মস্তিষ্ক সুস্থ রাখতে ৮ পরামর্শ

মানুষের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি হলো মস্তিষ্ক। চিন্তা করা, অনুভূতি প্রকাশ, স্মৃতি ধরে রাখা এবং শরীরের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করা সবকিছুই মস্তিষ্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আকারে ছোট হলেও এটি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি অঙ্গ।
মানব মস্তিষ্কের ওজন প্রায় ৩ পাউন্ড। এই ছোট অঙ্গটিই মানুষের ব্যক্তিত্ব, স্মৃতি এবং অনুভূতির কেন্দ্র। মস্তিষ্ক আমাদের চিন্তা, আবেগ ও শরীরের চলাফেরা সমন্বয় করে।
মস্তিষ্কে বিলিয়ন সংখ্যক স্নায়ুকোষ রয়েছে, যেগুলোকে নিউরন বলা হয়। এই কোষগুলো শরীরের বিভিন্ন অংশে তথ্য আদান-প্রদান করে। যদি এই কোষগুলো ঠিকভাবে কাজ না করে, তাহলে শরীরের পেশি সঠিকভাবে নড়াচড়া করতে পারে না, শরীরের কিছু অংশে অনুভূতি কমে যেতে পারে বা চিন্তা করার ক্ষমতা ধীর হয়ে যেতে পারে।
মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হয়ে যাওয়া নিউরন সাধারণত নতুন করে তৈরি হয় না। তাই মস্তিষ্কের যত্ন নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাথায় আঘাত, মাদক ব্যবহার কিংবা আলঝেইমার ও পারকিনসনসের মতো রোগ মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতি করতে পারে।
সুস্থ জীবনযাপন এবং কিছু ভালো অভ্যাস মস্তিষ্ককে দীর্ঘদিন সক্রিয় ও সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। নিচে মস্তিষ্কের যত্ন নেওয়ার জন্য আটটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ তুলে ধরা হলো।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
শারীরিকভাবে সক্রিয় মানুষদের মানসিক সক্ষমতা সাধারণত বেশি সময় ভালো থাকে। নিয়মিত ব্যায়াম শরীরের ভারসাম্য, শক্তি, নমনীয়তা ও শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এটি মানসিক চাপ কমায় এবং মন ভালো রাখে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ব্যায়াম আলঝেইমার রোগের ঝুঁকি কমাতেও সহায়তা করতে পারে। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করা ভালো। যেমন দ্রুত হাঁটা। চাইলে সপ্তাহে ৭৫ মিনিট জোরালো ব্যায়ামও করা যেতে পারে, যেমন জগিং।
মাথা সুরক্ষিত রাখুন
মাথায় আঘাত লাগলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকতে পারে। এতে স্মৃতি, চিন্তাশক্তি, সমন্বয় ক্ষমতা, কথা বলা এবং আবেগের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
সাইকেল চালানো, মোটরসাইকেল চালানো বা স্কি করার মতো কাজের সময় অবশ্যই হেলমেট ব্যবহার করা উচিত। গাড়িতে ভ্রমণের সময় সিটবেল্ট ব্যবহার করাও জরুরি।
পড়তে গিয়ে মাথায় আঘাত লাগা এড়াতে সিঁড়ি, ভেজা মেঝে বা অসমান জায়গায় হাঁটার সময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
শারীরিক অসুস্থতার যত্ন নিন
ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো কিছু রোগ মস্তিষ্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এসব রোগ স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ায়, যা মস্তিষ্কের রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
যাদের এসব রোগ আছে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। আর যাদের নেই, তাদেরও প্রতিরোধের জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করা উচিত।
বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান
মানুষ সামাজিক প্রাণী। বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। সামাজিক যোগাযোগ মানসিক চাপ ও হতাশা কমাতে সাহায্য করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, একাকিত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা চিন্তাশক্তি কমে যাওয়া এবং স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন
ভালো ঘুম মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘুম মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয় এবং স্মৃতি শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। এতে মনোযোগ বাড়ে এবং দৈনন্দিন কাজ সহজ হয়।
প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। যদি ঘুমের সময় বেশি নাক ডাকেন বা ঘুম ভেঙে যায়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ এটি ঘুমের সমস্যা বা অন্য কোনো রোগের লক্ষণ হতে পারে।
স্বাস্থ্যকর খাবার খান
স্বাস্থ্যকর খাবার মস্তিষ্কের সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুষম খাদ্য স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
মস্তিষ্কের জন্য উপকারী একটি খাদ্যধারা হলো মাইন্ড ডায়েট। এতে বেশি করে শাকসবজি, ফল, বাদাম, সম্পূর্ণ শস্য, মাছ ও মুরগির মাংস খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। আর মাখন, চিজ, লাল মাংস এবং অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার কম খাওয়ার কথা বলা হয়।
মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখুন
যেমন শরীরের জন্য ব্যায়াম দরকার, তেমনি মস্তিষ্কের জন্যও মানসিক অনুশীলন প্রয়োজন। নতুন কিছু শেখা বা মানসিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে।
বই পড়া, ধাঁধা সমাধান করা, বোর্ড গেম খেলা, নতুন কোনো দক্ষতা শেখা বা স্বেচ্ছাসেবী কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়া মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
ওষুধ ও অ্যালকোহল ব্যবহারে সতর্ক থাকুন
অতিরিক্ত অ্যালকোহল বা কিছু ওষুধ মস্তিষ্কের কোষগুলোর যোগাযোগে প্রভাব ফেলতে পারে। এতে চিন্তা করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া বা সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করা উচিত। আর অ্যালকোহল পান করলে তা সীমিত পরিমাণে করা ভালো।
মস্তিষ্ক সুস্থ রাখা মানে পুরো শরীর ও জীবনের মান ভালো রাখা। নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং সামাজিক যোগাযোগ মস্তিষ্কের সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ছোট ছোট ভালো অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তাই প্রতিদিনের জীবনযাপনে সচেতন কিছু সিদ্ধান্ত নিলে মস্তিষ্ক দীর্ঘদিন সুস্থ ও সক্রিয় রাখা সম্ভব।
সূত্র : মায়ো ক্লিনিক