চোখ কি বারবার শুকিয়ে যাচ্ছে, হতে পারে ঘুমের সমস্যারও ইঙ্গিত

চোখে বারবার জ্বালা করে, খচখচ করে বা মনে হয় চোখের ভেতরটা শুকিয়ে যাচ্ছে? অনেকেই এটিকে শুধু দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের ফল মনে করেন। কিন্তু চোখ শুষ্ক হওয়ার পেছনে ঘুমের সমস্যারও ভূমিকা থাকতে পারে। এমনকি ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধা তৈরি হলে শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার মতো সমস্যার সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় ড্রাই আই ডিজিজ বা চোখের শুষ্কতা এবং ঘুমের সমস্যার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে BMC Ophthalmology-তে প্রকাশিত একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে ২১টি গবেষণার ৪ লাখ ১৯ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, যাদের ড্রাই আই ছিল, তাদের মধ্যে ঘুমের সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এই সম্পর্ক থেকে কোনটি সরাসরি কারণ আর কোনটি ফল, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
ড্রাই আই কী?
চোখের ওপর সবসময় অশ্রুর একটি পাতলা স্তর থাকে। এটি চোখকে আর্দ্র রাখে, মসৃণ রাখে এবং বাইরের বিভিন্ন উপাদান থেকে চোখের পৃষ্ঠকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। অশ্রুর পরিমাণ কমে গেলে বা অশ্রুর স্তর দ্রুত শুকিয়ে গেলে ড্রাই আই বা চোখের শুষ্কতার সমস্যা হতে পারে।
এর ফলে চোখে জ্বালাপোড়া, খচখচে ভাব, চোখে কিছু আটকে থাকার অনুভূতি, লালচে ভাব, আলো সহ্য করতে না পারা এবং কখনো ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা হতে পারে।
চোখ শুকানোর সঙ্গে ঘুমের সম্পর্ক কোথায়?
চোখ ও ঘুমের সম্পর্ক একমুখী নয়। চোখ শুকিয়ে গেলে অস্বস্তি, জ্বালা বা ব্যথার কারণে ঘুমাতে সমস্যা হতে পারে। আবার পর্যাপ্ত বা ভালো মানের ঘুম না হলেও চোখের স্বাভাবিক অশ্রু উৎপাদন ও চোখের পৃষ্ঠের কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে।
BMC Ophthalmology-তে প্রকাশিত মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, ড্রাই আই থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ঘুমের সমস্যার ঝুঁকি সুস্থ ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ২০ গুণ বেশি ছিল। একই বিশ্লেষণে অপর্যাপ্ত ঘুমের ঝুঁকিও বেশি পাওয়া যায়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। গবেষণাটি মূলত পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল। তাই ড্রাই আই সরাসরি ঘুমের সমস্যা তৈরি করে বা ঘুমের সমস্যা সরাসরি ড্রাই আই তৈরি করে, এমন নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। গবেষকেরাও আরও বড় ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজনের কথা বলেছেন।
তাহলে মস্তিষ্কে অক্সিজেন কমার কথা আসছে কেন?
এই সম্পর্কটি মূলত অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া হলো এমন একটি ঘুমের সমস্যা, যেখানে ঘুমের সময় বারবার ওপরের শ্বাসনালি আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কিছু সময়ের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধা তৈরি হয় এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গুরুতর স্লিপ অ্যাপনিয়ার ক্ষেত্রে ঘুমের সময় মস্তিষ্কের টিস্যুতেও অক্সিজেনের মাত্রা কমতে পারে। একটি গবেষণায় স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঘুমের সময় মস্তিষ্কের অক্সিজেনেশন পর্যবেক্ষণ করে এমন পরিবর্তন দেখা গেছে।
তবে চোখ শুকিয়ে যাওয়া মানেই মস্তিষ্কে অক্সিজেন কমে যাচ্ছে, এমন কথা বলা যাবে না। ড্রাই আই নিজে মস্তিষ্কে অক্সিজেন কমে যাওয়ার সরাসরি লক্ষণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
বরং ড্রাই আই এবং স্লিপ অ্যাপনিয়ার মধ্যে একটি সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হচ্ছে।
স্লিপ অ্যাপনিয়ার সঙ্গে ড্রাই আইয়ের সম্পর্ক
সাম্প্রতিক গবেষণায় স্লিপ অ্যাপনিয়া ও ড্রাই আইয়ের মধ্যে সম্পর্কের আরও প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত ১৭৪ জন রোগীর চোখের বিভিন্ন সূচক পরীক্ষা করা হয়। সেখানে অক্সিজেনের মাত্রার সঙ্গে ড্রাই আইয়ের কিছু উপসর্গের সম্পর্ক পাওয়া গেলেও মাঝারি ও গুরুতর স্লিপ অ্যাপনিয়া গ্রুপের মধ্যে চোখের শুষ্কতার সব ধরনের বস্তুনিষ্ঠ পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
অন্য একটি গবেষণায় ড্রাই আই থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে স্লিপ অ্যাপনিয়ার তীব্রতা এবং রাতের সর্বনিম্ন অক্সিজেন স্যাচুরেশনের মধ্যে পার্থক্য পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ সম্পর্কটি বাস্তব হলেও বিষয়টি সরল নয়। ড্রাই আইয়ের পেছনে বয়স, ওষুধ, পরিবেশ, দীর্ঘ সময় স্ক্রিন দেখা, চোখের পাতার সমস্যা, অশ্রুগ্রন্থির কার্যকারিতা এবং বিভিন্ন শারীরিক অবস্থাসহ একাধিক কারণ থাকতে পারে।
