বমি-ডায়রিয়া হলে খাবারের বিষক্রিয়া নয়, দায়ী হতে পারে যে ভাইরাস

পেটটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। সঙ্গে বমি বমি ভাব, পাতলা পায়খানা কিংবা খাবারে অরুচি। এমন হলে প্রথমেই মনে হতে পারে, হয়তো বাসি বা দূষিত খাবার খাওয়ার কারণে সমস্যা হয়েছে। অনেকেই একে সাধারণ পেটের সমস্যা ভেবে বিশ্রাম নেন, পানি খান এবং কয়েক ঘণ্টা পর ঠিক হয়ে যাবে বলে অপেক্ষা করেন।
কিন্তু সব সময় কারণ খাবারে বিষক্রিয়া নাও হতে পারে। কখনো কখনো ইনফ্লুয়েঞ্জা এ (A)-এর এইচ১এন১ (H1N1) ধরনের ভাইরাস সংক্রমণেও পেটের এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সাধারণত এইচ১এন১-এর সঙ্গে জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা, শরীর ব্যথা ও দুর্বলতার মতো উপসর্গের কথা বেশি শোনা যায়। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা বা খাবারে অরুচিও দেখা দিতে পারে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্বাসতন্ত্রের উপসর্গ স্পষ্ট হওয়ার আগেই এসব সমস্যা শুরু হতে পারে।
ফলে শুধু পেটের উপসর্গ দেখে একে খাবারে বিষক্রিয়া ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
এইচ১এন১-এ কেন পেটের সমস্যা হতে পারে?
এইচ১এন১ মূলত ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের একটি ধরন এবং এটি প্রধানত শ্বাসতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। কিন্তু সংক্রমণের সময় পরিপাকতন্ত্রের কিছু উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
বমি বমি ভাব, বমি, পাতলা পায়খানা, পেটে ব্যথা বা অস্বস্তি এবং খাবারে অরুচি এর মধ্যে থাকতে পারে। এসব উপসর্গ শিশুদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে। আগের গবেষণাতেও ইনফ্লুয়েঞ্জার সঙ্গে বমি, ডায়রিয়া ও পেটব্যথার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে এইচ১এন১ মূলত পেটের রোগ। ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং পাকস্থলী ও অন্ত্রের সংক্রমণ আলাদা বিষয়।
খাবারে বিষক্রিয়া আর এইচ১এন১ আলাদা করবেন কীভাবে?
দুটির কিছু উপসর্গ একই হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। খাবারে বিষক্রিয়া বা পাকস্থলী ও অন্ত্রের সংক্রমণে সাধারণত বমি, ডায়রিয়া ও পেটব্যথা বেশি গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে এইচ১এন১ হলে এসব উপসর্গের সঙ্গে জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, কাঁপুনি বা অতিরিক্ত দুর্বলতার মতো উপসর্গ থাকতে পারে।
তবে শুধু উপসর্গ দেখে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় কোনটি হয়েছে। একই ধরনের উপসর্গ বিভিন্ন সংক্রমণেও হতে পারে।
বিশেষ করে পেটের সমস্যার সঙ্গে যদি হঠাৎ জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা বা শরীর ব্যথা শুরু হয়, তাহলে শুধু খাবারে সমস্যা হয়েছে ধরে না নিয়ে ইনফ্লুয়েঞ্জার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা উচিত।
প্রথমে শুধু পেটের সমস্যা হওয়াও সম্ভব
এইচ১এন১-এর ক্ষেত্রে একটি বিষয় অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি করে। সংক্রমণের শুরুতেই সবার কাশি বা গলা ব্যথা নাও থাকতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে বমি, ডায়রিয়া বা পেটের অস্বস্তিই প্রথম লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে। পরে জ্বর বা শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
এ কারণে পেটের সমস্যা দেখে নিজে থেকে শুধু খাবারে বিষক্রিয়া ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে, পেটের সমস্যা হলেই এইচ১এন১ হয়েছে এমন নয়। নরোভাইরাসসহ বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, দূষিত খাবার এবং আরও অনেক কারণে একই ধরনের সমস্যা হতে পারে।
ডায়রিয়া ও বমিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি পানিশূন্যতা
বমি ও ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বা ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে যায়। এর সঙ্গে জ্বর থাকলে শরীরে পানির ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। ফলে পানিশূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং যাদের আগে থেকেই কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি হতে পারে। যারা বারবার বমি করছেন এবং কোনো তরলই রাখতে পারছেন না, তাদেরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
তাই বমি বা ডায়রিয়া হলে অল্প অল্প করে বারবার তরল পান করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার স্যালাইন ব্যবহার করা যেতে পারে।
এইচ১এন১ হলে শ্বাসকষ্টের দিকেও নজর দিন
পেটের সমস্যা থাকলেও এইচ১এন১ একটি শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ। তাই পরে কাশি, গলা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বুকে অস্বস্তি বা শরীরের অন্য ফ্লুর মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, বুকে ব্যথা বা চাপ অনুভব করা, অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়া, বিভ্রান্তি বা দ্রুত অবনতি হলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসা নিতে হবে।
ওষুধ খাওয়ার পরও বমি হতে পারে
আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার। ইনফ্লুয়েঞ্জার চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ওসেলটামিভিরের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে। তাই ওষুধ খাওয়ার আগে থেকেই উপসর্গ ছিল, নাকি ওষুধ খাওয়ার পর শুরু হয়েছে, সেটি চিকিৎসককে জানানো গুরুত্বপূর্ণ।
নিজে থেকে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ শুরু করা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করাই নিরাপদ।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
পেটের সমস্যা হালকা হলে অনেক সময় বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত তরল গ্রহণে ভালো হয়ে যেতে পারে। কিন্তু কিছু লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
বিশেষ করে যদি থাকে-
- বারবার বমি এবং শরীরে কোনো তরল ধরে রাখতে না পারা
- তীব্র বা বাড়তে থাকা পেটব্যথা
- পানিশূন্যতার লক্ষণ
- পায়খানা বা বমিতে রক্ত
- শ্বাস নিতে কষ্ট
- অতিরিক্ত দুর্বলতা
- বিভ্রান্তি বা অস্বাভাবিক আচরণ
- দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি
- পেটের সমস্যার সঙ্গে জ্বর, কাশি বা শরীর ব্যথা
এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
পেটের সমস্যা মানেই খাবারে বিষক্রিয়া নয়
পেটব্যথা, বমি বা ডায়রিয়া খুব সাধারণ উপসর্গ। তাই এগুলো দেখা দিলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে একই উপসর্গ বিভিন্ন রোগে দেখা দিতে পারে বলে কারণটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে পেটের সমস্যার সঙ্গে জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা, শরীর ব্যথা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা থাকলে ইনফ্লুয়েঞ্জার কথাও মাথায় রাখতে হবে। এইচ১এন১-এ পরিপাকতন্ত্রের উপসর্গ দেখা দিতে পারে এবং কখনো কখনো সেগুলো শ্বাসতন্ত্রের উপসর্গের আগেও শুরু হতে পারে।
তাই পেট খারাপ হয়েছে ভেবে বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে না দিয়ে উপসর্গগুলোর পরিবর্তনের দিকে নজর রাখুন। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, তীব্র পেটব্যথা, পানিশূন্যতা বা দ্রুত অবনতি হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: এনডিটিভি



