Advertisement
স্মার্টফোনে রক্তশূন্যতা শনাক্তকরণ

ডিএনএ হ্যাক ফর হেলথ চট্টগ্রামে চ্যাম্পিয়ন ‘হেমো হ্যাকার্স’

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ডিএনএ হ্যাক ফর হেলথ চট্টগ্রামে চ্যাম্পিয়ন ‘হেমো হ্যাকার্স’
ছবি: সংগৃহীত

আঙুলের ভিডিও বিশ্লেষণ করে রক্তের হিমোগ্লোবিন মাত্রা নির্ণয়ে এআই-চালিত সমাধান উপস্থাপন করে ডিএনএ হ্যাক ফর হেলথে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের দল ‘হেমো হ্যাকার্স’। প্রথম রানার-আপ হয়েছে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজের ‘রেটোরিক মাইন্ডস’, যারা ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াই রোগীর জরুরি তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবহারের উপযোগী কিউআর-ভিত্তিক স্বাস্থ্য পরিচয় ব্যবস্থা তৈরি করেছে।

সেকেন্ড রানার-আপ হয়েছে বিএআইইউএসটি-র আরেকটা টিম, যারা স্ট্রোক ও পার্কিনসন রোগীদের হাঁটার ধরন পর্যবেক্ষণে এআই-চালিত পুনর্বাসন প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ করেছে। এই তিনটি দলই ঢাকায় অনুষ্ঠেয় ন্যাশনাল গ্র্যান্ড ফিনালেতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।

ডিএনএ হেলথ কমিউনিকেশনের প্রতিষ্ঠাতা এস এম ও নাওয়েদ বলেন, ডিএনএ হেলথ-এ আমাদের একটি লক্ষ্য হলো ক্লিনিক্যাল দক্ষতা এবং প্রযুক্তির মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করা। চট্টগ্রামের তরুণ উদ্ভাবকদের এই বিশ্বমানের এআই সমাধানগুলো প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। আমরা কেবল একটি হ্যাকথন আয়োজন করছি না, বরং এমন একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করছি যেখানে প্রযুক্তি ও মানবিকতার ছোঁয়ায় দেশের প্রতিটি প্রান্তে স্মার্ট এবং সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।

চিটাগাং মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ জশিম উদ্দিন বলেন, স্বাস্থ্যখাতে টেকসই পরিবর্তন আনতে হলে শিক্ষার্থীদের শুধু ক্লিনিশিয়ান নয়, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনমনস্ক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। এই হ্যাকাথন সেই পথেরই একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ। অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. মো. আবদুর রব।

প্লেনারি সেশনে অংশ নেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সুমিত মজুমদার, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তারেক শামস, মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. মো. আবদুস সাত্তার, মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আবু সাঈদ, ক্যাজুয়ালটি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. রিভু রাজ চক্রবর্তী এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রধান এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মাসুদ করিম।

ড. সুমিত মজুমদার বলেন, আমাদের প্রযুক্তি-চালিত হওয়া উচিত নয়; বরং আমাদের প্রযুক্তি-সহায়তা পাওয়া উচিত। একই সাথে তিনি মন্তব্য করেন যে, এবং নীতিগত জটিলতা এবং প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর রিসার্চে বিনিয়োগ না করা। স্বাস্থ্যখাতের প্রায় ৭০ ভাগ ব্যবসা প্রাইভেট খাতে থাকে হলেও গবেষণা ও উদ্ভাবনী বিনিয়োগে তাদের অবদান প্রায় নেই বললেই চলে।

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মাসুদ করিম বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় এ-আইর জন্য বিএমডিসির মতো একটি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন। আমাদের দেশে এখনো শক্তিশালী ডেটা সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। রোবোটিক সার্জারির ক্ষেত্রে আমাদের যন্ত্রপাতি ও ক্রয় সক্ষমতা থাকলেও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অভাব রয়েছে।

প্যানেল আলোচনায় সব বক্তা একমত হন যে, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি ও এআইর জন্য একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জরুরি, ভবিষ্যতের চিকিৎসকদের প্রকৌশলমনা হতে হবে এবং এমবিবিএস পাঠ্যক্রমে ডেটা সায়েন্সের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

ডিএনএ হেলথ কমিউনিকেশনের প্রতিষ্ঠাতা এস এম ও নাওয়েদ বলেন, চট্টগ্রামের বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনা ছিল স্পষ্ট। আমাদের চিকিৎসা পাঠ্যক্রমকে অবশ্যই ডেটা সায়েন্স অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিকশিত করতে হবে এবং স্বাস্থ্যসেবায় এআই-এর জন্য আমাদের জরুরিভাবে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রয়োজন। ডিএনএ হ্যাক ফর হেলথ ঠিক এই ঘাটতিগুলো তুলে ধরার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। আমরা শুধু একটি হ্যাকাথন আয়োজন করছি না; আমরা একটি প্রয়োজনীয় জাতীয় সংলাপ শুরু করছি। হেমো হ্যাকার্স এবং অন্যদের চমৎকার সমাধানগুলো দেখিয়েছে যে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাথে প্রকৌশলকে একত্রিত করলে কী সম্ভব—এখন, এই ব্যবস্থাকে অবশ্যই সেগুলোকে সমর্থন করার জন্য খাপ খাইয়ে নিতে হবে।

ড. মো. আবদুস সাত্তার প্লেনারি সেশনে বলেন, আমরা যদি এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতিগুলো আমাদের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হই, তাহলে বিশ্বের থেকে পিছিয়ে পড়ব। রোগ নির্ণয় ও ক্লিনিকাল দক্ষতা কখনো সম্পূর্ণরূপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যাবে না। প্রেক্ষাপট ও ব্যবস্থাপনা নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে শিক্ষার্থীরা যেভাবে উদ্ভাবনী ধারণা নিয়ে এগিয়ে আসছে, তা সত্যিই আমাদের অনুপ্রাণিত করে। ডাক্তারদেরও প্রকৌশল বুঝতে হবে।

ডিজিএইচএস ও এমআইএসের সিনিয়র কনসালট্যান্ট মুহাম্মদ আসিফ আতিক বলেন, আমাদের দেশের সীমানার বাইরে তাকিয়ে দেশব্যাপী স্বাস্থ্য সমস্যা চিহ্নিত করার জন্য বৃহত্তর প্রজেক্টের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো দেশগুলো থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে স্থানীয় সমস্যার বৈশ্বিক সমাধান বের করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নতুন উদ্যোগ নেয়ার আগে বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সম্পদ এবং জাতীয় সক্ষমতা সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে হবে।

ডিএনএ হেলথ কমিউনিকেশন জানিয়েছে, এ বছর দেশের প্রতিটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজে এই হ্যাকাথন ছড়িয়ে পড়বে। শুধু প্রযুক্তি নয়, স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিক সুস্থতার কথা মাথায় রেখে বছরজুড়ে আয়োজন করা হবে ওয়াকথন, ম্যারাথন, আর্ট ও ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী এবং বিশেষ স্ট্যান্ডআপ কমেডি শো। প্রযুক্তি ও মানবিক সংযোগের এই সমন্বয়ে বাংলাদেশ স্বাস্থ্যসেবায় লিখতে চলেছে এক নতুন অধ্যায়।

বিষয় :asiapost