রাতে নাক ডাকেন? বিষয়টি গুরুত্ব দিন
ঘুমের সময় জোরে নাক ডাকা সবসময় স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ নয়। কিন্তু নাক ডাকার সঙ্গে যদি ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, হঠাৎ হাঁসফাঁস করে ওঠা, সকালে ঘুম থেকে উঠে মাথাব্যথা, দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া বা সারাদিন ক্লান্ত থাকার মতো সমস্যা থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
কারণ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ঘুমের সময় বারবার শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধা তৈরি হয় এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না হলে এর সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি জড়িত থাকতে পারে।
ঘুমের সমস্যা থাকলে চোখও শুকাতে পারে
ঘুমের ঘাটতি শুধু দিনের ক্লান্তি বাড়ায় না, চোখের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে। ঘুমের সময় শরীরের বিভিন্ন পুনরুদ্ধারমূলক প্রক্রিয়া চলে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে চোখের পৃষ্ঠে অস্বস্তি বাড়তে পারে।
এ ছাড়া ঘুমের সমস্যা থাকলে চোখের পাতা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া, চোখের পৃষ্ঠে বাতাস লাগা বা চোখের অশ্রু উৎপাদনে পরিবর্তনের মতো বিষয়ও ড্রাই আইয়ের উপসর্গ বাড়াতে পারে।
একই কারণে ড্রাই আই ও ঘুমের সমস্যা অনেক সময় পরস্পরকে প্রভাবিত করতে পারে। ২০২৫ সালের একটি পর্যালোচনাতেও ড্রাই আই এবং ঘুমের সমস্যার মধ্যে দ্বিমুখী সম্পর্কের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
শুধু মোবাইলের জন্যই কি চোখ শুকায়?
না। দীর্ঘ সময় মোবাইল, কম্পিউটার বা অন্য ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের পলক ফেলার হার কমে যেতে পারে। এতে চোখের অশ্রুর স্তর দ্রুত ভেঙে গিয়ে শুষ্কতার উপসর্গ বাড়তে পারে।
২০২৬ সালের একটি গবেষণায়ও বেশি ভিজ্যুয়াল ডিসপ্লে টার্মিনাল ব্যবহারের সঙ্গে ড্রাই আইয়ের বেশি প্রবণতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে শুধু স্ক্রিন ব্যবহারই ড্রাই আইয়ের একমাত্র কারণ নয়। বয়স, কন্টাক্ট লেন্স, কিছু ওষুধ, চোখের পাতার সমস্যা, শুষ্ক পরিবেশ এবং বিভিন্ন রোগও এর কারণ হতে পারে।
চোখ শুকিয়ে গেলে কী করবেন?
চোখের শুষ্কতা বারবার হলে কিছু সাধারণ অভ্যাস উপকারী হতে পারে। যেমন-
- দীর্ঘ সময় একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিয়মিত বিরতি নিন
- সচেতনভাবে চোখের পলক ফেলুন
- পর্যাপ্ত ঘুমের চেষ্টা করুন
- ধোঁয়া, ধুলা ও অতিরিক্ত শুষ্ক বাতাস থেকে চোখকে রক্ষা করুন
- কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করলে নির্ধারিত নিয়ম মেনে ব্যবহার করুন
- প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে লুব্রিকেটিং আই ড্রপ ব্যবহার করুন
তবে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা থাকলে শুধু আই ড্রপ ব্যবহার করে যাওয়ার বদলে চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
চোখ শুষ্ক হওয়ার সমস্যা কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে, বারবার ফিরে এলে বা দৈনন্দিন কাজে সমস্যা তৈরি করলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে চোখ শুকানোর পাশাপাশি যদি রাতে জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা, হাঁসফাঁস করে জেগে ওঠা বা দিনের বেলা অস্বাভাবিক ঘুম পাওয়ার মতো সমস্যা থাকে, তাহলে ঘুমের সমস্যার বিষয়টিও চিকিৎসককে জানানো প্রয়োজন।
প্রয়োজনে স্লিপ স্টাডি বা অন্য পরীক্ষা করে স্লিপ অ্যাপনিয়া আছে কি না তা দেখা যেতে পারে।
চোখ শুকিয়ে যাওয়া সাধারণ একটি সমস্যা হলেও সব সময় এটিকে শুধু চোখের সমস্যা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। গবেষণায় ড্রাই আইয়ের সঙ্গে ঘুমের সমস্যার একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। আবার স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো অবস্থায় ঘুমের সময় শরীরে এবং মস্তিষ্কে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে।
তবে ড্রাই আই দেখলেই মস্তিষ্কে অক্সিজেন কমে গেছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং চোখ শুকানোর সঙ্গে যদি ঘুমের সমস্যা, নাক ডাকা বা রাতে শ্বাসকষ্টের লক্ষণও থাকে, তাহলে বিষয়টি চিকিৎসকের কাছে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: এই সময় অনলাইন



