দুশ্চিন্তার কারণেও হতে পারে পেটের সমস্যা, বলছে চিকিৎসাবিজ্ঞান

আমরা যখন প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকি, তখন তার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়ে কিন্তু আমাদের পেটের ওপর। অনেক সময় আমরা পেটের সমস্যার জন্য উল্টোপাল্টা খাবার বা বাইরের জাংক ফুডকে দোষ দিই। অথচ এর পেছনে দায়ী থাকতে পারে আমাদের মনের ভেতর জমা হওয়া স্ট্রেস বা দুশ্চিন্তা। আমরা কখনও এই বিষয়টি নিয়ে হয়তো ভাবিই না।
আবার, গ্যাস্ট্রিক বা বদহজমের সমস্যাকে অনেকে সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন। খুব বেশি হলে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেয়ে নেন। অনেক সময় এটি সাধারণ কোনো গ্যাস্ট্রিক না হয়ে, ‘ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম’ (আইবিএস) - এর লক্ষণও হতে পারে। অনেকের কাছে এটি নতুন মনে হতে পারে। এই বিষয়গুলো নিয়ে চলুন জেনে নেওয়া যাক-
পাকস্থলীকে মানুষের ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’ বলা হয় কেন?
চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা কিন্তু পাকস্থলীকে মানুষের ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’ বলে থাকেন। আমাদের মাথা বা প্রধান মস্তিষ্কের সঙ্গে পেটের একটি গভীর সম্পর্ক বা যোগাযোগ আছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘গাট-ব্রেইন অ্যাক্সিস’।

যখনই আপনি কোনো কারণে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন, আপনার মস্তিষ্ক সরাসরি পাকস্থলীতে সেই সিগন্যাল পাঠিয়ে দেয়। ফলে মন খারাপ থাকলে কেবল মেজাজ বিগড়ে যায় না, পেটের সমস্যাও দেখা দেয়।
আইবিএস-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা
এই মানসিক চাপ যখন দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তখন তা থেকে ‘ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম’ বা আইবিএস-এর মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, আইবিএস হলো একধরনের ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা। সহজ কথায় বলতে গেলে, আমাদের পেটের ভেতরের অন্ত্র বা নাড়িভুঁড়ির গঠনগত বড় কোনো ত্রুটি না থাকলেও, এর কার্যক্ষমতায় গোলমাল দেখা দেয়।
আইবিএস-এ আক্রান্ত রোগীদের একটু টেনশন হলেই তীব্র পেটে ব্যথা, খিঁচুনি এবং পেট খারাপের মতো সমস্যাগুলো দেখা দেয়। যা তাদের সাধারণ জীবনযাত্রাকেও থমকে দেয়।

মানসিক চাপে থাকলে হজম প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায় কেন?
একটু খেয়াল করে দেখবেন, আপনি যখন খুব নার্ভাস থাকেন বা কোনো কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যান, তখন খাবার খেতে মন চায় না বা খাবার হজম হতে চায় না। এর একটি বড় বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। আমরা যখনই মানসিক চাপে থাকি, আমাদের শরীর তখন ‘লড়াই বা পলায়ন’ (ফাইট অর ফ্লাইট) মুডে চলে যায়। এই সময় শরীর পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে জরুরি ভিত্তিতে রক্ত পাম্প করে হাত-পা বা হৃৎপিণ্ডের দিকে পাঠিয়ে দেয়। এতে স্বাভাবিকভাবেই পাকস্থলীতে রক্তের প্রবাহ কমে যায়। ফলে আমাদের পুরো হজম প্রক্রিয়াটা কেমন যেন থমকে যায় বা ধীর হয়ে যায়।
গ্যাস, অম্বল আর বুকজ্বালা করা
অতিরিক্ত টেনশন করলে শরীরে কর্টিসল আর অ্যাড্রেনালিনের মতো কিছু স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা হঠাৎ করে বেড়ে যায়। এই হরমোনগুলো আমাদের পাকস্থলীর ভেতরের অম্লীয় ভারসাম্যকে এলোমেলো করে দেয়। যার ফলে বুকজ্বালা, অতিরিক্ত অ্যাসিডিটি, গ্যাস কিংবা ঘন ঘন টক ঢেকুরের সমস্যা দেখা দেয়। অনেক সময় আমরা বুঝতেও পারি না যে কাজের অতিরিক্ত চাপ বা টেনশনের জন্যই এই বদহজমটা হচ্ছে।
ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য- দ্বিমুখী সমস্যা
খেয়াল করে দেখবেন, বড় কোনো ইন্টারভিউ বা পরীক্ষার ঠিক আগে অনেকেরই বারবার বাথরুমে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। এর কারণ হলো, অতিরিক্ত মানসিক চাপে থাকলে অন্ত্রের পেশিগুলো দ্রুত গতিতে সংকুচিত হতে শুরু করে। এর উল্টোটাও হতে পারে- অন্ত্রের পেশিগুলো একদম নিস্তেজ হয়ে পড়তে পারে। আর ঠিক এই কারণেই মানসিক চাপ বাড়লে কারও কারও ডায়রিয়া শুরু হয়, আবার কেউ বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভোগেন।
পেটের উপকারি ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে
আমাদের পেটের ভেতরে কোটি কোটি উপকারি ব্যাকটেরিয়া থাকে, যেগুলো আমাদের খাবার হজম করতে আর শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

কিন্তু একটানা চলতে থাকা মানসিক চাপ বা দীর্ঘমেয়াদি দুশ্চিন্তা এই উপকারি ব্যাকটেরিয়াগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে পেটে ব্যথা, পেট ফাঁপা, কিংবা পেটটা সবসময় ভারী হয়ে থাকার মতো অস্বস্তিকর অনুভূতি লেগেই থাকে।
তাহলে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় কী?
পেটকে সুস্থ ও শান্ত রাখতে হলে সবার আগে আমাদের মনকে শান্ত করা শিখতে হবে। যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন, প্রতিদিন কিছুটা সময় বের করে যোগব্যায়াম, মেডিটেশন, ধ্যান আর লম্বা করে বুকভরে শ্বাস নেওয়ার ব্যায়াম করতে পারেন। রাতে অন্তত সাত-আট ঘণ্টার গভীর ঘুম নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।
ছোটখাটো বদহজম বা গ্যাসের সমস্যা বলে একে অবহেলা না করে নিজের জীবনযাপন এবং ডায়েটের দিকে একটু নজর দিন। পুষ্টিকর খাবার খান এবং মানসিক চাপ মুক্ত থাকার চেষ্টা করুন।
সূত্র: ভারতভিত্তিক দুটি সংবাদমাধ্যম টাইমস নাও এবং টিভি৯ বাংলায় ‘পেটের সমস্যার কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না?’ এবং ‘খাবার খেলেই হজম হচ্ছে না? ‘IBS’-এর সমস্যায় ভুগছেন না তো?’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের সম্পাদনা করেছেন সাবিহা তাবাসসুম।
