logo

স্তন ক্যানসার নিয়ে ৫ ভুল ধারণা ডেকে আনতে পারে বিপদ

স্তন ক্যানসার নিয়ে ৫ ভুল ধারণা ডেকে আনতে পারে বিপদ
ছবি: কস্ট

স্তন ক্যানসার নিয়ে অনেকের মনে নানা ভয় ও ভুল ধারণা আছে। কেউ কেউ মনে করেন, পরিবারে কারও এই রোগ না থাকলে তার আর ঝুঁকি নেই। আবার কেউ ভাবেন, স্তনে কোনো গাঁট হলে তা ব্যথা না করা পর্যন্ত চিন্তার কারণ নেই। এসব ধারণার কারণে অনেক সময় চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি হয়ে যায়।

বাস্তবে, স্তন ক্যানসার যেকোনো বয়সের নারী বা পুরুষের হতে পারে। পরিবারে এই রোগের ইতিহাস না থাকলেও ঝুঁকি একেবারে বাদ দেওয়া যায় না। আবার স্তনে গাঁট হলেই সেটি ক্যানসার, এমনটাও না। তাই ভয় বা অনুমানের ওপর নির্ভর না করে লক্ষণ সম্পর্কে জানা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

স্তন ক্যানসার নিয়ে ৫টি প্রচলিত ভুল ধারণা

পরিবারে স্তন ক্যানসারের ইতিহাস না থাকলে এই রোগ হয় না

এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। পরিবারে কারও স্তন ক্যানসার না থাকলেও এই রোগ হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। এ ছাড়া কিছু জিনগত পরিবর্তন, ব্যক্তিগত চিকিৎসার ইতিহাস ও জীবনযাপনের বিভিন্ন বিষয়ও এর ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত অধিকাংশ নারীর পরিবারে এই রোগের পরিচিত ইতিহাস থাকে না। তাই পরিবারের কেউ আক্রান্ত হননি বলে নিজের ঝুঁকি নেই, এমনটা ভাবা ঠিক না।

ডিওডোরেন্ট বা অ্যান্টিপারস্পিরেন্ট ব্যবহার করলে স্তন ক্যানসার হয়

অনেকে মনে করেন, বগলে ডিওডোরেন্ট বা ঘাম কমানোর পণ্য ব্যবহার করলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। কিন্তু এসব পণ্য ব্যবহারের সঙ্গে স্তন ক্যানসারের যোগসূত্র আছে, এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

তাই শুধু এই আশঙ্কায় ডিওডোরেন্ট ব্যবহার বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। তবে কোনো পণ্য ব্যবহারে ত্বকে জ্বালা, চুলকানি বা অ্যালার্জি হলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

কম বয়সী নারীদের স্তন ক্যানসার হয় না

স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বয়স বাড়ার সঙ্গে বাড়লেও কম বয়সেও এই রোগ হতে পারে। ২০, ৩০ বা ৪০ বছর বয়সী নারীরাও স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারেন।

তাই কম বয়স বলে স্তনে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তনকে অবহেলা করা ঠিক না। স্তনে নতুন গাঁট, ত্বকে টান বা গর্তের মতো পরিবর্তন, স্তনবৃন্তের আকারে পরিবর্তন অথবা অস্বাভাবিক স্রাব দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

মনে রাখতে হবে, এসব লক্ষণ দেখা দিলেই ক্যানসার হয়েছে, এমনটাও না। তবে কারণ নিশ্চিত করতে পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

ম্যামোগ্রাম করলে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে

ম্যামোগ্রাম হলো এক ধরনের এক্স-রে পরীক্ষা। এর মাধ্যমে স্তনের ভেতরের অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন শনাক্ত করা যায়। এই পরীক্ষা নিয়ে ভয় থাকার কারণে অনেকে প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং করাতে চান না।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ম্যামোগ্রামকে স্তন ক্যানসার শনাক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই পরীক্ষায় অল্প মাত্রার এক্স-রে রশ্মি ব্যবহার করা হয়। ম্যামোগ্রাম করলে আগে থেকে থাকা স্তন ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে, এমন প্রমাণ নেই।

পরীক্ষার সময় স্তন সাময়িকভাবে চাপ দিয়ে রাখা হয় বলে কিছুটা অস্বস্তি হতে পারে। তবে কার কখন ম্যামোগ্রাম করা প্রয়োজন, তা বয়স, ব্যক্তিগত ঝুঁকি ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা উচিত।

স্তনে গাঁট হলেই ক্যানসার

স্তনে গাঁট অনুভব করলে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। তবে স্তনে সব গাঁট ক্যানসার না। সিস্ট, ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা অথবা হরমোনের পরিবর্তনের কারণেও গাঁট তৈরি হতে পারে।

কিন্তু শুধু হাত দিয়ে পরীক্ষা করে গাঁটটি ক্যানসার কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না। এজন্য চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আলট্রাসনোগ্রাম, ম্যামোগ্রাম বা বায়োপসির পরামর্শ দিতে পারেন।

বিশেষ করে নতুন কোনো গাঁট দেখা দিলে, ব্যথা না থাকলেও সেটি অবহেলা করা ঠিক না। মনে রাখবেন, দ্রুত চিকিৎসকের কাছে গেলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।

স্তন ক্যানসারের যেসব লক্ষণ খেয়াল রাখবেন

স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে সব সময় স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। তবে শরীরে নিচের পরিবর্তনগুলো খেয়াল রাখা জরুরি-

  • স্তনে বা বগলে নতুন গাঁট বা অস্বাভাবিক পুরু অংশ তৈরি হওয়া
  • স্তনের আকার বা আকৃতিতে পরিবর্তন আসা
  • স্তনের ত্বকে গর্ত, টান, লালচে ভাব বা অন্য অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেওয়া
  • স্তনবৃন্তের আকার বা অবস্থানে পরিবর্তন হওয়া
  • স্তনবৃন্ত থেকে অস্বাভাবিক তরল বা রক্ত বের হওয়া

এসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, লক্ষণ না থাকলেও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী স্ক্রিনিং প্রয়োজন হতে পারে। নিজে স্তন পরীক্ষা করে শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা ভালো, তবে এটি চিকিৎসকের পরীক্ষা বা প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিংয়ের বিকল্প নয়।

স্তন ক্যানসার নিয়ে ভুল ধারণা ও অযথা ভয় অনেক সময় রোগ শনাক্ত করতে দেরি করায়। পরিবারে রোগের ইতিহাস না থাকলেও ঝুঁকি থাকতে পারে, কম বয়সেও এই রোগ হতে পারে এবং স্তনে গাঁট হলেই যে ক্যানসার হবে, এমন নয়।

তাই শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সঠিক তথ্য জানা, প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করানো এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা স্তন ক্যানসার মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সূত্র: ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়াতে ‘Breast cancer: 5 myths oncologists wish would disappear’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।