logo
Advertisement

৮ ঘণ্টা ঘুমিয়েও সারাদিন ক্লান্ত, শরীরের এই সমস্যাগুলো দায়ী হতে পারে

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
৮ ঘণ্টা ঘুমিয়েও সারাদিন ক্লান্ত, শরীরের এই সমস্যাগুলো দায়ী হতে পারে
ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া

রাতে নিয়ম করে ৮ ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন। তারপরও সকালে বিছানা ছাড়তে ইচ্ছা করছে না, কাজে মন বসছে না, একটু পরপর কফি বা চা খেতে ইচ্ছা করছে। দুপুরের দিকে শরীর যেন আরও নিস্তেজ হয়ে আসছে। অনেকেই এমন হলে মনে করেন, রাতে হয়তো আরও কিছুক্ষণ ঘুমানো দরকার।

Advertisement

কিন্তু সব সময় বিষয়টি এতটা সহজ নয়। পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও যদি নিয়মিত ক্লান্ত লাগে, তাহলে শুধু ঘুমের সময়ের দিকে তাকালেই হবে না। ঘুমের মান, খাবারের ধরন, পানি খাওয়ার পরিমাণ, মানসিক চাপ, দৈনন্দিন অভ্যাস এবং কিছু শারীরিক সমস্যাও এর পেছনে থাকতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের শক্তি ধরে রাখতে শুধু পর্যাপ্ত ক্যালরি নয়, আয়রন, ভিটামিন বি১২, ফোলেট, ভিটামিন ডি-সহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানও প্রয়োজন। এসবের ঘাটতি থাকলে ভালো ঘুমের পরও দুর্বল বা ক্লান্ত লাগতে পারে।


খাবারে পুষ্টির ঘাটতি আছে কি না দেখুন

শরীরের শক্তি উৎপাদন ও স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ প্রয়োজন। আয়রন শরীরে অক্সিজেন পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভিটামিন বি১২ ও ফোলেট রক্তকণিকা তৈরি এবং স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত।

তাই খাবারে এসব পুষ্টির ঘাটতি থাকলে ক্লান্তি, দুর্বলতা বা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে যারা নিয়মিত খাবার খান না, দীর্ঘদিন খুব কম খাবার খান বা খাবারের বৈচিত্র্য কম, তাদের খাদ্যতালিকা পর্যালোচনা করা দরকার।

শুধু পেট ভরলেই হবে না

অনেকের দিনের খাবারে ভাত, রুটি বা অন্যান্য পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেশি থাকে, কিন্তু প্রোটিন, শাকসবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার কম থাকে। এতে পেট ভরলেও শরীর প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি নাও পেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা সুষম খাবারে পূর্ণ শস্য, শাকসবজি, ফল, ডাল, বাদাম, বীজ এবং পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখার পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশি খাবারের ক্ষেত্রেও বিষয়টি সহজভাবে করা যায়। ভাত বা রুটির সঙ্গে ডাল, মাছ বা ডিম, পর্যাপ্ত সবজি এবং একটি পুরো ফল রাখা যেতে পারে।

দিনের খাবার বাদ দিচ্ছেন?

সকালের নাশতা বাদ দেওয়া, দুপুরে খুব কম খাওয়া বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার অভ্যাসেও দিনের কোনো এক সময়ে শরীর দুর্বল লাগতে পারে।

বিশেষ করে সারাদিন ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত খাবার না খেলে পরে অতিরিক্ত ক্ষুধা তৈরি হতে পারে এবং তখন বেশি মিষ্টি বা পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

তাই দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার বদলে নিজের রুটিন অনুযায়ী নিয়মিত ও সুষম খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা ভালো।

শরীরে পানির ঘাটতি হলেও ক্লান্তি আসতে পারে

শরীরে পানির ঘাটতি হলে শুধু তৃষ্ণাই লাগে না। মাথাব্যথা, ঝিমঝিম ভাব, মনোযোগ কমে যাওয়া এবং অলস লাগার মতো সমস্যাও হতে পারে।

গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে বেশি পানি বেরিয়ে যেতে পারে। তাই তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষা না করে দিনের বিভিন্ন সময়ে পর্যাপ্ত পানি পান করা ভালো।

তবে সবার পানির চাহিদা এক নয়। বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়া, খাবার এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর পানির প্রয়োজন নির্ভর করে।


অতিরিক্ত চা-কফি কি সমস্যাকে বাড়াচ্ছে?

ক্লান্ত লাগলে অনেকেই চা বা কফির ওপর নির্ভর করেন। ক্যাফেইন সাময়িকভাবে সতর্কতা বাড়াতে পারে। কিন্তু দিনের পর দিন ক্লান্তির কারণ খুঁজে না বের করে শুধু ক্যাফেইনের ওপর নির্ভর করা ভালো সমাধান নয়।

বিশেষ করে দিনের শেষ দিকে অতিরিক্ত চা বা কফি খেলে ঘুমের মান খারাপ হতে পারে। পরদিন আবার ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। এভাবে একটি চক্র তৈরি হতে পারে।

তাই সারাদিনে কতটা ক্যাফেইন গ্রহণ করছেন এবং কখন গ্রহণ করছেন, সেদিকেও নজর রাখা দরকার।

