পারেন।

মুখের যত্ন নেওয়া কেন জরুরি?

মুখে লালা শুধু মুখ ভেজা রাখে না। এটি খাবার গিলতে সাহায্য করে, মুখ পরিষ্কার রাখতে ভূমিকা রাখে এবং দাঁতকে ক্ষয় থেকে কিছুটা রক্ষা করে।

তাই দীর্ঘদিন মুখ শুকিয়ে থাকলে দাঁতের যত্নে বাড়তি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করা, দাঁতের ফাঁক পরিষ্কার করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পানি পান করাও সাহায্য করতে পারে। চিনি ছাড়া চুইংগাম লালা তৈরিতে কিছুটা সহায়তা করতে পারে।

চোখের শুষ্কতা কমাতে কী করবেন?

চোখ শুষ্ক লাগলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চোখে দেওয়ার কৃত্রিম পানি ব্যবহার করা যেতে পারে।

পর্দা বা মুঠোফোনের দিকে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকলে মাঝেমধ্যে চোখের পাতা ফেলার কথা মনে রাখা দরকার। সরাসরি বাতাস, ধোঁয়া ও অতিরিক্ত শুষ্ক পরিবেশ থেকেও চোখকে রক্ষা করা ভালো।

তবে চোখে দীর্ঘদিন শুষ্কতা থাকলে শুধু নিজের মতো করে চোখের ওষুধ ব্যবহার না করে চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

কখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন?

মাঝেমধ্যে চোখ বা মুখ শুকিয়ে যাওয়া খুব সাধারণ বিষয়। গরমে, দীর্ঘ সময় পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলে, পর্যাপ্ত পানি না খেলে কিংবা কিছু ওষুধের কারণে এমন হতে পারে। তাই একবার চোখ শুকিয়ে গেলেই শোগ্রেন রোগ নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।

কিন্তু যদি দীর্ঘদিন ধরে চোখ ও মুখ দুটোই শুষ্ক থাকে এবং এর সঙ্গে নিচের লক্ষণগুলোর কয়েকটি থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো-

  • অস্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি
  • গাঁট বা পেশিতে ব্যথা
  • বারবার দাঁতে ক্ষয় বা মুখে সংক্রমণ
  • লালাগ্রন্থি ফুলে যাওয়া
  • দীর্ঘদিনের শুকনো কাশি
  • হাত-পায়ে ঝিনঝিন বা অবশভাব
  • ত্বকের অস্বাভাবিক শুষ্কতা
  • শ্বাস নিতে সমস্যা

এসব লক্ষণ থাকলেই শোগ্রেন রোগ হয়েছে, এমন নয়। তবে একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে থাকলে কারণ খুঁজে দেখা জরুরি।

অবহেলা না করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

চোখ শুকিয়ে যাচ্ছে, মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে, ক্লান্ত লাগছে, গাঁটে ব্যথা হচ্ছে, এমন কয়েকটি সমস্যাকে আলাদা আলাদা করে দেখলে হয়তো প্রতিটিরই সাধারণ কোনো কারণ মনে হতে পারে।

কিন্তু একই সময়ে এসব সমস্যা বারবার হতে থাকলে সবগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

শোগ্রেন রোগের ক্ষেত্রে যত তাড়াতাড়ি সমস্যা শনাক্ত করা যায়, তত দ্রুত লক্ষণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনীয় অঙ্গগুলোর সুরক্ষার ব্যবস্থা করা সম্ভব। বর্তমানে এই রোগ পুরোপুরি সারানোর চিকিৎসা না থাকলেও যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

সব সময় চোখ ও মুখ শুকিয়ে থাকা মানেই শোগ্রেন রোগ নয়। এর পেছনে পানিশূন্যতা, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, পরিবেশ কিংবা আরও অনেক সাধারণ কারণ থাকতে পারে।

তবে চোখ ও মুখের শুষ্কতা যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে এবং এর সঙ্গে অস্বাভাবিক ক্লান্তি, গাঁটে ব্যথা, দাঁতের সমস্যা বা শরীরের অন্য কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ যোগ হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।

বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে শোগ্রেন রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তাই শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনকে ভয় পাওয়ার দরকার নেই, কিন্তু দীর্ঘদিনের অস্বাভাবিক লক্ষণকে স্বাভাবিক ভেবে এড়িয়ে যাওয়াও উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কারণটি খুঁজে বের করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া