৮ ঘণ্টা ঘুমালেও ঘুমের মান খারাপ হতে পারে

ঘুমের সময়ের পাশাপাশি ঘুমের মানও গুরুত্বপূর্ণ। কেউ হয়তো ৮ ঘণ্টা বিছানায় থাকছেন, কিন্তু বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে বা ঘুম গভীর হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে সকালে উঠে সতেজ না লাগতে পারে।

নাক ডাকা, রাতে বারবার জেগে ওঠা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস নিতে সমস্যা হওয়া বা সকালে মাথাব্যথার মতো লক্ষণ থাকলে ঘুমের কোনো সমস্যা আছে কি না তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।

অর্থাৎ শুধু ঘড়িতে ৮ ঘণ্টা ঘুম হয়েছে কি না দেখলেই ঘুমের মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

ঘুম ও খাবারের সম্পর্কও আছে

ঘুম এবং খাবারকে অনেক সময় আলাদা বিষয় মনে করা হয়। কিন্তু দুটির মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে।

ঘুম কম বা খারাপ হলে পরদিন ক্ষুধা ও খাবারের প্রতি আকাঙ্ক্ষায় পরিবর্তন আসতে পারে। তখন বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার, পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট বা ঘন ঘন নাশতা করার প্রবণতা বাড়তে পারে। অন্যদিকে সুষম খাবার শরীরের স্বাভাবিক মস্তিষ্ক ও হরমোনের কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে।

তাই শুধু বেশি সময় ঘুমানোর চেষ্টা না করে ঘুম ও খাবারের পুরো রুটিনটি একসঙ্গে দেখা দরকার।

সারাদিন বসে থাকলেও ক্লান্তি বাড়তে পারে

শরীরকে সুস্থ রাখতে নিয়মিত নড়াচড়া প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে থাকা, হাঁটাচলা কম করা এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস না থাকলেও শরীর ভারী ও অলস লাগতে পারে।

নিয়মিত হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার, হালকা ব্যায়াম বা নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী শারীরিক কর্মকাণ্ড দৈনন্দিন রুটিনে রাখা যেতে পারে।

তবে দীর্ঘদিন শরীরচর্চা না করলে হঠাৎ কঠিন ব্যায়াম শুরু না করে ধীরে ধীরে সক্রিয়তা বাড়ানো ভালো।

মানসিক চাপও শক্তি কমিয়ে দিতে পারে

কাজের চাপ, উদ্বেগ, ব্যক্তিগত সমস্যা বা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ শরীরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এমন অবস্থায় পর্যাপ্ত সময় ঘুমালেও সকালে সতেজ না লাগতে পারে।

তাই দিনের মধ্যে বিশ্রামের সময় রাখা, নিয়মিত হাঁটা, শখের কাজ করা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যকর উপায়ে মানসিক চাপ সামলানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।

কখন ক্লান্তির পেছনে রোগের কারণ খুঁজতে হবে?

কয়েক দিন ব্যস্ততা বা কম ঘুমের কারণে ক্লান্ত লাগা স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার ও পর্যাপ্ত পানি পান করার পরও যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্লান্তি থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির পেছনে রক্তশূন্যতা, থাইরয়েডের সমস্যা, রক্তে শর্করার অস্বাভাবিকতা, ঘুমের সমস্যা বা অন্য কোনো শারীরিক অসুস্থতা থাকতে পারে।

বিশেষ করে ক্লান্তির সঙ্গে অস্বাভাবিক ওজন কমা বা বাড়া, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড়, মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, বারবার প্রস্রাব, ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া বা দৈনন্দিন কাজ করতে সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্রতিদিনের খাবারে কী রাখবেন?

শরীরের শক্তি ধরে রাখতে খুব জটিল কোনো ডায়েটের প্রয়োজন নেই। খাবারে বৈচিত্র্য রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিদিনের খাবারে রাখতে পারেন-

  • ভাত বা রুটি, সম্ভব হলে কিছু পূর্ণ শস্য
  • মাছ, ডিম, মুরগি বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিন
  • ডাল ও ছোলা
  • বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি
  • মৌসুমি ও পুরো ফল
  • পরিমিত বাদাম ও বীজ
  • দুধ বা দই, যদি সহ্য হয়
  • পর্যাপ্ত পানি

একই সঙ্গে অতিরিক্ত মিষ্টি, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইনের ওপর নির্ভরতা কমানো ভালো।

৮ ঘণ্টা ঘুমানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সকালে উঠে সতেজ অনুভব করার বিষয়টি শুধু ঘুমের সময়ের ওপর নির্ভর করে না। ঘুমের মান, পুষ্টি, পানি পান, শারীরিক কর্মকাণ্ড, মানসিক চাপ এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য একসঙ্গে এর ওপর প্রভাব ফেলে।

তাই পর্যাপ্ত ঘুমের পরও যদি নিয়মিত ক্লান্ত লাগে, শুধু আরও বেশি ঘুমানোর চেষ্টা না করে নিজের খাবার, পানি পান ও দৈনন্দিন অভ্যাসের দিকে নজর দিন। সমস্যা কয়েক সপ্তাহ ধরে চললে বা অন্য কোনো উপসর্গ যুক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া